ঢাকা, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬,
সময়: ১০:৪৭:২০ PM

উপন্যাস: শেষ নিঃশ্বাস

মান্নান মারুফ
29-03-2026 08:59:47 PM
উপন্যাস: শেষ নিঃশ্বাস

পর্ব–৫

যে খোঁজ নিত, সে তা আজ অন্যকে নিয়ে ব্যস্ত। সে হয়তো জানে না কুদ্দুছ কেমন আছে, খবরও রাখে না এখন। কুদ্দুছ ভালোবাসা হারিয়ে নিজেকেও হারিয়ে ফেলেছে।

ভোরের আলো ধীরে ধীরে জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছে। কিন্তু সেই আলো কুদ্দুছের জীবনে কোনো নতুনত্ব আনতে পারছে না। তার কাছে সকাল আর রাতের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। দুটোই এখন সমান নিঃসঙ্গ, সমান ভারী।

একসময় এই সকালগুলোতেই ফোন বেজে উঠতো।
“ঘুম থেকে উঠেছো?”—মায়ার কণ্ঠ ভেসে আসতো।
কুদ্দুছ আধো ঘুমে হাসতো, “তুমি না ডাকলে উঠতাম না।”

আজ আর সেই ফোন আসে না।

যে খোঁজ নিত, সে আজ অন্যকে নিয়ে ব্যস্ত।

এই সত্যটা কুদ্দুছ মেনে নিয়েছে—কিন্তু অনুভব করা বন্ধ করতে পারেনি। মায়া এখন অন্য কারো জীবনের কেন্দ্র, অন্য কারো ভালোবাসার মানুষ। তার দিন শুরু হয় অন্য কারো খোঁজ নেওয়া দিয়ে, তার রাত শেষ হয় অন্য কারো কথা ভেবে।

কুদ্দুছের জন্য সেখানে আর কোনো জায়গা নেই।

সে হয়তো জানেও না—কুদ্দুছ কেমন আছে।
জানার প্রয়োজনও হয়তো আর অনুভব করে না।

এই অবহেলাটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

ভালোবাসা হারানো যতটা কষ্টের, তার চেয়েও বেশি কষ্টের হলো—কারো কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়া।

কুদ্দুছ আয়নার সামনে দাঁড়ালো।

নিজের দিকে তাকিয়ে সে যেন নিজেকেই চিনতে পারলো না।

চোখের নিচে কালি, মুখে ক্লান্তি, দৃষ্টিতে শূন্যতা।

এই কি সেই মানুষ, যে একসময় মায়ার সামনে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখতো?

কুদ্দুছ মৃদু হেসে ফেললো—একটা ভাঙা হাসি।

“তুই নিজেকেও হারিয়ে ফেলেছিস…”—নিজেকেই বললো সে।

ভালোবাসা হারিয়ে সে শুধু মায়াকেই হারায়নি—নিজেকেও হারিয়েছে।

একসময় সে গান শুনতো, বই পড়তো, আকাশ দেখতো—ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ খুঁজে পেতো।

আজ আর কিছুই ভালো লাগে না।

সবকিছু যেন রঙ হারিয়ে ফেলেছে।

অফিসে গেলেও সে আগের মতো কাজ করতে পারে না। মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। সহকর্মীরা লক্ষ্য করে—কিন্তু কিছু বলে না।

একদিন তার বস ডেকে বললেন,
“তোমার কী হয়েছে? তুমি আগের মতো নেই।”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,
“আমি চেষ্টা করছি, স্যার…”

কিন্তু সে জানে—এই চেষ্টা যথেষ্ট নয়।

কারণ সমস্যাটা বাইরে নয়—ভেতরে।

একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সে হঠাৎ দেখলো—রাস্তার ওপারে মায়া দাঁড়িয়ে আছে।

তার পাশে সেই মানুষটা।

তারা একসাথে হাঁটছে।

মায়া কিছু বলছে, আর হাসছে।

কুদ্দুছ থেমে গেল।

তার পা যেন এগোতে চাইছে না।

সে দূর থেকে তাকিয়ে রইলো।

একসময় মায়া তাকালো—কিন্তু তার চোখে কুদ্দুছকে চিনতে পারার কোনো চিহ্ন নেই।

হয়তো সে দেখেইনি।

অথবা দেখেও দেখেনি।

এই মুহূর্তটা কুদ্দুছের ভেতরটা ভেঙে দিল।

সে বুঝলো—তার অস্তিত্ব এখন মায়ার জীবনে অদৃশ্য।

সে আর কিছু না—একটা পুরোনো স্মৃতি, হয়তো সেটাও না।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলো।

