ঢাকা, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:০৭:২১ AM

মোহাম্মদপুরে মিনিটেই শেষ হয় ছিনতাই

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
10-06-2026 12:07:21 AM
মোহাম্মদপুরে মিনিটেই শেষ হয় ছিনতাই

রাজধানীর অন্যতম আবাসিক এলাকা মোহাম্মদপুরে সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক অভিযান পরিচালিত হলেও এলাকাটিতে সংঘবদ্ধ অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকা, বসিলা, টাউন হল, আদাবরসংলগ্ন অংশ এবং বিভিন্ন বস্তিতে অপরাধীদের সক্রিয়তা তুলনামূলক বেশি। গত এক মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানায় ২ হাজার ৮৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর থানাতেই গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬৫০ জন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে একাধিক কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। এসব চক্রের পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়া কিংবা প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। একাধিক ক্ষেত্রে মূল চক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ছিনতাইকে পেশা হিসেবে বেছে নেয় বলেও দাবি স্থানীয়দের।

মোহাম্মদপুর থানার তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন ঘটনায় ৮৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় চাঁদাবাজির ঘটনায় ২৪ জন, কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট ডাকাতির ঘটনায় ৩২ জন, দস্যুতার ঘটনায় ৭ জন এবং মাদক মামলায় ৩০ জনসহ মোট ৬৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

যেভাবে ঘটে কয়েক মিনিটের ছিনতাই মিশন

গত ১১ মে বিকেলে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সিদ্দিক শ্রেষ্ঠ কোচিং শেষে রিকশাযোগে বাসায় ফিরছিলেন। মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকার ১ নম্বর গেটের সামনে পৌঁছালে কালো প্যান্ট ও সাদা শার্ট পরা এক ব্যক্তি হঠাৎ রিকশার সামনে এসে দাঁড়ান। এতে রিকশার চাকা তার গায়ে স্পর্শ করলে তিনি যাত্রীকে গালাগাল শুরু করেন।

এ সময় আশপাশে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া মুখোশধারী আরও চারজন সেখানে এসে যোগ দেয়। তাদের মধ্যে দুইজন রিকশায় উঠে ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। পরে তারা কয়েক মিনিটের মধ্যে শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন, টাকা ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। এরপর ব্যাগ তল্লাশি করে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংকের এটিএম কার্ডসহ মূল্যবান সবকিছু নিয়ে পালিয়ে যায়।

দিনদুপুরে প্রকাশ্যে সংঘটিত এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। অনেকেই একে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১১ মে বিকেল ৫টা ৩৭ মিনিট ৪ সেকেন্ড থেকে ৫টা ৩৮ মিনিট ২১ সেকেন্ডের মধ্যে পুরো ঘটনাটি সংঘটিত হয়। মাত্র ১ মিনিট ১৭ সেকেন্ডে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীরা তাদের মিশন সম্পন্ন করে। এমনকি ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোনের পাসওয়ার্ডও আদায় করে নেয় তারা।

এর আগে ১৫ এপ্রিল ভোর ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে নূরজাহান রোডে বাসার গেট খোলার অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় অস্ত্রের মুখে ছিনতাইয়ের শিকার হন জুলাই জাদুঘরের ফটোগ্রাফার সাঈদ হাসান তানিম। এ সময় ছিনতাইকারীরা তার মোবাইল ফোন, ম্যাকবুক এম৪ প্রো ল্যাপটপ, সনি এফএক্স-৩ ক্যামেরা ও লেন্সসহ প্রায় ১০ লাখ টাকার মালামাল ছিনিয়ে নেয়। প্রায় দুই মাস পার হলেও এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ, উদ্ধার হয়নি ছিনতাই হওয়া মালামালও।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ৩টা ৩৯ মিনিট ১৩ সেকেন্ডে একটি মোটরসাইকেলে তিন ছিনতাইকারী ঘটনাস্থলে আসে। এরপর ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মাত্র ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে ভুক্তভোগীর সব মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়।

