ঢাকা, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬,
সময়: ১০:৪০:৪৯ PM

বাংলাদেশে এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকেরা দুর্দশায় জর্জরিত

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
01-05-2026 09:28:38 PM
বাংলাদেশে এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকেরা দুর্দশায় জর্জরিত

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো শিক্ষক সমাজ। অথচ দেশের বহু শিক্ষক আজও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে বিশেষ করে নন-এমপিও, খন্ডকালীন ও পার্টটাইম—এমন হাজার হাজার শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করলেও তাদের স্থায়ী নিয়োগ বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিয়মিত বেতন তো পানই না, এমনকি বোনাস বা উৎসব ভাতাও দেওয়া হয় না।

বাংলাদেশে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্য এমপিও (Monthly Pay Order) একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সরকার তাদের বেতনের একটি বড় অংশ প্রদান করে। কিন্তু বহু শিক্ষক বছরের পর বছর শিক্ষকতা করেও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। ফলে তারা অতি সামান্য বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দিয়ে বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় জীবনধারণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অনেক শিক্ষক জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) থেকে নিবন্ধন সনদ অর্জনের পরও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পান। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, প্রতিষ্ঠান প্রধানদের অনীহা কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে তারা স্থায়ী নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হন। এতে তাদের পেশাগত নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং সামাজিক মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হয়।

অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সময় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছে। বিরোধী মতাদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে অনেক শিক্ষককে এমপিওভুক্তি বা স্থায়ী নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে জানা যায়। ফলে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষক ন্যায্য অধিকার পাননি, যা শিক্ষা খাতের জন্য উদ্বেগজনক।

একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ৫ থেকে ১৫ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন। অনেকেরই এনটিআরসিএ নিবন্ধন রয়েছে এবং তারা নিয়মিত পাঠদান করছেন। কিন্তু বয়সসীমা অতিক্রম করায় তারা নতুন করে সরকারি কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না। একজন শিক্ষক বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের মানুষ গড়ার কাজ করেছি, অথচ নিজেরাই অবহেলিত।”

এমপিওভুক্ত না হওয়া শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। পরিবার নিয়ে অনেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবনযাপন করছেন। সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসাভাড়ার খরচ বহন করতে গিয়ে তারা চরম সংকটে পড়ছেন। অনেকেই অতিরিক্ত আয়ের জন্য প্রাইভেট টিউশন বা অন্য পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের মূল পেশায় মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।

শুধু আর্থিক নয়, সামাজিকভাবেও তারা অবহেলার শিকার। একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের তুলনায় তারা কম মর্যাদা পান এবং অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তাদের মতামত উপেক্ষিত হয়। এতে মানসিক চাপ আরও বাড়ে।

বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়ে বিভিন্ন সময় ইতিবাচক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এমনকি নির্বাচন কালীন জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও শিক্ষকদের মর্যদা বৃদ্ধির জন্য কাজ করবেন এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা আশা করছেন, সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিলে তাদের দীর্ঘদিনের দুর্দশার অবসান ঘটবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর এক সিনিয়র শিক্ষক জানান, সাবেক সরকারের সময় নকল এনটিআরসিএ সনদের মাধ্যমে প্রায় ৬০ হাজার নিয়োগের অভিযোগ উঠেছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও তখন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে এ বিষয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা, যাতে জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রকৃত নিবন্ধনপ্রাপ্তদের নিয়োগ নিশ্চিত করা যায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যার সমাধানে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। শিক্ষক নিয়োগ, স্থায়ীকরণ এবং এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন কর্মরত ও নিবন্ধনপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ বিবেচনা রাখা প্রয়োজন।

এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেইস তৈরি করা জরুরি, যেখানে এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকদের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। এর মাধ্যমে প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের পথ তৈরি করা সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের জবাবদিহির আওতায় আনাও প্রয়োজন।

সবশেষে বলা যায়, একটি জাতির উন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ সেই শিক্ষক সমাজের একটি বড় অংশ যদি অবহেলিত ও বঞ্চিত থাকে, তবে তা জাতির ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। তাই এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।