পুরুষ কুদ্দুছের ঘুমটুকুই তার একমাত্র বিলাসিতা। এই পৃথিবীতে মানুষের বিলাসিতার সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেক রকম। কারও কাছে বিলাসিতা মানে দামি গাড়ি, উঁচু অট্টালিকা কিংবা বিদেশ ভ্রমণ। কারও কাছে এক কাপ গরম কফি হাতে বৃষ্টিভেজা বিকেল। কিন্তু কুদ্দুছের জীবনে বিলাসিতা বলতে ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম। সেই ঘুমও প্রতিদিন তার ভাগ্যে জুটত না। কারণ জীবন তাকে কখনো বিশ্রাম নেওয়ার অবকাশ দেয়নি।
কুদ্দুছের জন্ম হয়েছিল নদীভাঙা এক গ্রামের কাঁচা মাটির ঘরে। বাবা ছিলেন দিনমজুর, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। সংসারে পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল বড়। ছোটবেলা থেকেই সে বুঝে গিয়েছিল, তাদের ঘরে স্বপ্ন দেখার আগে ভাতের হাঁড়ির কথা ভাবতে হয়। বিদ্যালয়ের নতুন বইয়ের গন্ধ তার ভালো লাগত, কিন্তু বেশিরভাগ সময় বইয়ের চেয়ে কোদালের হাতলই তার হাতে বেশি মানাত।
ভোরের আলো ফুটতেই সে বাবার সঙ্গে মাঠে যেত। কখনও ইটভাটায়, কখনও খেতে, কখনও বাজারে মাল টানার কাজে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরত ক্লান্ত শরীর নিয়ে। তবু বই খুলে বসত। কারণ তার মা বলতেন, "মানুষের শরীরের ঘাম একদিন শুকিয়ে যায়, কিন্তু শিক্ষার আলো শুকায় না।"
মায়ের সেই কথাগুলো বুকের ভেতর আগুনের মতো জ্বলত। কিন্তু আগুন দিয়ে সবসময় আলো জ্বলে না; কখনও কখনও আগুনে স্বপ্নও পুড়ে যায়। বাবার অসুস্থতার পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে কুদ্দুছের কাঁধে। একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে সে শেষবারের মতো পেছন ফিরে বিদ্যালয়ের দিকে তাকিয়েছিল। সেই দৃষ্টিতে ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল শুধু নীরব বিদায়।
তারপর শুরু হলো শহরের জীবন।
শহর মানুষকে নাম ধরে ডাকে না; কাজ ধরে ডাকে। কুদ্দুছ হয়ে গেল "এই ছেলে", "ও মজুর", "রিকশাওয়ালা", "হেলপার"। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ। রোদে পুড়েছে, বৃষ্টিতে ভিজেছে, শীতে কেঁপেছে। কিন্তু সংসারের জন্য টাকা পাঠাতে কখনো ভুল করেনি।
মাসের শেষে যখন গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠাত, তখন তার নিজের পকেটে থাকত মাত্র কয়েকটি কুঁচকে যাওয়া নোট। সেগুলো দিয়েই চলত পুরো মাস। কখনও একবেলা খেয়ে, কখনও না খেয়েই।
লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করত, "কুদ্দুছ, তোমার কোনো শখ নেই?"
সে মৃদু হেসে বলত, "আছে। একদিন পেট ভরে খেয়ে, কোনো চিন্তা ছাড়া আট ঘণ্টা ঘুমাবো।"
লোকেরা হাসত। তারা ভাবত, এও আবার কোনো শখ হলো! কিন্তু যারা প্রতিদিন জীবনযুদ্ধ করে, তারা জানে—নির্ভার ঘুম পৃথিবীর সবচেয়ে দামী সম্পদ।
একসময় কুদ্দুছের বিয়ে হলো। স্ত্রী রহিমা ছিল শান্ত স্বভাবের। সংসারে এলো দুই সন্তান। নতুন দায়িত্ব মানেই নতুন সংগ্রাম। নিজের পুরোনো জামা সেলাই করে পরেছে, কিন্তু সন্তানদের জন্য নতুন পোশাক কিনেছে। নিজের চিকিৎসা বন্ধ রেখেছে, কিন্তু মেয়ের জ্বর হলে রাতভর হাসপাতালের বারান্দায় বসে থেকেছে।
দিনের পর দিন সে ওভারটাইম করেছে। কখনও নির্মাণশ্রমিক, কখনও ভ্যানচালক, কখনও বাজারে মাল বহনকারী। তার হাতের তালু শক্ত হয়ে গিয়েছিল। আঙুলের ফাঁকে জমেছিল জীবনের কঠিন ইতিহাস।
এক বর্ষার রাতে নির্মাণাধীন ভবনের কাজ শেষ করে ফিরছিল কুদ্দুছ। চারদিকে ঝুম বৃষ্টি। ভিজে কাপড়ে শরীর কাঁপছিল। ঘরে ফিরে দেখে বিদ্যুৎ নেই। ছেলেমেয়ে দুজন মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি। সে চুপচাপ বসে সন্তানদের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, এই ঘুমটাই সে কিনে আনছে প্রতিদিন নিজের ঘাম দিয়ে।
তার নিজের চোখেও ঘুম নেমে আসছিল। কিন্তু পরদিন ভোরে আবার কাজ। তাই ঘুমও ছিল সময় মেপে নেওয়া। যেন কেউ তাকে ধার দিয়েছে কয়েক ঘণ্টা।