গত ৩ জুন বিকেল ৪টার দিকে চাঁদ উদ্যানের লাউতলা এলাকায় আরেকটি আলোচিত গণছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। কয়েকজন কিশোর সংঘবদ্ধভাবে রিকশা ও সিএনজিতে থাকা যাত্রীদের কাছ থেকে মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়। স্থানীয়দের দাবি, এ চক্রের নেতৃত্বদানকারীরা বয়সে এখনো শিশু।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিকেল ৪টা ৫৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে পাঁচ কিশোর স্বাভাবিকভাবে হেঁটে এসে প্যান্টের ভেতর লুকিয়ে রাখা দেশীয় ধারালো অস্ত্র বের করে ছিনতাই শুরু করে। মাত্র ৩৬ সেকেন্ডের মধ্যে তারা কয়েকটি রিকশা ও পথচারীর কাছ থেকে মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।

মোহাম্মদপুরে শুধু এসব ঘটনাই নয়, গত তিন মাসে অন্তত ৬০টির বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কেউ সর্বস্ব হারিয়েছেন, কেউ গুরুতর আহত হয়েছেন, আবার কেউ নীরবে ক্ষতি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয়দের অভিযোগের তীর প্রশাসনের দিকে। অনেকের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য অপরাধীদের সঙ্গে আঁতাত করে থাকেন। ফলে অপরাধ দমনে কার্যকর উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে এবং দিন দিন অপরাধের মাত্রা বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংগঠক পারভেজ হাসান সুমন বলেন, “মোহাম্মদপুরের বর্তমান পরিস্থিতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পথচারী—সবাই আতঙ্কে রয়েছেন। অতীতে মোহাম্মদপুর থানার কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ী ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ উঠেছিল। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়।”

তিনি আরও বলেন, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কিশোর গ্যাংগুলো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠে। এসব চক্রের মূল হোতারা গ্রেপ্তার হলে তাদের সহযোগীরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক সেকান্দার আলী বলেন, “মোহাম্মদপুরে বসবাস করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। আমাদের সন্তানরা স্কুল-কলেজে যাতায়াতের সময়ও নিরাপদ নয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমরা আতঙ্কে থাকি।”

ডিএমপির পরিসংখ্যান

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত এক মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী, দস্যু ও মাদক কারবারিসহ ২ হাজার ৮৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৬৫৪ জন চাঁদাবাজ, ৯৭১ জন ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী ও দস্যু এবং ১ হাজার ২১৫ জন মাদক কারবারি। এ সময় ৭৪৪ কেজি গাঁজা, ১ লাখ ৭৯ হাজার ইয়াবা, ৪০৫ গ্রাম হেরোইন, ১ হাজার ২৮১ বোতল ফেনসিডিল, ২৯ গ্রাম আইসসহ বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা ও অবৈধ ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে ছয়জন চীনা নাগরিকসহ মোট নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৫২৩টি মোবাইল ফোন, ২৯৩টি সিম কার্ড এবং ৪১টি যানবাহন।

মোহাম্মদপুর নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা

গত ২ জুন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধপ্রবণ মোহাম্মদপুরকে ঘিরে সরকার পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে এবং এলাকাটি বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে।

তিনি বলেন, “মোহাম্মদপুর এখন অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। রাতারাতি এ সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। তবে আমরা পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছি। এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ এবং নিম্নআয়ের মানুষের বসবাস বেশি হওয়ায় মাদকের বিস্তারও তুলনামূলক বেশি। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনেও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে।”

বিশেষজ্ঞদের মত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, “মোহাম্মদপুরে ছিনতাই, সন্ত্রাস ও মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনো এলাকা যখন অপরাধের রেড জোনে পরিণত হয়, তখন যেসব কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না।”

তিনি আরও বলেন, অপরাধী চক্রগুলো আর্থিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংগঠিত থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। ফলে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।