ঢাকা, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:১১:০৫ PM

উপন্যাস: পত্র দিও

মান্নান মারুফ
25-03-2026 02:16:38 PM
উপন্যাস: পত্র দিও

পর্ব – ২

সেই পুরানো দিনের কথা মনে পড়ে নেহা। কিন্তু তুমি—তোমার কি মনে আছে এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালীর তাল পাখাটার কথা? খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে, পাখাটা জানাইও। তুমি সম্ভব হলে পত্র দিও।

চিঠিটার শেষ লাইনগুলো বারবার পড়ে কুদ্দুছ। যেন প্রতিটি শব্দে জমে আছে বহু বছরের অব্যক্ত কষ্ট, লুকোনো ভালোবাসা আর এক অদৃশ্য আকুলতা। নেহার লেখা—কিন্তু তাতে কোনো সরলতা নেই, বরং এক গভীর আড়াল। যেন সে বলতে চেয়েও বলেনি, লুকাতে চেয়েও লুকাতে পারেনি।

সেই রাতটা আর ঘুম আসেনি কুদ্দুছের। জানালার পাশে বসে থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ভাবছিল—এই চিঠি কি শুধু স্মৃতির টান? নাকি এর ভেতরে আরও কিছু আছে?

তাল পাখা।

শব্দটা তার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ করে এক ঝড় তুলল।

হ্যাঁ, সেই দিনটার কথা তার স্পষ্ট মনে আছে।

গ্রামের বার্ষিক মেলা। বিকেলের শেষ আলো তখন ধীরে ধীরে মাটির ওপর নরম হয়ে পড়ছে। চারদিকে মানুষের ভিড়, নাগরদোলার শব্দ, আর হকারদের ডাক। সেই ভিড়ের মাঝেই নেহা দাঁড়িয়ে ছিল একটা ছোট দোকানের সামনে। হাতে একটা তাল পাখা—সাধারণ, কিন্তু তাতে অদ্ভুত রঙের নকশা।

কুদ্দুছ হেসে বলেছিল,
—“এত কিছু থাকতে এটা কেন?”
নেহা চোখ ছোট করে বলেছিল,
—“সব সুন্দর জিনিস দামি হয় না।”

তারপর পাখাটা কিনে নিয়ে কুদ্দুছের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেছিল,
—“এইটা তোমার কাছে থাকবে। যখন খুব গরম লাগবে, তখন না—যখন খুব একা লাগবে, তখন এটা দিয়ে বাতাস করবা। মনে হবে আমি আছি।”

কুদ্দুছ তখন হাসলেও, সেই কথার গভীরতা সে তখন পুরোটা বুঝতে পারেনি।

আজ বুঝছে।

বহুদিন পর সে পুরনো আলমারির এক কোণে খুঁজতে লাগল। ধুলো জমে থাকা বাক্সগুলো খুলতে খুলতে হঠাৎ একসময় তার হাতে এসে পড়ল সেই তাল পাখাটা।

সময়ের ছোঁয়ায় রঙ কিছুটা ফিকে হয়ে গেছে, কিন্তু নকশাগুলো এখনো স্পষ্ট। কুদ্দুছ পাখাটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তার মনে হলো—এই পাখাটা যেন শুধু একটা বস্তু নয়, বরং তাদের ভালোবাসার এক নীরব সাক্ষী।

সে ধীরে ধীরে পাখাটা নেড়ে বাতাস করতে লাগল।

হালকা একটা বাতাস তার মুখে এসে লাগল।

কিন্তু সেই বাতাসের ভেতরে যেন একটা অদ্ভুত উষ্ণতা—যেন নেহার ছোঁয়া।

কুদ্দুছের চোখ ভিজে উঠল।

সে নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন করল—
“নেহা, তুমি কি সত্যিই এখনো এসব মনে রেখেছ?”

পরের দিন সকালে কুদ্দুছ একটা সাদা কাগজ বের করল। অনেকদিন পর সে চিঠি লিখবে।

কলম হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। শব্দ খুঁজে পাচ্ছিল না।

তারপর ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করল—

“নেহা,
তোমার চিঠি পেয়েছি। এতদিন পর তোমার হাতের লেখা দেখে মনে হলো—সময় যেন হঠাৎ করে থেমে গেছে।
তুমি যে তাল পাখার কথা বলেছ, সেটা এখনো আমার কাছে আছে। জানো, আজও আমি সেটা ফেলে দিতে পারিনি।
তুমি বলেছিলে—একাকীত্বে এটা দিয়ে বাতাস করতে। আমি মাঝে মাঝে সেটা করি। কিন্তু বাতাসে তোমার ছোঁয়া পাই কিনা, জানি না… শুধু বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে যায়।”

লিখতে লিখতে কুদ্দুছ থেমে গেল।

তার মনে হলো—এই চিঠি কি পাঠানো উচিত?

নেহা তো এখন অন্য কারো জীবনের অংশ। তার এই চিঠি কি কোনো অশান্তি তৈরি করবে?

কিন্তু আবার মনে হলো—নেহাই তো লিখেছে, “পত্র দিও।”

তাহলে কি এই চিঠির ভেতরে কোনো অদৃশ্য অনুমতি আছে?

