পর্ব:-৩
কুদ্দুছের ভালোবাসায় কোনো নোংরামি ছিল না—এটা সে নিজের ভেতরের ভালবাসা। যেমন অনুভব করত, তেমনি তার প্রতিটি আচরণেও সেই সত্য স্পষ্ট ছিল। সে কখনও স্পর্শের স্বপ্ন দেখেনি, কখনও কোনো অশালীন কল্পনায় নিজেকে ডুবায়নি। তার ভালোবাসা ছিল দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা এক ধরনের পূজা—নিঃশব্দ, নির্লোভ, এবং গভীর ভালবাসা।
সে শুধু ভালোবাসত।
অনেক ভালোবাসত।
কেন যে মেহরিনকে এত ভালোবাসত—সে নিজেও জানত না।
এই প্রশ্নটা প্রায়ই তাকে তাড়া করত। রাতের নির্জনতায়, ছাদের কোণে বসে, কিংবা বইয়ের পাতার ফাঁকে হঠাৎ থেমে গিয়ে সে নিজেকে জিজ্ঞেস করত—
“কেন?”
কোনো উত্তর আসত না।
শুধু মনে পড়ত কিছু ছোট ছোট মুহূর্ত—মেহরিনের হাসি, কথা বলার ভঙ্গি, চুলে হাত দেওয়ার অভ্যাস, কিংবা হঠাৎ করে চুপ হয়ে যাওয়ার সময়ের সেই গভীর চোখ।
এই টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলোই যেন তাকে বেঁধে ফেলেছিল।
একদিন বিকেলে কুদ্দুছ একা বসে ছিল কলেজের পেছনের পুরনো বাদাম গাছটার নিচে। জায়গাটা তার খুব প্রিয়। এখানে খুব কম মানুষ আসে। সে এখানে বসে নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারে।
আজও সে সেই প্রশ্নটা নিয়ে বসেছে।
“আমি কি তাকে ভালোবাসার কোনো কারণ খুঁজে পেয়েছি?”
সে নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিল—
“না।”
তারপর আবার ভাবল—
“তাহলে কি কারণ ছাড়াই ভালোবাসা সম্ভব?”
মনে হলো—হ্যাঁ, সম্ভব।
কারণ, তার ভালোবাসা কোনো যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটা যেন হঠাৎ করে জন্ম নেওয়া এক অনুভূতি, যেটা ধীরে ধীরে তার পুরো সত্তাকে দখল করে নিয়েছে।
কিন্তু মেহরিন কী ভাবত—এটা কুদ্দুছ কখনও বুঝতে পারেনি।
সে চেষ্টা করেছে, অনেকবার। কিন্তু কোন লাভ হয় নি।
মেহরিনের চোখের ভাষা বুঝতে, তার কথার ভেতরের অর্থ খুঁজতে, তার নীরবতার মানে যেন...।
কিন্তু প্রতিবারই সে ব্যর্থ হয়েছে।
কখনও মনে হয়েছে—মেহরিন তাকে ঘৃণা করে না, আবার ভালোও বাসেও না। শুধু একজন অচেনা মানুষের মতো দেখে।
আবার কখনও মনে হয়েছে—মেহরিনের চোখে তার প্রতি বিরক্তি আছে।
এই দ্বন্দ্বটাই কুদ্দুছকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
একদিন হঠাৎ করেই সে একটা কথা শুনে ফেলল—যেটা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
সেদিন দুপুরে সে করিডোর দিয়ে যাচ্ছিল। সামনে কিছুটা দূরে মেহরিন দাঁড়িয়ে ছিল তার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সঙ্গে। কুদ্দুছ সাধারণত এড়িয়ে চলে, কিন্তু আজ অজান্তেই তার পা থেমে গেল।
কারণ, সে নিজের নাম শুনতে পেল।
“ওই ছেলেটাকে আমি একদম পছন্দ করি না,”—মেহরিনের কণ্ঠ।
কুদ্দুছের বুক ধক করে উঠল।
তারপর সে শুনল—
“সবসময় আমার পেছনে ঘোরে। একদম লুচ্চা টাইপ।”
শব্দটা এবার সরাসরি তার কানে ঢুকে গেল।
যদিও মেহরিন তাকে মুখোমুখি বলেনি, কিন্তু আজকের এই কথাটা যেন বেশি গভীরভাবে আঘাত করল।
কারণ, এটা ছিল তার অজান্তে দেওয়া এক রায়—যেটা সে প্রতিহত করার সুযোগও পায়নি।
কুদ্দুছ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পা যেন নড়ছিল না।