বয়স বাড়তে লাগল। শরীর আর আগের মতো সাড়া দিত না। হাঁটুতে ব্যথা, কোমরে যন্ত্রণা, বুকে কাশি। তবু কাজ থামেনি। কারণ দারিদ্র্য কখনো অবসরের আবেদন গ্রহণ করে না।
ছেলে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। মেয়েও কলেজে উঠল। কুদ্দুছের চোখে সেদিন জল এসেছিল। সেই জল পরাজয়ের নয়, বিজয়ের। সে বুঝেছিল, তার না-পড়া বইগুলো হয়তো আজ সন্তানদের হাতে পৌঁছেছে।
ছেলে একদিন বাবাকে বলল, "এবার কাজ ছেড়ে দাও।"
কুদ্দুছ মৃদু হেসে বলল, "আর একটু। এতদিন যে কাঁধে সংসার ছিল, একদিনে নামাতে ইচ্ছে করে না।"
তারপর একদিন সত্যিই কাজ থামল। শরীর আর পারল না। বহু বছরের শ্রমে ক্ষয়ে যাওয়া মানুষটি বারান্দার পুরোনো চেয়ারে বসে আকাশ দেখত। আশপাশের মানুষ ভাবত, এখন নিশ্চয়ই সে খুব সুখে আছে।
কিন্তু কুদ্দুছ জানত, সংগ্রাম শেষ হলেও সংগ্রামের অভ্যাস শেষ হয় না।
একদিন দুপুরে ছেলে এসে দেখল, বাবা চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। মুখে অদ্ভুত শান্তি। যেন বহু বছরের ক্লান্তি একসঙ্গে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। ছেলে ডাকল, "বাবা..."
কুদ্দুছ ধীরে চোখ খুলে বললেন, "জানিস, আজ অনেকদিন পর কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়া একটু ঘুমালাম।"
এই একটি বাক্য শুনে ছেলের বুক কেঁপে উঠল। সে বুঝল, যে মানুষটি সারাজীবন পরিবারের জন্য নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন, তার ব্যক্তিগত চাওয়া ছিল কত সামান্য।
কুদ্দুছ কোনো বড় নেতা ছিলেন না, কোনো বিখ্যাত লেখকও নন। ইতিহাসের বইয়ে তার নাম লেখা থাকবে না। কিন্তু অসংখ্য সাধারণ মানুষের মতো তিনিও ছিলেন এই সমাজের নীরব ভিত্তি। তার কাঁধের ঘামেই দাঁড়িয়ে থাকে শহরের উঁচু ভবন, তার না-ঘুমানো রাতেই নিশ্চিন্তে ঘুমায় অন্যের পরিবার।
মানুষ প্রায়ই সফলতার গল্প লেখে, কিন্তু সংগ্রামের গল্পগুলো নীরবে মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। কুদ্দুছের জীবন শেখায়, সম্মান সবসময় পদবি দিয়ে মাপা যায় না; কখনও কখনও একটি ক্ষয়ে যাওয়া হাতই সবচেয়ে বড় পরিচয়।
শেষ বয়সে নাতি একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "দাদু, তুমি ছোটবেলায় কী হতে চাইতে?"
কুদ্দুছ অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর হাসলেন। সেই হাসিতে ছিল দীর্ঘ জীবনের সব কান্না, সব না-পাওয়া, সব ত্যাগ। তিনি বললেন, "আমি মানুষ হতে চেয়েছিলাম। যদি তোমাদের মুখে হাসি রাখতে পেরে থাকি, তাহলে মনে হয় আমি পেরেছি।"
সেদিন সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবছিল। লাল আভায় ভেসে যাচ্ছিল গ্রামের পথ। কুদ্দুছ ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন। মুখে ছিল তৃপ্তির রেখা। কারণ তিনি জানতেন, তার জীবন হয়তো আরাম পায়নি, কিন্তু অর্থহীনও ছিল না। তার কষ্টে জন্ম নিয়েছে নতুন সম্ভাবনা, তার ঘামে বেঁচে উঠেছে একটি পরিবার, তার ত্যাগে আলোকিত হয়েছে আগামী প্রজন্ম।
পৃথিবী হয়তো তার নাম মনে রাখবে না। কিন্তু তার মতো লক্ষ কুদ্দুছের জীবন দিয়েই পৃথিবী প্রতিদিন নতুন সকাল দেখে। তাদের গল্পগুলো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, পুরস্কারের মঞ্চে উচ্চারিত হয় না। তবু এই মানুষগুলোর ঘামেই সভ্যতার চাকা ঘোরে, তাদের ত্যাগেই ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে থাকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর।
আর তাই আজও মনে হয়—
পুরুষ কুদ্দুছের ঘুমটুকুই তার একমাত্র বিলাসিতা। কারণ যে মানুষ সারাজীবন অন্যের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে, তার নিজের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো কয়েক মুহূর্তের নির্ভার ঘুম। সেই ঘুমই তার রাজপ্রাসাদ, সেই ঘুমই তার উৎসব, সেই ঘুমই তার সমস্ত অর্জনের নীরব পুরস্কার।