তার চোখ ভিজে গেছে—কিন্তু সে কাঁদছে না।

কাঁদার শক্তিটুকুও যেন ফুরিয়ে গেছে।

সেই রাতে সে আবার ডায়েরি খুললো।

অনেকদিন পর।

পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে সে নিজের আগের লেখাগুলো পড়তে লাগলো।

প্রতিটি লাইনে আছে তার ভালোবাসা, তার কষ্ট, তার অপেক্ষা।

সে লিখতে শুরু করলো—

“আজ তোমাকে দেখলাম।

তুমি খুব সুখী দেখাচ্ছিলে।

তোমার হাসিটা আগের মতোই আছে—শুধু সেই হাসির মধ্যে আমি নেই।

আমি জানি, আমার থাকা দরকারও নেই।

তবুও একটা প্রশ্ন বারবার মনে আসে—
আমি কি কখনো তোমার জীবনে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ ছিলাম?

নাকি আমি শুধু একটা সময়ের জন্য ছিলাম?

আমি এখন নিজেকেও খুঁজে পাই না।

তুমি চলে যাওয়ার পর, আমি যেন আমার ভেতরটা হারিয়ে ফেলেছি।

আমি কে—সেটাই ভুলে যাচ্ছি…”

কলমটা থেমে গেল।

কুদ্দুছ দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

এই নিঃশ্বাসটা যেন তার ভেতরের সব ক্লান্তি নিয়ে বের হলো।

বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

বৃষ্টির ফোঁটা জানালায় পড়ে গড়িয়ে পড়ছে—ঠিক তার চোখের পানির মতো।

হঠাৎ তার মনে হলো—যদি সবকিছু নতুন করে শুরু করা যেত!

যদি সে আবার সেই প্রথম দিনের মতো মায়ার সাথে দেখা করতে পারতো!

কিন্তু সময় কখনো পিছনে ফিরে আসে না।

সবকিছু সামনে এগিয়ে যায়—শুধু কিছু মানুষ পিছনে পড়ে থাকে।

কুদ্দুছ সেই পিছনে পড়ে থাকা মানুষগুলোর একজন।

হঠাৎ তার বুকটা আবার ব্যথা করতে শুরু করলো।

এই ব্যথাটা নতুন নয়—কিন্তু আজ একটু বেশি।

সে চেয়ারে বসে পড়লো।

শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

তার মনে হলো—এইবার হয়তো সত্যিই শেষ।

কিন্তু এইবারও তার মনে ভয় নেই।

বরং একটা অদ্ভুত স্বস্তি আছে।

মনে হচ্ছে, সে ধীরে ধীরে সেই জায়গার দিকে এগোচ্ছে—যেখানে আর কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো অভাব নেই।

চোখের সামনে আবার ভেসে উঠলো মায়ার মুখ।

এইবার মায়া একা।

সে এগিয়ে এসে কুদ্দুছের সামনে দাঁড়ালো।

“তুমি এত কষ্ট পাচ্ছো কেন?”—মায়া জিজ্ঞেস করলো।

কুদ্দুছ মৃদু হাসলো।

“কারণ আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি…”

মায়া চুপ করে রইলো।

তার চোখে পানি।

“আমি তোমাকে ভুলে যাইনি…”—সে আস্তে বললো।

কুদ্দুছ অবাক হয়ে তাকালো।

“তাহলে কেন…?”

মায়া উত্তর দিল না।

শুধু তার হাতটা ধরলো।

কুদ্দুছ অনুভব করলো—এই স্পর্শটা বাস্তব না, তবুও কত পরিচিত।

“সবকিছু শেষ হয়ে যায় না কুদ্দুছ…”—মায়া বললো,
“কিছু ভালোবাসা শুধু রয়ে যায়…”

কুদ্দুছ চোখ বন্ধ করলো।

তার ঠোঁটে একটুখানি শান্তির হাসি ফুটে উঠলো।

কিন্তু হঠাৎই সবকিছু মিলিয়ে গেল।

সে আবার একা।

ঘরের ভেতর নিঃশব্দতা।

বাইরে বৃষ্টি।

আর তার ভেতরে এক গভীর শূন্যতা।

কুদ্দুছ বুঝতে পারলো—সে এখনও বেঁচে আছে।

কিন্তু এই বেঁচে থাকাটা এখন শুধু একটা অভ্যাস।

জীবন না।

সে ধীরে ধীরে বিছানায় শুয়ে পড়লো।

চোখ বন্ধ করলো।

আজ তার কোনো স্বপ্ন নেই।

শুধু একটা অপেক্ষা—শেষের অপেক্ষা।

হয়তো সেই শেষেই সে খুঁজে পাবে তার হারিয়ে যাওয়া নিজেকে।

আর হয়তো…
মায়াকেও।

চলবে —