ঢাকা, শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৫:০১:৪৮ PM

অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত সময়ের দাবি

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
20-03-2026 12:00:45 PM
অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত সময়ের দাবি

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক নিরাপত্তা, অপরাধ দমন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এই বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা একটি মৌলিক পূর্বশর্ত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্ত কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, যা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

প্রাপ্ত অভিযোগ অনুযায়ী, উল্লিখিত সময়কালে পুলিশের বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, কিছু ব্যক্তি ভুয়া কাগজপত্র, এমনকি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে এএসআই, এসআই, ইন্সপেক্টরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ লাভ করেছেন। এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু আইনের লঙ্ঘনই নয়, বরং দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমাননা হিসেবেও বিবেচিত হবে। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ অডিট বা যাচাই-বাছাই কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।

অভিযোগের তালিকায় কয়েকজন কর্মকর্তার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—কেরানীগঞ্জ থানার সাবেক ওসি মনির (১৯৮৮ ব্যাচ), যার বিরুদ্ধে অতীতে ডাকাতি, নারী ও মদ সরবরাহসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রমনা থানায় দায়িত্ব পালনকালে নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবুও বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন।

রমনা থানার সাবেক ওসি (তদন্ত) নুর মোহাম্মদের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একটি আলোচিত ঘটনায় লাশবাহী গাড়িতে গুলি চালানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। তার কর্মজীবনে বিভিন্ন থানায় দায়িত্ব পালনকালেও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি একটি ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত আছেন বলে জানা গেছে। তার কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

এছাড়া রমনা থানার ফাঁড়ি ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মফিজের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা ও জিডি তৈরি এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের প্রতি মারাত্মক অবিচার এবং আইনের অপব্যবহারের শামিল।

কাপাসিয়া থানার সাবেক ওসি রফিকুল ইসলাম রফিকের বিরুদ্ধেও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি একটি হত্যা মামলার আসামিদের সহযোগিতা করেছেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং আর্থিক লেনদেন যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

একইভাবে ইন্সপেক্টর আলমচাঁদের বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। কাপাসিয়া ও মির্জাপুর থানায় দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে তিনি অন্য একটি ইউনিটে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন।

ঢাকার গুলশান এলাকার সাবেক এডিসি আহাদের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থ লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে মতিঝিল এলাকায় দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরনের অভিযোগ পুলিশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে।

এছাড়া সাবেক ডিসি আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধেও প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। একইভাবে সিআইডির দক্ষিণ অঞ্চলে কর্মরত ইন্সপেক্টর শাহরিয়ার, মনজুরুল হক মনজুর এবং শাহজালাল মুন্সীর বিরুদ্ধেও মামলা বাণিজ্য, তদন্তে অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

উল্লেখিত অভিযোগসমূহ এখনো প্রমাণিত নয়, তবে এগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরি। এজন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে—

প্রথমত, ২০১৪–২০২৪ সালের সকল নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন, যা প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, সনদপত্র এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করবে।

দ্বিতীয়ত, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত শেষে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে।

তৃতীয়ত, পুলিশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা জোরদার করতে একটি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ করা যায়।

চতুর্থত, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে সম্পদের উৎস যাচাই কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, পুলিশ বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা অপরিহার্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাত না করে নিরপেক্ষভাবে সত্য উদঘাটন করতে হবে। তবেই একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব হবে।