ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:০৮:০৬ AM

ইয়াসের খানের উদ্যোগে স্বস্তি ফিরল কোটি ফুটবলপ্রেমীর

মান্নান মারুফ
11-06-2026 12:08:06 AM
ইয়াসের খানের উদ্যোগে স্বস্তি ফিরল কোটি ফুটবলপ্রেমীর

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বাংলাদেশের কোটি মানুষের আবেগ, উন্মাদনা এবং উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রিয় দলের পতাকা, রাতভর খেলা দেখা এবং বিশ্ব ফুটবলের মহারণ নিয়ে আলোচনা—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ বাঙালির কাছে এক বিশেষ আয়োজন। তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে একসময় দেখা দিয়েছিল বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন উঠেছিল, বাংলাদেশের দর্শকরা আদৌ টেলিভিশন কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে পারবেন কি না।

অবশেষে সেই শঙ্কার অবসান ঘটেছে। সরকারের উদ্যোগ, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সহযোগিতায় নিশ্চিত হয়েছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার। ফলে দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমী এখন নিশ্চিন্তে বিশ্বকাপ উপভোগ করতে পারবেন।

সংকটের শুরু

কয়েক সপ্তাহ আগে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড প্রথমে ফিফার কাছ থেকে বাংলাদেশের সম্প্রচার স্বত্ব অর্জন করে। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা এই স্বত্ব তারা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি স্বত্বটি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

এর ফলে বিশ্বকাপ শুরুর অল্প সময় আগে বাংলাদেশে কোনো স্বীকৃত সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান অবশিষ্ট ছিল না। স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও উচ্চমূল্যের কারণে সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে আগ্রহ দেখায়নি। সীমিত বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, বিজ্ঞাপন আয়ের অনিশ্চয়তা এবং ম্যাচগুলোর সময়সূচি এই অনাগ্রহের অন্যতম কারণ ছিল।

ফলে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয় যে, হয়তো এবারের বিশ্বকাপ সরাসরি দেখার সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হতে পারেন।

সরকারের হস্তক্ষেপ

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে উদ্যোগ নেয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। পুরো প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি বিষয়টিকে শুধুমাত্র একটি সম্প্রচার চুক্তি হিসেবে নয়, বরং কোটি মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জাতীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করেন।

মন্ত্রণালয়ের তৎপরতার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নবনির্বাচিত বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় প্রক্রিয়ায় তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখেন। ফিফা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্থানীয় অংশীজনদের যোগাযোগ সহজতর করতেও তিনি সহায়তা করেন।

এক সাক্ষাৎকারে তাবিথ আউয়াল বলেন, বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিশ্চিত না হওয়া বাংলাদেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর জন্য হতাশাজনক হতো। একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, যৌক্তিক বাণিজ্যিক শর্তে সম্প্রচারের ব্যবস্থা করতে না পারলে সেটি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হতো।

বিকল্প আয়ের পথ অনুসন্ধান

সংকট সমাধানে মন্ত্রণালয় ও বাফুফে যৌথভাবে বিভিন্ন স্পোর্টস চ্যানেল, জাতীয় গণমাধ্যম, টেলিকম কোম্পানি এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। শুধু প্রচলিত বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর নির্ভর না করে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও খোঁজা হয়।

বিশেষ করে ডিজিটাল সম্প্রচার, টেলিকম পার্টনারশিপ এবং সাব-লাইসেন্সিংয়ের মতো নতুন আয়ের উৎসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এর আগে বাংলাদেশের কোনো বিশ্বকাপ সম্প্রচার চক্রে এসব সম্ভাবনাকে এত বিস্তৃতভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

ব্যয়বহুল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

এক সংবাদ সম্মেলনে ইয়াসের খান চৌধুরী জানান, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল। একটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিনিময়ে স্বত্ব কেনার প্রস্তাব দেয়।

সরকার সেই প্রস্তাবকে অযৌক্তিক বলে মনে করে এবং তা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তাই উচ্চমূল্যের প্রস্তাব গ্রহণ না করে সরাসরি ফিফার সঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছতা বজায় রেখে এমন একটি সমাধান বের করা, যাতে দেশের মানুষ বিশ্বকাপ দেখতে পারেন এবং একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় না ঘটে।

সরাসরি ফিফার সঙ্গে আলোচনা

পরবর্তীতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সরাসরি ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। এই আলোচনায় বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালও যুক্ত হন। দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক বৈঠক, আলোচনা এবং দরকষাকষির মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়।

প্রতিমন্ত্রীর মতে, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ফিফার সঙ্গে আলোচনা করাই ছিল এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। এর ফলে চুক্তির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

অতীতের তুলনায় বড় সাশ্রয়

সংবাদ সম্মেলনে ইয়াসের খান চৌধুরী অতীতের চুক্তিগুলোর সঙ্গে বর্তমান ব্যবস্থার তুলনা করেন। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সময়ে বিটিভি বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেও উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা অর্জন করতে পারেনি।

তার মতে, এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিটিভিকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে না, আবার সম্প্রচার সুবিধাও নিশ্চিত হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হবে না।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, অতীতে যেসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোতে মূল লাভের অংশ অন্য পক্ষের কাছে চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

৪৭ কোটি টাকায় চূড়ান্ত চুক্তি

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী জানান, ফিফার সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৪৭ কোটি টাকার সমান।

এই চুক্তির মাধ্যমে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নিশ্চিত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্থ সরাসরি বিটিভির তহবিল থেকে ব্যয় করতে হবে না।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, টেলিকম অংশীদারত্ব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সাব-লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা হবে। ফলে বিটিভির আর্থিক ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে আসবে।

তিন টিভি চ্যানেলের কনসোর্টিয়াম

এই সম্প্রচার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তিনটি জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলকে নিয়ে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সম্প্রচারের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দর্শকরা সহজেই বিশ্বকাপ উপভোগ করতে পারবেন।

এছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও সম্প্রচারের সুযোগ থাকায় তরুণ দর্শক ও অনলাইন ব্যবহারকারীরাও সহজে খেলা দেখতে পারবেন।

স্বস্তির বার্তা

দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর অবশেষে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা স্বস্তির খবর পেয়েছেন। সরকারের উদ্যোগ, বাফুফের সহযোগিতা এবং ফিফার সঙ্গে সফল আলোচনার ফলে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে আর কোনো শঙ্কা নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত সময়ের মধ্যে বিকল্প সমাধান খুঁজে বের করা এবং তুলনামূলক কম খরচে সম্প্রচার স্বত্ব নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। একইসঙ্গে এটি দেখিয়েছে যে, পরিকল্পিত আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বড় ধরনের সংকটও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।

ফলে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কোটি দর্শক আবারও প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে পারবেন। দেশের ঘরে ঘরে, চায়ের আড্ডায় এবং ডিজিটাল পর্দায় ফিরবে বিশ্বকাপের সেই চিরচেনা উন্মাদনা।