অনেক দ্বিধার পর সে আবার লিখতে শুরু করল—

“তুমি জানতে চেয়েছ, আমি তোমাকে মনে রাখি কিনা।
আমি কি করে ভুলে যাই বলো?
কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়ার জন্য নয়, মনে রাখার জন্যই জীবনে আসে। তুমি তেমনই একজন।

তুমি কেমন আছো, সেটা জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু জানার সাহস হয় না।
কারণ, যদি শুনি তুমি খুব ভালো আছো—তাহলে আমার খারাপ লাগবে।
আর যদি শুনি তুমি ভালো নেই—তাহলে আমার আরও বেশি কষ্ট হবে।

তবুও জানতে ইচ্ছে করে…
তুমি কি সুখে আছো, নেহা?”

চিঠিটা শেষ করে কুদ্দুছ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর খামে ভরে পোস্ট করার জন্য বের হয়ে গেল।

পোস্ট অফিসে গিয়ে যখন চিঠিটা বাক্সে ফেলল, তখন তার মনে হলো—সে যেন নিজের একটা অংশ সেখানে ফেলে দিল।

দিন কেটে যেতে লাগল।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় কুদ্দুছ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে—হয়তো আবার কোনো চিঠি আসবে।

অপেক্ষা—আবার সেই পুরনো অপেক্ষা।

এক রাতে হঠাৎ করে বৃষ্টি শুরু হলো।

ঝুম বৃষ্টি। চারদিকে শুধু পানির শব্দ।

কুদ্দুছ জানালার পাশে বসে ছিল। হাতে সেই তাল পাখা।

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো জানালার কাঁচে আঘাত করছিল, আর কুদ্দুছের মনে হচ্ছিল—প্রতিটা ফোঁটা যেন একটা করে স্মৃতি।

হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

কুদ্দুছ একটু দ্বিধা করে ফোনটা ধরল।

—“হ্যালো…”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর খুব ধীরে একটা কণ্ঠ—
—“কুদ্দুছ…”

কুদ্দুছের বুক ধক করে উঠল।

এই কণ্ঠ—এই তো নেহা।

—“নেহা?”
—“হ্যাঁ… আমি…”

কুদ্দুছ কিছু বলতে পারছিল না।

অনেক কথা ছিল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না।

নেহা বলল,
—“তোমার চিঠি পেয়েছি…”

কুদ্দুছের চোখ আবার ভিজে উঠল।

—“তুমি… ভালো আছো?”
নেহা একটু চুপ থেকে বলল,
—“ভালো থাকার চেষ্টা করি…”

এই একটা বাক্যই সব বলে দিল।

বৃষ্টির শব্দ যেন আরও জোরে হতে লাগল।

কুদ্দুছ ধীরে বলল,
—“তাল পাখাটা… এখনো আছে?”
নেহা হালকা হেসে বলল,
—“হ্যাঁ… মাঝে মাঝে ব্যবহার করি… কিন্তু বাতাসে আগের মতো কিছু পাই না…”

এই কথাটায় এক অদ্ভুত কষ্ট লুকিয়ে ছিল।

কুদ্দুছ বুঝতে পারল—নেহাও তার মতোই কোথাও আটকে আছে।

কিন্তু সেই আটকে থাকা থেকে বের হওয়ার পথ তাদের কারোরই নেই।

ফোনের ওপাশে নেহা বলল,
—“কুদ্দুছ… আমরা কি আবার আগের মতো হতে পারি?”

এই প্রশ্নটা শুনে কুদ্দুছ চুপ হয়ে গেল।

বৃষ্টি থেমে গেছে।

চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা।

কুদ্দুছ ধীরে বলল,
—“কিছু জিনিস ফিরে আসে না, নেহা… শুধু মনে থাকে…”

নেহা কিছু বলল না।

শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

তারপর খুব ধীরে বলল,
—“তবুও… মাঝে মাঝে কথা বলতে ইচ্ছে করে…”

কুদ্দুছ চোখ বন্ধ করে বলল,
—“আমারও…”

ফোনটা কেটে যাওয়ার পর কুদ্দুছ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল।

তার মনে হলো—তাদের গল্পটা শেষ হয়নি।

কিন্তু এটা আর আগের মতো গল্পও নয়।

এটা এখন একটা অসমাপ্ত অনুভূতি—যার কোনো পরিণতি নেই, শুধু আছে টান আর ব্যথা।

সে আবার তাল পাখাটা হাতে নিল।

ধীরে ধীরে বাতাস করতে লাগল।

এবার তার মনে হলো—বাতাসটা একটু অন্যরকম।

হয়তো কল্পনা।

হয়তো সত্যি।

কিন্তু সে অনুভব করল—নেহা এখনো কোথাও আছে।

দূরে, কিন্তু হারিয়ে যায়নি।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—
“নেহা… আবার পত্র দিও…”

অন্ধকার ঘরের ভেতর সেই কথাটা যেন প্রতিধ্বনির মতো ফিরে এলো।

আর বাইরে, রাতের আকাশে, হয়তো কোথাও নেহাও একই কথা ভাবছে।

(চলবে…)