ঢাকা, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
সময়: ০৩:৩৭:১৫ PM

গল্প’নেহা

মান্নান মারুফ
10-06-2026 03:37:15 PM
গল্প’নেহা

"এই যে নেহা, তোমাকে দেখে যে এই কুদ্দুসের ভালো লাগে, এতে কি কম লাভ? জীবনে ভালো লাগার মানুষ কোটিতে খুব কমই মেলে। তোমাকে দেখলাম, মনটা ভালো হয়ে গেল—এটাই তো কম নয়।"

কথাগুলো মনে মনে বলছিল কুদ্দুস। কিন্তু মুখে বলার সাহস তার হচ্ছিল না। কারণ ভালো লাগার অনুভূতি যত গভীর হয়, তাকে ভাষায় প্রকাশ করা তত কঠিন হয়ে যায়।

কুদ্দুসের বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। ব্যবসায় সফল মানুষ। শহরের উপকণ্ঠে তার একটি সুন্দর বাগানবাড়ি আছে। দামী গাড়ি আছে, ব্যাংকভর্তি টাকা আছে। সমাজে পরিচিতি আছে, সম্মান আছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, পৃথিবীর সব সুখ যেন তার হাতের মুঠোয়।

কিন্তু মানুষকে দূর থেকে দেখে বিচার করা যায়, তার ভেতরের শূন্যতা দেখা যায় না।

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কুদ্দুস অনুভব করত, জীবনে যেন কিছু একটা নেই। কী নেই, তা সে নিজেও জানত না। বহুবার ভেবেছে, হয়তো আরও অর্থ দরকার। আরও বড় ব্যবসা দরকার। আরও বিলাসিতা দরকার। কিন্তু যতই পেয়েছে, ততই যেন ভেতরের শূন্যতাটা বড় হয়েছে।

একসময় সে ভেবেছিল, সুন্দর একটি বাড়ি তাকে সুখ দেবে। তাই শহরের বাইরে বাগানবাড়ি বানিয়েছিল। সেখানে বিদেশি ফুল, ফলের বাগান, কৃত্রিম জলাশয়—কী নেই!

কিন্তু সন্ধ্যা নামলে সেই বাড়িটা আরও বেশি নির্জন মনে হতো।

তারপর ভেবেছিল, অর্থই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় সুখ। দিনরাত পরিশ্রম করে অঢেল সম্পদ গড়েছে। কিন্তু টাকার হিসাব যত বেড়েছে, হাসির পরিমাণ তত কমেছে।

কুদ্দুস মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করত—

"আমি কি সত্যিই সুখী?"

উত্তর কখনো পেত না।

এরই মধ্যে একদিন তার জীবনে আসে নেহা।

নেহা ছিল পাশের একটি স্কুলের শিক্ষিকা। খুব সাধারণ একটি মেয়ে। না ছিল তার কোনো বিত্তবৈভব, না ছিল কোনো আড়ম্বর। সাদা-নীল শাড়ি পরে প্রতিদিন স্কুলে যেত। মুখে থাকত শান্ত এক হাসি।

প্রথম দিন কুদ্দুস তাকে দেখেছিল এক বিকেলে।

নিজের বাগানবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সে। রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল নেহা। হালকা বাতাসে তার চুল উড়ছিল। সূর্যের শেষ আলো এসে পড়েছিল তার মুখে।

ঘটনাটা খুব সাধারণ ছিল।

কিন্তু কুদ্দুসের কাছে যেন পৃথিবী থেমে গিয়েছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য।

সেদিন রাতে অনেক দিন পর সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখে হাসি দেখেছিল।

পরদিন আবার নেহাকে দেখার অপেক্ষায় ছিল সে।

তারপর একদিন, দুইদিন, তিনদিন...

