ঢাকা, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০২:৫৪:৪৮ PM

বন্যায় কৃষি ও মৎস্য খাতে শত কোটি ক্ষতির আশঙ্কা

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
11-07-2026 01:07:14 PM
বন্যায় কৃষি ও মৎস্য খাতে শত কোটি ক্ষতির আশঙ্কা

চট্টগ্রাম: টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিস্তীর্ণ জনপদ এখনো পানির নিচে থাকায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ পানিবন্দি জীবনযাপন করছেন। জনজীবনের পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্য খাতেও নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। প্রাথমিক হিসাবে জেলার প্রায় ১০ হাজার পুকুর ও চিংড়ি ঘের এবং ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাছ ও ফসল মিলিয়ে শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব প্রস্তুত এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের মোট ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি এবং ৩২০টি চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জলাশয়ের মাছচাষ ক্ষতির মুখে পড়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায়। বাঁশখালীতে প্রায় আড়াই হাজার পুকুর এবং ৩১০টি চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকার মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

সাতকানিয়ায় ৪৬৬ হেক্টর পুকুর ও দিঘির প্রায় ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকার মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া লোহাগাড়ার ১ হাজার ৬২০টি পুকুরে প্রায় ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, কর্ণফুলীর ৫৫৭টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় ৬ কোটি টাকা, চন্দনাইশের ৩৮৩টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় ৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা এবং বোয়ালখালীর ৭৫৬টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার মাছের ক্ষতি হয়েছে।

এ ছাড়া পটিয়ার ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় ৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, ফটিকছড়ির ৫৩৩টি পুকুরে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং আনোয়ারার প্রায় ১ হাজার ১০০টি পুকুর ও ১০টি চিংড়ি ঘেরে প্রায় দেড় কোটি টাকার মাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, “চট্টগ্রামে এবার স্মরণকালের অন্যতম বড় বন্যা হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এখনো সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর অধিকাংশ এলাকার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।”

তিনি আরও বলেন, “জেলার ১৫টি উপজেলার প্রায় সব এলাকাতেই কমবেশি পুকুর, দিঘি ও চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ১০ হাজারের বেশি পুকুর, দিঘি ও ঘের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী উপজেলায়। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পানিতে ৯০ কোটিরও বেশি টাকার মাছের ক্ষতি হয়েছে।”

মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনের বিষয়ে তিনি জানান, জেলা মৎস্য অফিস থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক প্রতিবেদন ইতোমধ্যে মৎস্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তীতে সরকারি সহায়তার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের সব উপজেলাতেই কৃষিজমির কমবেশি ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে জেলার ৮ হাজার ৭৬৮ হেক্টর আউশ ধানের আবাদ, ৬৫২ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৪ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থাৎ মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমির পরিমাণ ১৪ হাজার ৩২৭ হেক্টর।

আউশ ধানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ উপজেলায়। এর মধ্যে বাঁশখালীতে ২ হাজার ১৫০ হেক্টর, চন্দনাইশে ২ হাজার ১২০ হেক্টর, সীতাকুণ্ডে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং সন্দ্বীপে ১ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চন্দনাইশে, যেখানে ৮৩০ হেক্টর জমির সবজি তলিয়ে গেছে। এছাড়া সীতাকুণ্ডে ৭০০ হেক্টর, সন্দ্বীপে ৬০০ হেক্টর, ফটিকছড়িতে ৪৭৫ হেক্টর, সাতকানিয়ায় ৪৬০ হেক্টর, পটিয়ায় ৪৫৫ হেক্টর, বাঁশখালীতে ৪০০ হেক্টর এবং রাউজানে ৩১০ হেক্টর জমির সবজি আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা কৃষি কর্মকর্তা আপ্রু মারমা বলেন, “বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে সীতাকুণ্ড, বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও সন্দ্বীপে আউশ ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চন্দনাইশে আউশ ধান ও গ্রীষ্মকালীন সবজির অধিকাংশ জমিই পানির নিচে চলে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “বন্যায় কৃষি খাতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। আমরা প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করেছি। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে পুনরায় যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা, ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ এবং সম্ভাব্য ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ উল্লেখ থাকবে।”

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্পন্ন করে সরকারি সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিরা পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারবেন। তবে স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এবং কার্যকর বন্যা ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ ধরনের দুর্যোগে কৃষি ও মৎস্য খাতের পুনরাবৃত্ত ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হবে না।