ঢাকা, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১১:৫৪:৪৮ PM

গল্প, নীরব যাত্রা”

মান্নান মারুফ
25-04-2026 09:35:45 PM
গল্প, নীরব যাত্রা”

কুদ্দুছ কখনো ভাবেনি, তার মতো সাধারণ, শান্ত, একরকম নীরব মানুষও এমন ভাবে কারও প্রেমে পড়ে যেতে পারে। শহরের ভেতর দিয়ে যখন রাত নামে, বাতাসে যখন হালকা ভেজা মাটির গন্ধ মিশে যায়, তখনই তার ভেতরের অস্থিরতা আরও বেড়ে ওঠে। এই অস্থিরতার নামই ঐশি।

ঐশি—এই নামটা তার মনে এমনভাবে গেঁথে গেছে, যেন কোনো পুরনো কবিতার লাইন, যেটা বারবার পড়লেও শেষ হয় না, বরং নতুন অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।

কুদ্দুছ প্রতিদিনই ভাবে, “আমি কি সত্যিই এমন প্রেমে পড়েছি, যেটা অনন্তকালেও কমবে না?” নিজের মনকেই সে প্রশ্ন করে, কিন্তু উত্তর পায় না। কারণ উত্তরটা তো তার বাইরের কোনো শব্দ নয়, সেটা তার বুকের ভেতরে ধুকপুক করা এক গভীর অনুভব।

ঐশি তাকে কখনো স্পষ্ট করে বলেনি কিছু। তবু কুদ্দুছ জানে, কিছু কিছু অনুভব শব্দ ছাড়াও জন্ম নেয়। কলেজের লাইব্রেরির সেই প্রথম দেখা—ঐশি বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, চুলগুলো হালকা করে কাঁধে ছড়িয়ে, চোখে এক অদ্ভুত শান্তি। সেই মুহূর্তেই কুদ্দুছের ভেতরে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল।

তারপর থেকে দিনগুলো যেন আর আগের মতো থাকেনি।

কুদ্দুছ প্রতিদিনই লাইব্রেরিতে যেত। শুধু ঐশিকে দেখার জন্য। কখনো সে কিছু বলত না, শুধু দূর থেকে তাকিয়ে থাকত। ঐশি হয়তো খেয়ালই করত না, কিংবা করলেও গুরুত্ব দিত না। কিন্তু কুদ্দুছের কাছে এই নীরব দেখা-ই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

একদিন বৃষ্টি নামল।

সেদিন লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল হঠাৎ করেই। কুদ্দুছ বেরিয়ে দেখল আকাশ ভেঙে পড়েছে। রাস্তা পানিতে ভেসে যাচ্ছে। সে দাঁড়িয়ে ছিল ছাদের নিচে। ঠিক তখনই ঐশি এল।

হাতে একটা বই, মাথায় হালকা ওড়না, আর বৃষ্টির ফোঁটা যেন তার চারপাশে আলোর মতো ঝলমল করছে।

ঐশি বলল,
— “আপনি এখনো যাননি?”

কুদ্দুছ একটু থমকে গেল। এতদিনে প্রথমবার তার সঙ্গে সরাসরি কথা।

সে বলল,
— “বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় আছি।”

ঐশি হেসে ফেলল।
— “বৃষ্টি কি কখনো কারও জন্য থামে?”

এই কথাটা কুদ্দুছের মনে গেঁথে গেল।

সেদিন তারা একসাথে দাঁড়িয়ে ছিল। খুব বেশি কথা হয়নি, তবুও সেই নীরবতা ছিল অদ্ভুত সুন্দর। যেন বৃষ্টি তাদের কথা বলার জায়গাটা পূরণ করে দিচ্ছিল।

এরপর সময় এগিয়ে গেল।

কুদ্দুছের প্রেম আর গোপন রইল না। তার চোখ, তার আচরণ—সবকিছুই যেন ঐশির নাম লিখে ফেলেছিল অদৃশ্যভাবে। কিন্তু সে কখনো সাহস করে বলতে পারেনি।

কারণ ভয় ছিল—যদি এই অনুভব ভেঙে যায়?

তবু একদিন সে নিজেকে থামাতে পারল না।

সন্ধ্যার পরে, লাইব্রেরির বাইরে, কুদ্দুছ দাঁড়িয়ে ছিল। চারপাশে হালকা বাতাস, গাছের পাতায় পাতায় শব্দ। ঐশি বেরিয়ে এল।

কুদ্দুছ বলল,
— “ঐশি, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।”

ঐশি তাকাল।
— “কি কথা?”

কুদ্দুছের বুক ধকধক করছিল।
— “আমি জানি না তুমি কিভাবে নেবে… কিন্তু আমি তোমাকে অনেক দিন ধরে…”

সে থেমে গেল।

শব্দগুলো তার গলায় আটকে গেল।
“ভালোবাসি”—এই একটা শব্দ যেন পুরো পৃথিবীর চেয়ে ভারী হয়ে উঠল।

ঐশি চুপ করে তাকিয়ে রইল। তার মুখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো রাগ নেই। শুধু নীরবতা।

তারপর সে বলল,
— “কুদ্দুছ, ভালোবাসা কি শুধু অনুভবেই সীমাবদ্ধ থাকে?”

