প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনপ্রশাসনের প্রতিটি পদকে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে কর্মকর্তাদের দায়িত্ববোধ ও পেশাদারিত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রশাসনের যে কোনো পদে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। শুধুমাত্র পদোন্নতি বা পছন্দের স্থানে পোস্টিং পাওয়ার জন্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করলে তা সাময়িক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, পছন্দের পদে থাকার মানসিকতা থেকেই দুর্নীতি ও অপেশাদার আচরণের জন্ম নেয়। তাই কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের যেকোনো প্রান্তে, যেকোনো সময়ে দায়িত্ব পালনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সততা, মেধা ও দক্ষতাকে প্রশাসনের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ, শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন এবং প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা জনগণ ও সরকারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। তাদের সততা ও কর্মদক্ষতার ওপরই সরকারের কার্যক্রমের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে। তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে মাঠ প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান তিনি। একইসঙ্গে অতীতের কিছু নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, প্রশাসন সঠিকভাবে কাজ করলে জনগণের রায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়, আর বাধা সৃষ্টি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অনুপ্রাণিত করতে একটি ক্রীড়া অনুষ্ঠানের উদাহরণ টেনে বলেন, শিশুদের অদম্য আগ্রহ ও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। তিনি চান, প্রশাসনের কাজেও সেই অগ্রগতির চেতনা প্রতিফলিত হোক।
বর্তমান সরকারের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসন এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তবে স্বল্প সময়ে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে। তিনি অতীত শাসনামলে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশকে একটি টেকসই অবস্থানে নিতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
বিশ্বব্যাপী চলমান অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তবে জনগণের ভোগান্তি কমিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি জানান, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্মানীসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি প্রশাসনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকারের ঘোষিত অঙ্গীকারগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের জন্য কর্মকর্তাদের আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বা আইনি বাধাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার না করে বাস্তবসম্মত ও জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, জনগণ যেন সরকারি সেবা পেতে গিয়ে হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মাদকদ্রব্য প্রতিরোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা, বাল্যবিবাহ রোধ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের সক্রিয় ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একইসঙ্গে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের “মাঠ প্রশাসনের অ্যাম্বাসেডর” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী চিন্তা জাতীয় নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। সর্বোপরি, জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, মতভেদ থাকলেও দেশের স্বার্থকে সবার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।
চার দিনব্যাপী এই ডিসি সম্মেলনে মোট ৩৪টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ৫৬টি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন এবং প্রায় ৪৯৮টি প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। সম্মেলনটি আগামী ৬ মে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।