জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে আশ্রয় নেওয়া দরিদ্র, নারী ও প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে সমাজসেবা অধিদফতর ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছিল। তবে প্রকল্পটির ব্যয় কাঠামো পর্যালোচনা করে পরিকল্পনা কমিশন দেখতে পায়, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট ব্যয়ের মাত্র ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। বিপরীতে পরামর্শক নিয়োগ, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, অফিস পরিচালনা, দেশি-বিদেশি ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ে ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫৩ কোটিরও বেশি। এ কারণে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) প্রকল্পটি অনুমোদন না দিয়ে সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠিয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক প্রকল্পটির পুরো অর্থায়ন করার কথা ছিল জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের (GIZ) অনুদানে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছর নয় মাস মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
প্রকল্পের আওতায় খুলনা সিটি করপোরেশন, সাতক্ষীরা পৌরসভা, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এবং সিরাজগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, সমবায়ভিত্তিক আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল। এর মাধ্যমে ২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধীসহ মোট ৩০০ জনকে সরাসরি ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও জীবিকা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়। পাশাপাশি শিশু যত্ন, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, নারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সামাজিক সেবা এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে আরও প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু প্রকল্পের আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ৬১ কোটি ২৯ লাখ টাকার মধ্যে সরাসরি সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মাত্র ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল। বিপরীতে বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার বেশি বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে। প্রকল্পে দেশি-বিদেশি মোট ৪৭৩ জন পরামর্শক নিয়োগের জন্য ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা পুরো প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৪৮ থেকে ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকল্পে সরাসরি সুবিধাভোগীর সংখ্যা যেখানে ৩০০, সেখানে পরামর্শকের সংখ্যা তারও বেশি। একটি সীমিত পরিসরের সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে এত বিপুলসংখ্যক পরামর্শক নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
এছাড়া প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বাবদ ১০ কোটি ৩৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, অফিস ভাড়ার জন্য ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং দেশি-বিদেশি ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশ ভ্রমণের জন্য ১ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, টেলিযোগাযোগ, নিরাপত্তা সেবা, যানবাহন ভাড়া, জ্বালানি, প্রকাশনা, প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যয়, ডাক ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক খাতেও পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সরকারের চলমান কৃচ্ছ্রসাধন নীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিদেশ সফরের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকলেও প্রকল্পে বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব কমিশনের নজরে আসে। এ ধরনের ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তব উপযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে কমিশন।
গত ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটির ব্যয় কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা পরামর্শক নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, বিদেশ সফর, অফিস ভাড়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা জানতে চান। তবে সমাজসেবা অধিদফতর ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় প্রকল্পটি অনুমোদন না দিয়ে সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটি অনুদাননির্ভর হলেও মোট অর্থের ৮০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়নকারী সংস্থার বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। ফলে দেশের প্রকৃত সুবিধাভোগীরা খুব সামান্যই উপকৃত হতেন। তিনি বলেন, দরিদ্র মানুষের নামে নেওয়া প্রকল্পে যদি অধিকাংশ অর্থ প্রশাসনিক ব্যয়ে ব্যয় হয়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
কমিশনের আরেক কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় বিদেশ সফরের সুযোগ দেখিয়ে এ ধরনের প্রকল্প দ্রুত অনুমোদনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সুবিধাভোগীদের সর্বোচ্চ উপকার নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি নয়।
পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটির আরও কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। সুবিধাভোগী নির্বাচন পদ্ধতি স্পষ্ট নয়, সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমার একটি অংশ ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় বাস্তবায়নকাল পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশন ৩২ কোটি ৬১ লাখ ৭৪ হাজার টাকার সেবা ক্রয়ের প্রতিটি প্যাকেজের পৃথক ব্যয় বিশ্লেষণ ও যৌক্তিকতা উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে পরামর্শক সেবা, দেশি-বিদেশি ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, জ্বালানি ব্যয়, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। বিদেশ সফরে কোন সংস্থা থেকে কতজন কর্মকর্তা অংশ নেবেন, তাদের দায়িত্ব কী হবে এবং প্রকল্পে তার বাস্তব উপযোগিতা কী—এসব বিষয়ও স্পষ্ট করতে বলা হয়েছে।
ক্রয় পরিকল্পনা নিয়েও একাধিক পর্যবেক্ষণ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের মতে, বিভিন্ন প্যাকেজের একক, পরিমাণ, ক্রয়পদ্ধতি এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের বিষয়গুলো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা এবং আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ অনুযায়ী সংশোধন ও হালনাগাদ করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, নারী ও প্রতিবন্ধী সুবিধাভোগীদের নির্বাচন প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
তবে এসব সমালোচনার দায় নিতে রাজি নয় সমাজসেবা অধিদফতর। সংস্থাটির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এটি মূলত একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জিআইজেডের সঙ্গে চুক্তি করেছে এবং প্রকল্পের কাঠামোও মূলত দাতা সংস্থাই প্রস্তুত করেছে। অনুদাননির্ভর প্রকল্প হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার নির্ধারিত শর্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে কিছু প্রশাসনিক ব্যয় থাকবেই। তবে সেই ব্যয় কখনোই এমন পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত নয়, যাতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যায়। বিশেষ করে দরিদ্র, বাস্তুচ্যুত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নেওয়া প্রকল্পে অর্থের বড় অংশ সরাসরি তাদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় হওয়াই প্রত্যাশিত।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশিদ বলেন, সুবিধাভোগীদের নামে নেওয়া প্রকল্পের অর্থ যদি শেষ পর্যন্ত পরামর্শক, বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ে ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে জনগণের কাছে সেই প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। কাগজে-কলমে ১০ টাকা বরাদ্দ দেখিয়ে বাস্তবে যদি সুবিধাভোগী তিন টাকাও না পান, তবে সেই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়। তাই প্রকল্প অনুমোদনের আগে ব্যয় কাঠামো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে গাড়ি, প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ কিংবা প্রশাসনিক ব্যয় পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এসব ব্যয় ন্যূনতম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে এবং প্রকল্পের মূল অর্থের বড় অংশ যেন প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মানবিক। কিন্তু ব্যয় কাঠামোতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তুলনায় প্রশাসনিক ব্যয়ের অস্বাভাবিক আধিক্য প্রকল্পটির কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। এখন সংশোধিত প্রস্তাবে সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো, পরামর্শক ও প্রশাসনিক ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং স্বচ্ছ বাস্তবায়ন কাঠামো নিশ্চিত করা হবে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।