তার মনে হচ্ছিল—সে যেন কোনো আদালতে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হয়ে গেছে, কিন্তু সে নিজের পক্ষে কিছু বলার সুযোগ পায়নি।
সে ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে গেল।
কেউ তাকে দেখেনি, কেউ তার উপস্থিতি টের পায়নি।
কিন্তু তার ভেতরে তখন কষ্টের ঝড় বইছে।
সেই দিনটা কুদ্দুছের জন্য ছিল এক নতুন উপলব্ধির দিন।
সে বুঝতে পারল—মেহরিন শুধু ভুল বুঝছে না, বরং তার সম্পর্কে একটা স্থির ধারণা তৈরি করে ফেলেছে।
আর সেই ধারণাটা ভীষণ কষ্টদায়ক।
রাতে সে ডায়েরি খুলল।
অনেকক্ষণ কলম হাতে নিয়ে বসে রইল। লিখতে পারছিল না।
অবশেষে সে লিখল—
“আজ আমি জানলাম—
তুমি আমাকে লুচ্চা ভাবো।
আমার সামনে বলোনি, কিন্তু অন্যকে বলেছো।
হয়তো এটাকেই সত্যি বলা হয়—
যেটা আমরা সামনে বলি না, কিন্তু পেছনে বলি।”
তার হাত কাঁপছিল।
সে আবার লিখল—
“আমি কি সত্যিই তোমাকে বিরক্ত করি?
আমি কি তোমার জন্য অস্বস্তির কারণ?
যদি তাই হয়, তাহলে আমার ভালোবাসা কি ভুল?”
কুদ্দুছের মনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন শুরু হলো।
আগে সে নিজের কষ্টকে ছোট করে দেখত—ভাবত, এটা ভালোবাসার অংশ।
কিন্তু আজ সে বুঝতে পারছে—তার ভালোবাসা অন্য কারও কাছে কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই উপলব্ধিটাই তাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল।
পরদিন থেকে সে আরও দূরে সরে গেল।
এখন সে শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও দূরত্ব তৈরি করতে চাইছে।
সে নিজেকে বোঝাচ্ছে—
“যাকে ভালোবাসি, তাকে কষ্ট দেওয়া আমার কাজ না।”
তাই সে ঠিক করল—মেহরিনের জীবনে সে আর কোনো ছায়া ফেলবে না।
কিন্তু ভালোবাসা কি এত সহজে মুছে ফেলা যায়?
কুদ্দুছ চেষ্টা করছে—নিজেকে ব্যস্ত রাখতে, অন্যদিকে মন দিতে।
কিন্তু হঠাৎ করেই কোনো গন্ধ, কোনো গান, কিংবা কোনো দৃশ্য তাকে আবার মেহরিনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
তখন সে থেমে যায়।
চোখ বন্ধ করে ফেলে।
আর মনে মনে বলে—
“না, আর না…”
একদিন বিকেলে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল কুদ্দুছ। ভিজছিল, কিন্তু সরে যাচ্ছিল না।
তার মনে হচ্ছিল—এই বৃষ্টি যেন তার ভেতরের সব কষ্ট ধুয়ে নিয়ে যাবে।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি—এটা কি আমার অপরাধ?
যদি হয়, তাহলে আমি সেই অপরাধ বারবার করব।
কিন্তু তোমাকে আর কষ্ট দেব না—এই প্রতিজ্ঞা করলাম।”
এই প্রতিজ্ঞাটাই এখন তার নতুন পথ।
সে ভালোবাসবে—কিন্তু দূর থেকে।
সে অনুভব করবে—কিন্তু প্রকাশ করবে না।
সে কষ্ট পাবে—কিন্তু কাউকে বুঝতে দেবে না।
ডায়েরির শেষ পাতায় সে লিখল—
“তুমি আমাকে লুচ্চা ভাবো—ঠিক আছে।
আমি তোমাকে দোষ দিই না।
কারণ, তুমি আমার ভালোবাসার ভেতরটা দেখোনি।
তুমি শুধু আমার উপস্থিতিটা দেখেছো।”
তারপর সে একটা দাগ টানল।
যেন একটা অধ্যায়ের শেষ।
কিন্তু আসলে—এটা ছিল আরও গভীর এক গল্পের শুরু।
কুদ্দুছ এখন নিজেকে নতুনভাবে গড়ছে—একটা নীরব, সহনশীল, অথচ ভেতরে ভীষণ শক্ত মানুষ হিসেবে।
আর তার ভালোবাসা?
সেটা এখনও আগের মতোই—পবিত্র, গভীর, আর একতরফা।
(চলবে…)