ঢাকা, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৫:২৪:৪২ PM

উপন্যাস:“সম্পর্ক”

মান্নান মারুফ
03-04-2026 03:54:46 PM
উপন্যাস:“সম্পর্ক”

পর্ব ২

কুদ্দুছের একটা কথা নীপার মনে এখন আর শুধু একটা মতামত নয়, ধীরে ধীরে বাস্তবতার মতো ঠেকতে শুরু করেছে। একসময় যে কথায় সে হাসত, এখন সেই কথাই তার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে থাকে।

মানুষ আসলে সামাজিক জীব—একসঙ্গে থাকতে থাকতে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়, এটাকেই মানুষ ভালবাসা বলে ধরে। কুদ্দুছের এই যুক্তি হয়তো পুরোপুরি ভুল নয়—কিন্তু নীপা কখনোই এটা মেনে নিতে পারেনি। কারণ তার কাছে ভালবাসা মানে ছিল অনুভূতি, মায়া, আর এক ধরনের গভীর টান। কিন্তু এখন সে বুঝতে শুরু করেছে—এই টানটা কি সত্যিই ভালবাসা, নাকি শুধু অভ্যাস?

দিনগুলো আগের মতোই চলছিল, কিন্তু কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন এসে গেছে। কুদ্দুছ আগের মতো সময় দিচ্ছে না। ফোনে কথা কমে গেছে, মেসেজের উত্তর দিতেও দেরি হচ্ছে। নীপা প্রথমে বিষয়টা হালকাভাবে নিলেও ধীরে ধীরে তার মনে সন্দেহ জন্মাতে শুরু করল।

একদিন বিকেলে ক্যাম্পাসে বসে নীপা অপেক্ষা করছিল। কুদ্দুছ বলেছিল, সে আসবে। কিন্তু এক ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও সে এল না। ফোন করলে বন্ধ। নীপার মনে অজানা একটা অস্থিরতা কাজ করতে লাগল।

পরের দিন কুদ্দুছ স্বাভাবিকভাবে এসে বলল, “গতকাল একটু ব্যস্ত ছিলাম।”

নীপা অবাক হয়ে তাকাল। “একটা মেসেজও দিতে পারলে না?”

কুদ্দুছ কাঁধ ঝাঁকাল। “এত সিরিয়াস হওয়ার কি আছে?”

এই কথাটা যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল।
“আমি কি তোমার কাছে এতটাই গুরুত্বহীন?”—নীপার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

কুদ্দুছ একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “তুমি সবকিছুতেই বেশি রিঅ্যাক্ট করো।”

সেদিন আর কথা বাড়েনি। কিন্তু তাদের সম্পর্কের ভেতরে একটা ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠল।

এরপর থেকেই নীপা লক্ষ্য করতে লাগল—কুদ্দুছ যেন তাকে এড়িয়ে চলছে। আগের মতো চোখে চোখ রাখে না, কথা বললেও কোথাও যেন একটা দূরত্ব থাকে।

একদিন হঠাৎ করে নীপা দেখল, কুদ্দুছ ক্যাম্পাসের এক নতুন মেয়ের সাথে কথা বলছে। মেয়েটার নাম তানিয়া—নতুন ভর্তি হয়েছে। হাসিখুশি, আত্মবিশ্বাসী, আর দেখতে খুবই আকর্ষণীয়।

নীপার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই কেঁপে উঠল।

সে নিজেকে বোঝাতে চাইল—“এটা স্বাভাবিক। নতুন মানুষদের সাথে কথা বলতেই পারে।” কিন্তু মনটা কিছুতেই মানতে চাইছিল না।

সেদিন রাতে নীপা কুদ্দুছকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি ওই মেয়েটার সাথে বেশি সময় কাটাচ্ছ?”

কুদ্দুছ অবাক হয়ে বলল, “তানিয়া? সে তো শুধু ক্লাসমেট।”

“শুধু ক্লাসমেট?”
“হ্যাঁ, আর কি?”

নীপা চুপ করে গেল। কিন্তু তার মনে সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গেছে।

দিন যত যেতে লাগল, সেই সন্দেহ ততই বাড়তে লাগল। কুদ্দুছ এখন প্রায়ই তানিয়ার কথা বলে, তার সাথে গ্রুপ স্টাডি করে, মাঝে মাঝে একসাথে ক্যাফেটেরিয়ায় বসে।

নীপা বুঝতে পারছিল—কিছু একটা বদলে যাচ্ছে।

একদিন সে সরাসরি বলেই ফেলল, “তুমি কি ওকে পছন্দ করো?”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুমি কেন এমন ভাবছ?”

