ঢাকা, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
সময়: ০১:০২:৫৭ PM

প্রকল্পের ৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়: ২৪ দিনে তিনবার বদলি

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
13-06-2026 06:00:00 AM
প্রকল্পের ৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়: ২৪ দিনে তিনবার বদলি
নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগমকে ঘিরে সম্প্রতি প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির পথ রোধ করে রাষ্ট্রের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করলেও তিনি পুরস্কৃত হওয়ার পরিবর্তে মাত্র ২৪ দিনের ব্যবধানে তিনবার বদলির সম্মুখীন হয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা ছিল একটি প্রভাবশালী চক্রের। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে প্রস্তুত করা কিছু ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত নথি ও বিলের মধ্যে নানা ধরনের অসঙ্গতি ও নিয়মবহির্ভূত প্রক্রিয়ার উপস্থিতি লক্ষ্য করেন মাহমুদা বেগম। দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এসব নথিতে অনুমোদন দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং সন্দেহজনক বিল ও ফাইল আটকে দেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, তার এই পদক্ষেপের ফলে রাষ্ট্রের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা অযৌক্তিকভাবে ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা রোধ করা সম্ভব হয়। তবে এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা ভোগ করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রমতে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা অনিয়মিত ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের কমিশন ও আর্থিক সুবিধা অর্জনের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু মাহমুদা বেগমের কঠোর অবস্থানের কারণে সেই সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়।

আরও অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন অনৈতিক তদবির ও চাপ উপেক্ষা করায় তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। এক পর্যায়ে তাকে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছিল, “আপনার ক্ষমতা বেশি, না আমার ক্ষমতা বেশি—তা দেখতে পাবেন।” অভিযোগকারীদের দাবি, এই ঘটনার পরপরই তার বিরুদ্ধে বদলির প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে একাধিকবার বদলির আদেশ দেওয়া হয়।

জানা গেছে, বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়েও পৌঁছেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভূমি প্রশাসন সংশ্লিষ্ট মহলে এ ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও বিষয়টি নজরে নেন। প্রথম দফায় বদলির আদেশ স্থগিত হলেও পরে অন্য একটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নতুন করে বদলির নির্দেশ জারি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের মতে, একজন কর্মকর্তা যখন ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেন, তখন তাকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত, মাহমুদা বেগমের ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সংগ্রামের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্নও বটে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সৎ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কর্মকর্তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। একই সঙ্গে তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও সত্য উদঘাটনের আহ্বান জানিয়েছেন।