পর্ব – ২
ব্রহ্মপুত্রের জল যেমন কখনো স্বচ্ছ, কখনো ঘোলা হয়ে ওঠে, তেমনি মানুষের সম্পর্কের গল্পও কখনো সত্যে ভরা, আবার কখনো মিথ্যার আস্তরণে ঢাকা। এই গ্রামের মানুষ যেটুকু দেখে, সেটুকুকেই সত্য বলে ধরে নেয়; আর যেটুকু জানে না, সেটাকে নিজেদের মতো করে বানিয়ে নেয়।
রিমা আর মজিবুর রহমানের সম্পর্ক নিয়েও ঠিক এমনটাই হয়েছে।
গ্রামের মানুষ জানে—ওরা আপন কেউ নয়। এই তথ্যটাই যেন তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সত্য। আর এই সত্যের ওপর দাঁড়িয়েই তারা গড়ে তুলেছে হাজারো মিথ্যার গল্প।
কিন্তু প্রকৃত সত্যটা অন্যরকম।
কয়েক বছর আগের কথা।
সেই সময়টা বর্ষার। ব্রহ্মপুত্র ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। আকাশে কালো মেঘ, নদীতে উত্তাল ঢেউ। গ্রামের পাশ দিয়ে চলা ছোট ছোট নৌকাগুলোও যেন ভয় পেতে শুরু করেছিল সেই নদীকে।
সেদিন সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ ঝড় উঠল। প্রথমে হালকা বাতাস, তারপর তীব্র দমকা হাওয়া। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ অন্ধকার হয়ে গেল। বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল, আর নদীর ঢেউ যেন ক্রমশ উন্মত্ত হয়ে উঠল।
সেই সময় একটি ছোট নৌকায় করে ফিরছিল রিমা, তার বাবা আর মা।
নৌকাটা মাঝনদীতে পৌঁছাতেই ঝড় আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। মাঝি প্রাণপণে চেষ্টা করছিল নৌকাটাকে সামলাতে, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা কি এত সহজ?
একটা বিশাল ঢেউ এসে নৌকাটাকে উল্টে করে দিল।
তারপর আর কিছু মনে নেই।
পরদিন সকালে গ্রামের লোকজন নদীর পাড়ে জড়ো হলো। খবর ছড়িয়ে পড়েছে—নৌকা ডুবে গেছে।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া গেল রিমার বাবা-মায়ের নিথর দেহ। নদী যেন তাদের কেড়ে নিয়েছে চিরদিনের জন্য।
আর রিমা?
সে তখন এক ঝোপের পাশে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল। হয়তো কোনোভাবে স্রোতের টানে ভেসে এসে তীরে উঠেছিল।
চোখ খুলে যখন সে চারপাশ দেখল, তখন তার পৃথিবীটা যেন হঠাৎ শূন্য হয়ে গেছে।
“মা কোথায়?”—সে কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করছিল।
কেউ কোনো উত্তর দিতে পারছিল না।
গ্রামের মানুষজন তখন এক জায়গায় জড়ো হয়ে আলোচনা শুরু করল। কে নেবে এই মেয়েটার দায়িত্ব?
কেউ এগিয়ে এলো না।
“আমার তো নিজের সংসারই চলে না”—একজন বলল।
“মেয়ে মানুষ, বড় হইলে ঝামেলা”—আরেকজন যুক্তি দিল।
“এতিমখানায় পাঠানোই ভালো”—কেউ একজন সিদ্ধান্তের সুরে বলল।
সবাই যেন স্বস্তি পেল এই সহজ সমাধানে।
কিন্তু তখনই সামনে এসে দাঁড়ালেন মজিবুর রহমান।
তিনি অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ সব শুনছিলেন। তার চোখে ছিল গভীর এক কষ্ট, আর মুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“এতিমখানায় যাবে কেন?”—তিনি ধীরে কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন।
সবাই তার দিকে তাকালো।
“আপনি কি নেবেন?”—কেউ একজন কটাক্ষ করল।
মজিবুর রহমান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বললেন, “হ্যাঁ, নেব। ও আমার নাতনি। আমার ঘরেই থাকবে।”
লোকজন হেসে উঠল।
“নাতনি! কবে থেকে?”
“এই বয়সে নতুন নাটক শুরু করলেন নাকি?”
কিন্তু তিনি কোনো কথার জবাব দিলেন না। শুধু এগিয়ে গিয়ে কাঁদতে থাকা রিমার পাশে বসে তার মাথায় হাত রাখলেন।
“চল মা, আমার সঙ্গে চল।”
সেই দিন থেকেই রিমার নতুন জীবন শুরু।
প্রথম প্রথম সে কিছুই বুঝতে পারত না। রাতের বেলা কাঁদত, ঘুমের মধ্যে চমকে উঠত। মা-বাবাকে খুঁজত।
মজিবুর রহমান তাকে কখনো একা ছাড়েননি।
তিনি নিজে রান্না করতেন এবং ওকে খাওয়াতেন। কিছুদিন যেতেই স্কুলে ভর্তি করালেন। রাতে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন।
ধীরে ধীরে রিমা তাকে “দাদু” বলে ডাকতে শুরু করল।
রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, মনের সম্পর্ক যে কত গভীর হতে পারে—সেটার জীবন্ত প্রমাণ হয়ে উঠল তাদের জীবন।
কিন্তু সমাজ কি সেটা মেনে নিল?
