পর্ব–৩
কিন্তু এমন ঠিকানা তার, যেখানে যাওয়া যাবে না। ছোঁয়া যাবে না তাতে। মায়া এখন কার—এই প্রশ্ন অনেকের। দুঃখের পাহাড় বয়ে আমি আজ বড় ক্লান্ত।
হাসপাতালের সাদা আলোয় চোখ খুলতেই কুদ্দুছ বুঝলো—সে এখনও বেঁচে আছে। বেঁচে থাকা যেন তার জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং এক দীর্ঘ শাস্তি। বুকের ভেতরটা এখনও ভারী, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও জীবন তাকে ছাড়েনি।
চারপাশে অপরিচিত মুখ, যন্ত্রের শব্দ, আর অদ্ভুত এক গন্ধ। এই সবকিছুর মাঝেও তার মনে শুধু একটাই নাম—মায়া।
“মায়া…”—অচেতন অবস্থাতেও তার ঠোঁট সেই নামটাই উচ্চারণ করেছিল।
ডাক্তাররা বলেছিলেন, “অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। মানসিক চাপটা খুব বেশি ছিল।”
মানসিক চাপ! কত সহজ একটা শব্দ—কিন্তু এর ভেতরে যে কতটা গভীর যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে, সেটা কেউ বোঝে না।
কুদ্দুছ জানে, সে কেন এমন হলো। কারণ তার ভেতরে এমন এক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেটা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সে আবার ফিরে এলো তার ছোট্ট ঘরে। সেই একই দেয়াল, একই জানালা—কিন্তু সবকিছু যেন আরও নির্জন হয়ে গেছে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে দূরের আকাশের দিকে তাকায়। মনে হয়, কোথাও একটা জায়গা আছে—যেখানে মায়া আছে। কিন্তু সেই জায়গায় তার কোনো প্রবেশাধিকার নেই।
কিন্তু এমন ঠিকানা তার, যেখানে যাওয়া যাবে না।
এই সত্যটা তাকে প্রতিদিন নতুন করে কষ্ট দেয়।
মায়া এখন কার?
এই প্রশ্নটা তার মনে হাজারবার আসে। মায়া এখন অন্য কারো জীবনের অংশ, অন্য কারো স্বপ্ন, অন্য কারো ভালোবাসা। এই ভাবনাটা কুদ্দুছকে ভেতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
একসময় যে মেয়েটা তার পাশে বসে গল্প করতো, তার হাত ধরে হাঁটতো—আজ সে অন্য কারো হাত ধরে পথ চলছে।
এই বাস্তবতাটা মেনে নেওয়া কি এত সহজ?
একদিন কুদ্দুছ সাহস করে মায়ার বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। অনেকদিন পর। দূর থেকে শুধু একবার দেখার জন্য।
বাড়িটার সামনে আলো জ্বলছে। ভেতরে হয়তো অনেক মানুষ, অনেক হাসি, অনেক আনন্দ।
হঠাৎ দরজা খুলে গেল।
মায়া বের হলো।
কুদ্দুছের বুকটা কেঁপে উঠলো।
মায়া আগের মতোই আছে—কিন্তু আবার আগের মতো নেই। তার চোখে আজ অন্যরকম এক শান্তি, আবার সেই শান্তির ভেতরে লুকানো ক্লান্তিও আছে।
তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ—সম্ভবত তার স্বামী।
তারা কিছু কথা বলছিল, তারপর মায়া হেসে উঠলো।
সেই হাসিটা কুদ্দুছের বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধলো।
এই হাসি তো একসময় তার জন্য ছিল!
সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে এলো।
রাস্তাটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল—চোখের পানিতে।
দুঃখের পাহাড় বয়ে আমি আজ বড় ক্লান্ত—নিজেকেই বললো সে।
ক্লান্ত এই ভালোবাসা নিয়ে বাঁচতে বাঁচতে সে যেন অবসন্ন হয়ে পড়েছে।
সেই রাতেই কুদ্দুছ আবার লিখতে বসলো।
এইবার কোনো চিঠি নয়—একটা ডায়েরি।
সে লিখতে লাগলো তার অনুভূতিগুলো, তার কষ্টগুলো, তার ভালোবাসার গল্প।
“মায়া,
তুমি এখন অন্য কারো। এই সত্যটা আমি মেনে নিয়েছি—অথবা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি।
কিন্তু একটা প্রশ্ন আমাকে প্রতিদিন তাড়া করে—তুমি কি কখনো আমার কথা ভাবো?
আমি জানি, তোমার জীবনে এখন অনেক কিছু আছে। তবুও কি কখনো কোনো নিঃশব্দ রাতে তুমি আমার নামটা মনে করো?
আমি খুব ক্লান্ত মায়া… এই ভালোবাসার ভার নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি।
তবুও তোমাকে ভুলতে পারিনি।”
কলমটা থেমে গেল।
কুদ্দুছ জানে—এই লেখা কেউ পড়বে না। তবুও লিখে সে একটু হালকা হয়।
দিন কেটে যায়, রাত আসে। জীবন এগিয়ে চলে—কিন্তু কুদ্দুছ যেন একই জায়গায় আটকে আছে।
একদিন বিকেলে সে আবার সেই নদীর ধারে গেল—যেখানে তারা একসময় বসে ছিল।
নদীর পানি ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। সূর্য ডুবে যাচ্ছে।
সবকিছু আগের মতোই আছে—শুধু মায়া নেই।
সে চুপ করে বসে রইলো।
হঠাৎ মনে হলো, কেউ যেন তার পাশে বসেছে।
সে তাকালো—কেউ নেই।
তবুও সে অনুভব করলো—মায়া আছে।
“তুমি এসেছো?”—সে ফিসফিস করে বললো।
নীরবতা।
কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই যেন উত্তর লুকিয়ে আছে।
কুদ্দুছ চোখ বন্ধ করলো।
মনে হলো, মায়া তার কাঁধে মাথা রেখেছে।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো সে।
এই নিঃশ্বাসে আছে ভালোবাসা, আছে কষ্ট, আছে অপূর্ণতা।
হঠাৎ তার বুকটা আবার ব্যথা করতে শুরু করলো।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
সে বুঝতে পারছে—তার শরীর আর তাকে সাপোর্ট করছে না।
কিন্তু এইবার তার ভয় লাগছে না।
বরং এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করছে।
মনে হচ্ছে, সে ধীরে ধীরে মুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে।
শেষ মুহূর্তে সে শুধু একটা কথাই ভাবলো—
“এই জীবনে না পারলেও… পরের কোনো জীবনে কি আমরা এক হতে পারবো?”
তার ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটে উঠলো।
দূরের আকাশে তখন একটা তারা জ্বলছিল—অদ্ভুত উজ্জ্বল।
হয়তো সেই তারাটার নাম—মায়া।
আর কুদ্দুছ?
সে এখনও বেঁচে আছে—কিন্তু তার ভেতরের সবকিছু ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
তার গল্প এখনও শেষ হয়নি।
কিন্তু শেষটা খুব দূরে নয়…
চলবে —