কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ:২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)-এর অভ্যন্তরে ব্যাপক অস্থিরতা ও অসন্তোষের চিত্র সামনে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের পর দলটির একাংশের মধ্যে নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে একাধিক বিধায়ক প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে দলীয় অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন। এ পরিস্থিতি তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচনে জয়ী হওয়া তৃণমূল কংগ্রেসের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে অন্তত ৫৮ থেকে ৬০ জন বিধায়ক বিভিন্ন সময়ে দলীয় নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অথবা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। যদিও এই সংখ্যাটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট সকল বিধায়ক আনুষ্ঠানিকভাবে দলত্যাগ করেছেন—এমন তথ্য এখনো নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিদ্রোহী অবস্থান গ্রহণ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দলত্যাগ করার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। অনেক বিধায়ক দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছেন কিংবা নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু আইনগত বা সাংগঠনিকভাবে তাঁরা এখনো তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য হিসেবেই বিবেচিত। ফলে প্রকৃতপক্ষে কতজন বিধায়ক দল ছেড়েছেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা এখনো প্রকাশিত হয়নি।
তবে যাঁদের দলত্যাগ বা বহিষ্কারের ঘটনা স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন রিতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মতবিরোধের পর তাঁর বহিষ্কার রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে তিনি শাসক দলের বিভিন্ন নীতি ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা করেন, যা তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
অন্যদিকে, বদুড়িয়ার বিধায়ক কাজী আবদুর রহিমও তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে যাওয়া নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। দলীয় মনোনয়ন না পাওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসে। পরবর্তীতে তিনি দল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তাঁর এই পদক্ষেপ তৃণমূলের অভ্যন্তরে বিদ্যমান ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টির প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে মতপার্থক্য ও নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে যখন সেই অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে আসে এবং জনপ্রতিনিধিরা দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তখন তা দলের সাংগঠনিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেস বর্তমানে সেই ধরনের একটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
তবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তৃণমূল নেতারা দাবি করছেন, দলের বিরুদ্ধে যে ভাঙনের কথা বলা হচ্ছে তা অতিরঞ্জিত এবং অধিকাংশ বিধায়ক এখনো দলের সঙ্গেই রয়েছেন। তাঁদের মতে, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও ব্যক্তিগত অসন্তোষকে কেন্দ্র করে বিরোধীরা রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দাবি করছে, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট ক্রমশ গভীর হচ্ছে এবং আগামী দিনে আরও অনেক নেতা ও জনপ্রতিনিধি দল ছাড়তে পারেন। যদিও এ ধরনের দাবির পক্ষে এখনো সুস্পষ্ট প্রমাণ সামনে আসেনি, তবুও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে যে অস্থিরতার খবর প্রকাশ্যে এসেছে, তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিদ্রোহী শিবিরের কার্যক্রম, দলত্যাগের সম্ভাবনা এবং নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে আগামী মাসগুলোতে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে নজর থাকবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, দলীয় কর্মী ও সাধারণ মানুষের।