ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৮:৪৮:১৭ PM

উপন্যাস:“শেষ দেখা”

মান্নান মারুফ
16-04-2026 01:54:34 PM
উপন্যাস:“শেষ দেখা”

পর্ব – ৩

ঘরটা আগের মতোই ঠাণ্ডা।

কিন্তু আজ সামিরের শরীর কাঁপছে—শীতের জন্য না, ক্লান্তির জন্য।

সে ঠিক কবে শেষবার ঘুমিয়েছে—মনে করতে পারে না।

তার চোখের নিচে গভীর কালো দাগ। ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে গেছে। গলায় শব্দ আটকে যায়।

তার সামনে আবার সেই টেবিল।

আবার সেই লোক।

“আজ শেষ সুযোগ।” — লোকটা ধীরে বলল।

সামির কিছু বলল না।

তার মাথা নিচু।

“তুমি যদি আজ স্বীকার করো—সব সহজ হবে।”

“আর যদি না করি?”

লোকটা একটু ঝুঁকে এল।

“তাহলে তুমি এখানে থাকবা… কতদিন—তা আমরা জানি না, তুমিও না।”

একটা দীর্ঘ নীরবতা।

ঘড়ির টিকটিক শব্দ যেন দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে।

তাকে একটা কাগজ দেওয়া হলো।

তাতে লেখা—

“আমি স্বীকার করছি যে আমি সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছি…”

সামির কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

এই কয়েকটা লাইনের ভেতর তার পুরো জীবন আটকে গেছে।

সে মাথা তুলে বলল—
“আমি এটা লিখতে পারব না…”

লোকটা এবার আর হাসল না।

চুপচাপ উঠে দাঁড়াল।

দরজার দিকে হাঁটল।

তারপর বলল—
“ওকে নিয়ে যাও।”

অন্য একটা ঘর।

এখানে কোনো প্রশ্ন নেই।

কোনো শব্দ নেই।

শুধু সময়।

তাকে একা বসিয়ে রাখা হলো।

ঘন্টা যায়।

আরও কয়েক ঘন্টা যায়।

কেউ আসে না।

কেউ কথা বলে না।

এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় চাপ।

মাথার ভেতর শব্দ শুরু হয়—

“স্বীকার কর… শেষ হয়ে যাবে…”

“না, আমি করি নাই…”

“কেউ বিশ্বাস করবে?”

“আম্মা করবে…”

“তুই কি ওরে আবার দেখতে পারবি?”

এই প্রশ্নটা তাকে ভেঙে দিল।

আবার তাকে সেই টেবিলে আনা হলো।

লোকটা এবার কিছু বলল না।

শুধু কাগজটা সামনে ঠেলে দিল।

“লিখো।”

সামিরের হাত কাঁপছে।

তার মাথায় শুধু একটা ছবি—

তার মা কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে…

তার চোখে পানি…

“তুই ঠিক আছিস?”

সে কলমটা ধরল।

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।

তারপর ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করল।

প্রতিটা শব্দ যেন তার বুক থেকে ছিঁড়ে বের হচ্ছে।

শেষে সে সই করল।

কলমটা হাত থেকে পড়ে গেল।

লোকটা কাগজ তুলে নিয়ে বলল—
“দেখছো? এত কঠিন ছিল?”

সামিরকে এবার একটা সেলে নিয়ে যাওয়া হলো।

ভেতরে ইতিমধ্যে কয়েকজন আছে।

তাদের চোখে একই ক্লান্তি।

একজন এগিয়ে এসে বলল—
“নতুন?”

সামির মাথা নেড়ে বলল—
“হ…”

“কী অভিযোগ?”

সে একটু থেমে বলল—
“…স্বীকার করছি—ওরা যা বলছে…”

লোকটা হালকা হেসে বলল—
“আমরা সবাই স্বীকার করছি।”

এই হাসির ভেতরও তিক্ততা।

সেলের এক কোণে বসে আছে ইয়াসিন।

সে সেই কাগজটা এখনও ধরে আছে।

“তুই লিখতেছিস?”—সামির জিজ্ঞেস করল।

ইয়াসিন তাকাল।
“হ… যদি কেউ পড়ে কোনোদিন…”

“কি লিখছিস?”

“সত্য…”

সামির একটু চুপ করে থাকল।

“সত্য কি থাকে?”

ইয়াসিন উত্তর দিল—
“না… কিন্তু আমরা লিখে রাখি।”

মায়ের পৃথিবী

এদিকে নাজওয়া…

আজ ৭ দিন হয়ে গেছে।

সামিরের কোনো খবর নেই।

তিনি প্রতিদিন একটা ব্যাগ নিয়ে বের হন।

যেন কোথাও গিয়ে ছেলেকে খুঁজে পাবেন।

লোকজন এখন তাকে দেখে চুপ হয়ে যায়।

কারণ তারা জানে—
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই।

একদিন তিনি একটা অফিসের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

“আমার ছেলে… সামির… আপনারা জানেন?”

একজন অফিসার কাগজ উল্টে বলল—
“নাম আছে।”

নাজওয়ার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“কোথায়? আমি দেখা করবো!”

“এখন সম্ভব না।”

“কেন?”

“প্রক্রিয়া চলছে।”

এই ‘প্রক্রিয়া’ শব্দটা তার কাছে মৃত্যুর মতো শোনায়।

বাড়ি ফিরে তিনি দরজা বন্ধ করলেন।

তারপর হঠাৎ চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলেন।

“আল্লাহ! আমি কী দোষ করছিলাম?”

তার কণ্ঠ ফেটে যাচ্ছে।

“আমার পোলারে কেন নিছো?”

তার ছোট মেয়ে কোণায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

সে ভয় পাচ্ছে।

কারণ সে তার মাকে এমন কখনও দেখেনি।

নাজওয়া মাটিতে বসে পড়লেন।

তার হাত আকাশের দিকে—

“তুই যদি ওরে ফিরায়া না দিস… আমি কেমনে বাঁচমু?”

এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয় না।

কারাগারের রাত

সেলের ভেতর অন্ধকার।

সবাই চুপ।

হঠাৎ কেউ ফিসফিস করে বলল—
“তুই কি স্বপ্ন দেখিস?”

সামির বলল—
“না…”

“আমি দেখি… আমি বাসায় যাই…”

আরেকজন বলল—
“আমি মায়ের রান্নার গন্ধ পাই…”

ইয়াসিন আস্তে বলল—
“আমি লিখি…”

সামির চোখ বন্ধ করল।

আজ তার ঘুম আসছে।

কিন্তু এই ঘুম শান্ত না।

সে স্বপ্নে দেখে—

সে আবার সেই কাগজে সই করছে।

বারবার।

শেষ দৃশ্য

সকালে দরজা খুলল।

একজন চিৎকার করল—
“সামির!”

সে চমকে উঠল।

“বের হও!”

সে উঠে দাঁড়াল।

তার বুক কাঁপছে।

কোথায় নিয়ে যাবে—সে জানে না।

সে একবার পেছনে তাকাল।

ইয়াসিন বলল—
“যদি বাইরে যাও… আমাদের কথা বলিস…”

সামির কিছু বলল না।

শুধু মাথা নেড়ে বের হয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

এই পৃথিবীতে কিছু স্বীকারোক্তি আছে—
যেগুলো সত্য না, তবুও লেখা হয়।

কিছু কাগজ আছে—
যেগুলো মানুষের ভাগ্য লিখে দেয়।

আর কিছু মা আছে—
যারা জানে তাদের সন্তান নির্দোষ…

কিন্তু তা প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই।

চলবে........