“কারণ তুমি বদলে গেছ।”

কুদ্দুছ একটু হেসে বলল, “মানুষ বদলায়, এটা স্বাভাবিক।”

এই কথাটা যেন নীপার হৃদয়ে আরেকটা আঘাত করল।

সে বুঝতে পারছিল—কুদ্দুছ ধীরে ধীরে তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু সে কিছুই করতে পারছিল না।

কারণ সত্যিটা হল—সে কুদ্দুছকে ছাড়া থাকতে পারছিল না।

এই সম্পর্কটা এখন আর শুধু ভালবাসা নয়—এটা এক ধরনের নির্ভরতা, এক ধরনের আসক্তি।

একদিন নীপা তার এক বান্ধবীকে বলল, “আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।”

বান্ধবীটা শান্তভাবে বলল, “কেউ কারো জন্য মরে না। সময় হলে সবাই সবকিছু ভুলে যায়।”

নীপা মাথা নাড়ল। “না, আমি পারব না।”

কিন্তু জীবন অনেক সময় এমন কিছু প্রমাণ করে, যা আমরা কখনোই বিশ্বাস করতে চাই না।

কয়েক সপ্তাহ পর, কুদ্দুছের আচরণ আরও বদলে গেল। এখন সে নীপার সাথে খুব কম কথা বলে। প্রয়োজন ছাড়া যোগাযোগই করে না।

একদিন নীপা আর সহ্য করতে পারল না। সে কুদ্দুছকে ডেকে বলল, “আমাদের কি হচ্ছে?”

কুদ্দুছ শান্তভাবে বলল, “কিছুই না।”

“কিছুই না? তুমি কি বুঝতে পারছ না, তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ?”

কুদ্দুছ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “দেখো, আমরা হয়তো একটু বেশি সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিলাম।”

“মানে?”
“মানে… এটা হয়তো শুধু একটা ফেজ ছিল।”

এই কথাটা শুনে নীপার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।

“তাহলে আমাদের সবকিছু মিথ্যা ছিল?”
কুদ্দুছ সরাসরি উত্তর দিল না। শুধু বলল, “মানুষের অনুভূতি বদলায়।”

নীপার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।
“তুমি কি আমাকে আর ভালবাসো না?”

কুদ্দুছ আবার সেই পুরোনো উত্তরটাই দিল, “আমি কখনো বলিনি যে আমি তোমাকে ভালবাসি।”

এই কথাটা যেন সবকিছুর শেষ করে দিল।

সেদিন নীপা বুঝতে পারল—যে সম্পর্কটাকে সে এতদিন ভালবাসা ভেবেছিল, সেটা হয়তো সত্যিই শুধু একটা অভ্যাস ছিল।

কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না—এই ধারণাটাও ভেঙে যেতে শুরু করল।

কারণ কুদ্দুছ খুব সহজেই দূরে সরে যাচ্ছে।

আর নীপা? সে এখনও সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে থেকে তারা শুরু করেছিল।

এরপর থেকে তাদের দেখা হলেও কথা হয় না। একই ক্যাম্পাসে থেকেও তারা যেন দুই ভিন্ন জগতের মানুষ।

একদিন নীপা দূর থেকে দেখল—কুদ্দুছ আর তানিয়া একসাথে হাঁটছে, হাসছে।

সেই দৃশ্যটা তার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে ফেলল।

সে ভাবল, “এটাই কি ভালবাসা? এত সহজে বদলে যায়?”

হয়তো সত্যিই ভালবাসা একটা ধোঁকা।

অনেকেই ভালবাসার অভিনয় করে প্রেমে পড়ে। কিন্তু যখন অন্য কোথাও বেশি লাভজনক কিছু পায়, তখন সেই প্রেম আর থাকে না।

কুদ্দুছের ক্ষেত্রেও কি তাই হল?

নীপা উত্তর খুঁজে পেল না।

শুধু বুঝতে পারল—তাদের সম্পর্কটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু এই শেষটা হঠাৎ করে নয়—ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে।

যেন একটা গল্প, যার শেষটা কেউ লিখতে চায়নি—তবুও শেষ হয়ে যাচ্ছে।

আর এই শেষের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পরবর্তী অধ্যায়ের শুরু—যেখানে তারা হয়তো দুই প্রান্তে চলে যাবে।

কিন্তু সেই পথটা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি…

চলবে..........