ধীরে ধীরে কুদ্দুস বুঝতে পারল, নেহাকে দেখলে তার মন ভালো হয়ে যায়। কোনো কথা না বললেও ভালো লাগে। দূর থেকে এক ঝলক দেখলেও ভালো লাগে।

একদিন নিজের মনকে সে বলল—

"কুদ্দুস, তুই এত দিন সুখ খুঁজেছিস কোথায় কোথায়! অথচ সুখ তো কখনো কখনো একটা মানুষের হাসির মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।"

এরপর থেকে নেহাকে দেখা যেন তার প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে গেল।

সকালে স্কুলে যাওয়ার সময়, বিকেলে ফেরার সময়—কুদ্দুস দূর থেকে তাকিয়ে থাকত।

তার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। কোনো দাবি ছিল না। শুধু নেহাকে দেখলে তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসত।

একদিন বাগানের গোলাপগাছের পাশে দাঁড়িয়ে কুদ্দুস ভাবছিল—

"আমি একটু সুখ, একটু আনন্দ পাওয়ার জন্য কত কিছুই না করেছি! বাগানবাড়ি করেছি, অর্থ উপার্জন করেছি, জীবনের পেছনে ছুটেছি। কিন্তু কোথাও তো শান্তি পাইনি। অথচ এই মেয়েটাকে দেখলেই মনে হয়, হৃদয়ের ভেতর কেউ যেন আলো জ্বেলে দিয়েছে।"

দিন যেতে লাগল।

এক বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি নেমে এলো।

নেহা স্কুল থেকে ফিরছিল। রাস্তার পাশে একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আশ্রয় নিল।

কুদ্দুস ছাতা নিয়ে এগিয়ে গেল।

— "আপনি চাইলে ছাতাটা নিতে পারেন।"

নেহা মৃদু হেসে বলল,

— "ধন্যবাদ। তবে আপনি?"

— "আমি ভিজে গেলেও সমস্যা নেই।"

নেহা আবার হেসে উঠল।

সেই হাসি দেখে কুদ্দুসের মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত ফুল যেন একসঙ্গে ফুটে উঠেছে।

সেদিনই তাদের প্রথম কথা হয়।

এরপর ধীরে ধীরে পরিচয় বাড়তে লাগল।

নেহা ছিল সহজ-সরল মনের মানুষ। মানুষের প্রতি তার মমতা ছিল অসাধারণ। স্কুলের দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিজের বেতন থেকে সাহায্য করত।

কুদ্দুস অবাক হয়ে দেখল, যে মেয়েটির ব্যাংকে কোটি টাকা নেই, সে-ই সবচেয়ে বেশি সুখী।

একদিন নেহা তাকে জিজ্ঞেস করল,

— "আপনি এত বড় ব্যবসায়ী। নিশ্চয়ই খুব সুখে আছেন?"

কুদ্দুস কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— "এক সময় ভাবতাম সুখ কিনে নেওয়া যায়। এখন বুঝেছি, সুখ আসলে অনুভবের বিষয়।"

— "তাহলে এখন সুখী?"

নেহার প্রশ্ন শুনে কুদ্দুস তার দিকে তাকাল।

মৃদু হেসে বলল,

— "হ্যাঁ। কারণ এখন এমন একজন মানুষকে দেখলে আমার মন ভালো হয়ে যায়, যার কাছে আমার কোনো দাবি নেই।"

নেহা লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকাল।

সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল।

বাতাসে গোলাপের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল।

সেই মুহূর্তে কুদ্দুস অনুভব করল, সুখ আসলে কোনো প্রাসাদে থাকে না। সুখ থাকে মানুষের হৃদয়ে। সুখ থাকে কারও উপস্থিতিতে। সুখ থাকে একটি নির্মল হাসিতে।

বছরের পর বছর যে আনন্দকে সে অর্থের পাহাড়ে খুঁজেছে, তা হয়তো লুকিয়ে ছিল একজন সাধারণ মানুষের চোখের মায়ায়।

সেদিন বাড়ি ফিরে কুদ্দুস ডায়েরিতে লিখেছিল—

"নেহা, তোমাকে দেখে আমার ভালো লাগে। এতে কি কম লাভ? জীবনে ভালো লাগার মানুষ কোটিতে একজনই মেলে। তোমাকে একবার দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। এত দিন সুখের জন্য কত কিছু করেছি, অথচ তোমার একটি হাসিই আমাকে বুঝিয়ে দিল—সুখ কেনা যায় না, সুখ অনুভব করতে হয়।"

জানালার বাইরে তখন পূর্ণিমার আলো।

আকাশভরা তারা।

আর কুদ্দুসের হৃদয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল এক অদৃশ্য সুখের পাহাড়—যার নাম নেহা।

সমাপ্ত।।