এই প্রশ্নের উত্তর কুদ্দুছের জানা ছিল না।

ঐশি আবার বলল,
— “তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমি জানি। কিন্তু তুমি কি আমাকে বুঝো?”

এই কথার পর ঐশি চলে গেল।

কুদ্দুছ দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সব শব্দ একসাথে হারিয়ে গেছে।

সেই রাত থেকে তার জীবন বদলে গেল।

রাতে সে ঘুমাতে পারত না।
“আমি তুমুল প্রেমে পড়েছি, শুনছো?”—এই বাক্যটা তার মাথার ভেতর বারবার বাজত।

ঐশি নেই, তবু তার উপস্থিতি যেন সব জায়গায়। বাতাসে, রাস্তায়, বইয়ের পাতায়, এমনকি নিঃশ্বাসেও।

সে নিজেকে বলত,
“আমি হাত বাড়াবো আর তোমাকে পাবো না—এটাই কি ভালোবাসা?”

দিনগুলো কাটতে লাগল নিঃসঙ্গতায়।

কুদ্দুছ আর লাইব্রেরিতে যায় না। কারণ সেখানে গেলে ঐশির স্মৃতি তাকে ভেঙে দিত। কিন্তু না গিয়েও সে মুক্ত ছিল না। কারণ ঐশি এখন তার ভেতরে বাস করতে ছিল।

একদিন হঠাৎ করে ঐশির দেখা পেল।

রাস্তার মোড়ে, সন্ধ্যার আলোয়।

ঐশি আগের মতোই আছে, কিন্তু চোখে একটু ক্লান্তি।

কুদ্দুছ এগিয়ে গেল।
— “তুমি কেমন আছো?”

ঐশি একটু হাসল।
— “ভালো। তুমি?”

কুদ্দুছ কিছু বলল না।
তারপর বলল,
— “আমি এখনো তোমার কথা ভুলতে পারিনি।”

ঐশি তাকাল তার দিকে।
— “ভুলে যাওয়া সবসময় হারানো না, কুদ্দুছ।”

এই কথাটা কুদ্দুছ বুঝল না।

ঐশি ধীরে বলল,
— “তুমি আমাকে ভালোবাসো, কিন্তু তুমি কি নিজেকে হারিয়ে ফেলছো না?”

কুদ্দুছ চুপ।

ঐশি আবার বলল,
— “ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা না।”

এই বলে সে চলে গেল।

এইবার কুদ্দুছ আর তাকে থামায়নি।

সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল।

রাত নামল।

কুদ্দুছ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আমি জানি না এটা ভালোবাসা নাকি কষ্ট… কিন্তু আমি তোমায় ছাড়তে পারি না কেন।”

তার চোখে পানি ছিল না, কিন্তু ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছিল।

সেই রাতের পর কুদ্দুছ একরকম নীরব হয়ে গেল।

সে বুঝল, ঐশিকে পাওয়া মানে শুধু কাছে পাওয়া না।
কখনো কখনো ভালোবাসা মানে দূর থেকেও কাউকে বাঁচিয়ে রাখা।

সময়ের সাথে সাথে কুদ্দুছ বদলাল।

সে লিখতে শুরু করল। তার সব লেখা ছিল ঐশিকে নিয়ে—নাম না লিখেও।

“আমি তুমুল প্রেমে পড়েছি, শুনছো?”
এই বাক্যটা তার প্রতিটি লেখার ভেতর লুকিয়ে থাকত।

বছর পার হলো।

একদিন কুদ্দুছ একটা চিঠি পেল।

কোনো নাম নেই। শুধু লেখা—

“তুমি এখনো কি আছো সেই একই অনুভবে?”

কুদ্দুছ বুঝতে পারল, এটা ঐশির লেখা।

তার হাত কাঁপছিল।

সে জানত না কী লিখে উত্তর দেবে।

শুধু লিখল—

“আমি এখনো আছি।
তুমুলভাবে, অনন্তকাল ধরে।”

রাত গভীর হলো।

কুদ্দুছ জানালার পাশে বসে ছিল।

বাইরে বাতাস বইছে।

সে ধীরে বলল,

“কেউ কি জানে, এমন করে কেউ কুদ্দুছকে আছন্ন করে রাখেনি?”

তারপর চোখ বন্ধ করল।

এই প্রেম কোনো শেষ চায় না।

এটা পাওয়া-না পাওয়ার বাইরে এক দীর্ঘ নীরব যাত্রা।

যেখানে কুদ্দুছ শুধু একটাই সত্য জানে—

ঐশি তার জীবনে ছিল, আছে, আর কোনো না কোনোভাবে থাকবেই।

সমান্ত।।