না।
বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিয়ে সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।
“মেয়েটা বড় হইতেছেৃ”
“এক ঘরে থাকেৃ”
“এটা কি ঠিক?”
এই কথাগুলো যেন গ্রামের বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল।
একদিন দুপুরে চায়ের দোকানে বসে কয়েকজন লোক আবার সেই একই প্রসঙ্গ তুলল।
“আসল কথা কী জানেন?”—একজন গম্ভীর মুখে বলল—“এতদিনে বোঝা যাচ্ছে, ব্যাপারটা ঠিক না।”
“কেন?”
“এই বয়সে একটা পুরুষ মানুষ আর একটা বড় হইতেছে মেয়ে—একসাথে থাকে! কিছু না কিছু তো আছেই!”
এই কথাগুলো শুনে পাশেই বসে থাকা একজন বয়স্ক লোক বললেন, “তোমরা যা ভাবছো, সেটা যদি সত্যি না হয়?”
“তাহলে?”—একজন হেসে বলল—“আগুন ছাড়া ধোঁয়া হয় নাকি?”
এই ‘আগুন’ আর ‘ধোঁয়া’র যুক্তিই যেন তাদের কাছে চূড়ান্ত সত্য।
ওদিকে রিমা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। সে এখন অনেক কিছু বোঝে।
একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে সে দুইজন মেয়ের কথা শুনে ফেলল।
“ওই মেয়েটার কথা শুনছিস?”
“কোনটা?”
“ওই যে মজিবুর রহমানের সঙ্গে থাকেৃ”
“হুম, বুঝছি। গ্রামের লোকজন যা বলে, সব মিথ্যা হয় না!”
রিমা থেমে গেল।
তার মনে হলো, মাটির নিচে ঢুকে যাই।
কিন্তু সে আবার হাঁটতে শুরু করল। কারণ সে জানে—এই লড়াই থেকে পালিয়ে গেলে চলবে না।
সেদিন রাতে সে অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিল।
মজিবুর রহমান বুঝতে পারলেন।
“কিছু বলবি মা?”—তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
রিমা ধীরে ধীরে বলল, “আমরা কি কিছু ভুল করছি?”
তিনি একটু চমকে উঠলেন।
“কেন এমন বলছিস?”
“মানুষ যা বলেৃ যদি সত্যি না হয়, তাও তো তারা বিশ্বাস করে। তাহলে কি আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত?”
এই কথাটা শুনে মজিবুর রহমানের বুক কেঁপে উঠল।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন—
“মানুষের কথার জন্য যদি আমরা নিজেদের সম্পর্ক ভেঙে ফেলি, তাহলে তো তাদেরই জয় হবে। ভালোবাসা কখনো লুকিয়ে রাখার জিনিস না, আবার প্রমাণ করারও দরকার নেই। এটা শুধু অনুভব করার বিষয়।”
রিমার চোখ ভিজে উঠল।
“কিন্তু কষ্ট হয়, বাবাৃ”
“হবে,”—তিনি মৃদু হেসে বললেন—“ভালো মানুষদেরই বেশি কষ্ট হয়। কারণ তারা অন্যায়ের সাথে আপস করে না।”
সেই রাতে রিমা প্রথমবারের মতো নিজের ভেতরে এক ধরনের শক্তি অনুভব করল।
সে বুঝল—ভালোবাসা মানে শুধু কারো পাশে থাকা নয়, বরং তার জন্য সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসও থাকা।
পরদিন সকালে যখন সে কলেজে যাওয়ার জন্য বের হলো, তখন তার হাঁটার ভঙ্গিতে একটা পরিবর্তন ছিল। মাথা নিচু নয়—সোজা।
মানুষ এখনো তাকাচ্ছে। বাঁকা চোখে।
কিন্তু সেই দৃষ্টি যেন আজ আর তাকে আগের মতো ভেঙে দিতে পারছে না।
কারণ সে জানে—তার পাশে একজন মানুষ আছে, যে তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে।
আর সেই ভালোবাসার শক্তি—যেকোনো বাঁকা চোখের চেয়েও বড়।
গ্রামের ফিসফাস এখনো থামেনি। বরং আরও বেড়েছে।
কিন্তু সেই শব্দের মাঝেই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এক অন্যরকম গল্প—একটি সম্পর্কের, একটি সাহসের, আর এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গল্প।
যে ভালোবাসা রক্তের সম্পর্ক চেনে না, সমাজের নিয়ম মানে না—শুধু একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসে।
(চলবেৃ)