ঢাকা, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
সময়: ০১:৪১:০৫ PM

যুবদলের কমিটি নিয়ে:ক্ষোভ ও বিতর্ক

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
13-06-2026 06:00:00 AM
যুবদলের কমিটি নিয়ে:ক্ষোভ ও বিতর্ক

দীর্ঘ ২৩ মাসের অপেক্ষার পর জাতীয়তাবাদী যুবদলের ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কমিটি প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে অসন্তোষ, ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একাংশের নেতাকর্মী অভিযোগ করেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। একই সঙ্গে তদবির, ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং বিশেষ গোষ্ঠীর প্রভাবের মাধ্যমে পদায়নের অভিযোগও উঠেছে।

গত ৪ জুন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে ছয় সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল।

দলীয় সূত্র ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা বেশ কয়েকজন নেতাকে নতুন কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে তাদের অনুসারী ও সমর্থকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বঞ্চিতদের তালিকায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মেহবুব মাসুম শান্ত। নেতাকর্মীদের দাবি, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু নতুন কমিটিতে তাকে কোনো পদ না দেওয়ায় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

একইভাবে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি মামুন খানও নতুন কমিটিতে স্থান পাননি। দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বিরোধী দলে থাকাকালে বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিয়ে হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

এ ছাড়া কুমিল্লা বিভাগীয় যুবদলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক ভিপি তাজুল ইসলাম, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি তবিবুর রহমান সাগর, সাইফুল ইসলাম এবং বরিশাল বিভাগীয় যুবদলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক সুমন দেওয়ানও ঘোষিত কমিটিতে স্থান পাননি।

নেতাকর্মীদের একাংশের মতে, আন্দোলনের কঠিন সময়ে যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অনেকেই এবার মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

নতুন কমিটির বিভিন্ন পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাদের অতীতে বিএনপি বা এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় উপস্থিতি ছিল না।

বিশেষ করে সহসাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পাওয়া আরিফুর রহমান সোহেলকে ঘিরে আলোচনা দেখা দিয়েছে। কিছু নেতাকর্মীর দাবি, পূর্বে কোনো উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পালন না করেও তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান পেয়েছেন।

একাধিক নেতার অভিযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা, ত্যাগ ও আন্দোলনে ভূমিকার তুলনায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং লবিং অনেক ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নবঘোষিত কমিটির এক যুগ্ম সম্পাদক অভিযোগ করেন, মনিরুল ইসলাম সোহাগকে যুগ্ম সম্পাদক করা হলেও দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে তাকে রাজপথে খুব বেশি দেখা যায়নি। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধেও। তাদের মতে, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা সত্ত্বেও তারা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন।

একই অভিযোগ উঠেছে যুগ্ম সম্পাদক পদ পাওয়া মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে নিয়েও। নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় তিনি মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন না। একই সঙ্গে খন্দকার আল আশরাফ মামুনের পদপ্রাপ্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

অন্যদিকে নতুন কমিটিতে সহসভাপতি পদ পাওয়া আতিকুর রহমান আতিককে নিয়েও সংগঠনের ভেতরে আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্রে জানা যায়, পূর্ববর্তী কমিটিতে তিনি সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তবে আন্দোলন-সংগ্রামে নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগে পরবর্তী আংশিক কমিটিতে তাকে রাখা হয়নি। কিন্তু এবার তাকে সহসভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে নেতাকর্মীদের একাংশ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পদ না পাওয়ার হতাশা প্রকাশ করে ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক আসাদুল আলম টিটু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দেন। তার ওই মন্তব্য দলীয় কর্মীদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এ ছাড়া কয়েকজন প্রবাসী নেতার পদপ্রাপ্তি নিয়েও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা দাবি করেন, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে কমিটিতে পদ পেয়েছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে হারুনর রশিদ হিরো দাবি করেছেন, তিনি সৌদি আরবপ্রবাসী নন এবং বর্তমানে দেশেই অবস্থান করছেন।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের উপেক্ষা করে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিংবা নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে এবং সংগঠনের মনোবলেও প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্নার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। জানা গেছে, পবিত্র হজ পালনের জন্য তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তাও তিনি দেখেছেন, তবে কোনো জবাব দেননি।

একইভাবে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পরপরই যে বিতর্ক, সমালোচনা ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে, তা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে দলীয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অবস্থান জানার অপেক্ষায় রয়েছেন নেতাকর্মীরা।