ঢাকা, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৪:৪৬:৩৩ PM

উপন্যাস:“লুচ্চা”

মান্নান মারুফ
12-04-2026 02:53:34 PM
উপন্যাস:“লুচ্চা”

পর্ব:-২ 

লুচ্চা—শব্দটা এখন আর শুধু একটি শব্দ নয়, যেন কুদ্দুছের নামের সঙ্গেই মিশে গেছে। কেউ সরাসরি বলে না, কিন্তু তার নিজের কানে শব্দটা বারবার ফিরে আসে। বাতাসে ভেসে বেড়ায়, স্মৃতির ভেতর প্রতিধ্বনি তোলে, নিঃশব্দ রাতের অন্ধকারে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লুচ্চা ।

তবুও আশ্চর্যের বিষয়—কুদ্দুছ ভেঙে পড়েনি।

তার বুকের ভেতরে কষ্ট আছে, তীব্র কষ্ট—কিন্তু সে মন খারাপ করে বসে থাকেনি। কারণ, সে নিজের মতো করে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে।

“নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসলে এরকম অপমান হওয়াটাই স্বাভাবিক।”

এই কথাটা সে নিজেকে বারবার বোঝায়।

তার কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—কিছু না চাওয়া, শুধু দেওয়া। আর যদি সেই দেওয়ার পথে অপমান আসে, তাও মেনে নেওয়া উচিত। যেন এটা ভালোবাসার পরীক্ষারই একটা অংশ।

সকালের আলো জানালা দিয়ে ঢুকছিল। কুদ্দুছ চুপচাপ বসে ছিল তার ডায়েরি নিয়ে। আগের রাতের লেখা এখনও ভেজা—কালির সঙ্গে মিশে আছে তার অশ্রু।

সে নতুন করে লিখতে শুরু করল—

“লুচ্চা—শব্দটা কি সত্যিই এত খারাপ?
নাকি আমরা এটাকে খারাপ বানিয়ে ফেলেছি?
যদি কেউ না বুঝে বলে, তাহলে কি সেটাও অপরাধ?”

তার হাত থেমে গেল। কিছুক্ষণ কলমটা আঙুলের মধ্যে ঘুরাতে লাগল।

তার মনে হলো—মেহরিন হয়তো ইচ্ছা করেই এ কথা বলেনি। হয়তো রাগের মাথায়, না বুঝে বলে ফেলেছে। এই শহরে, এই সমাজে “লুচ্চা” শব্দটা খুব অচেনা কিছু নয়। অনেকেই কথার কথায় বলে ফেলে, তার গভীরতা না ভেবেই।

এই ভাবনাটাই তাকে একটু শান্তি দেয়।

কুদ্দুছ এখন আগের মতো মেহরিনের পিছু নেয় না। সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। কলেজে যায়, ক্লাস করে, চুপচাপ বাড়ি ফিরে আসে।

তবুও, চোখ তো নিজের ইচ্ছায় চলে না।

দূর থেকে যখন মেহরিনকে দেখে, তার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। কিন্তু সে নিজেকে শক্ত করে রাখে। নিজের চোখকে বোঝায়—“দেখবি, কিন্তু কাছে যাবি না।”

এই দূরত্বটা সে নিজেই তৈরি করেছে—নিজেকে দোষী মনে করে নয়, বরং মেহরিনকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য।

একদিন লাইব্রেরিতে বসে ছিল কুদ্দুছ। চারপাশে নিস্তব্ধতা। বইয়ের পাতার শব্দ, ফ্যানের হালকা ঘূর্ণন—সবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের শান্ত পরিবেশ।

হঠাৎ তার চোখ পড়ল—মেহরিন কয়েকটা টেবিল দূরে বসে আছে।

সে একটু থমকে গেল।

আগের মতো হলে হয়তো সে অজান্তেই তার দিকে তাকিয়ে থাকত। কিন্তু আজ সে মাথা নিচু করে বইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

তবুও, তার মনটা বারবার বলছিল—“একবার তাকাও…”

শেষমেশ সে তাকাল।

মেহরিন পড়ায় মনোযোগী। তার মুখে কোনো রাগ নেই, কোনো বিরক্তিও নেই। যেন কিছুই ঘটেনি।

এই দৃশ্যটা কুদ্দুছের মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করল।

“তাহলে কি সে ভুলে গেছে?”

এই প্রশ্নটা তাকে নাড়া দিল।

কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে থামাল—

“ভুলে গেলেই ভালো। আমার জন্যও ভালো, তার জন্যও ভালো।”

কুদ্দুছের বন্ধু রাশেদ একদিন তাকে বলল,
“তুই আগের মতো নেই রে। কী হয়েছে?”

কুদ্দুছ হালকা হেসে বলল,
“কিছু না। একটু ভাবি বেশি।”

রাশেদ সন্দেহের চোখে তাকাল,
“কাউকে ভালোবাসছিস নাকি?”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“ভালোবাসা কি লুকানো যায়?”

রাশেদ হেসে বলল,
“না, যায় না। কিন্তু তুই লুকাতে চাস।”

কুদ্দুছ এবার একটু গভীরভাবে বলল,
“সব ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য না।”

এই কথাটার ভেতরে তার সমস্ত কষ্ট লুকিয়ে ছিল।

দিনগুলো ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছিল। কুদ্দুছ তার জীবনের ছন্দটা বদলে ফেলেছে।

সে এখন বেশি সময় দেয় নিজের মধ্যে। বই পড়ে, ডায়েরি লেখে, ছাদে বসে আকাশ দেখে।

তার ভালোবাসা এখন আর বাইরে প্রকাশ পায় না—ভেতরে জমে থাকে, গভীর হয়।

একদিন রাতে সে আবার ডায়েরি খুলল।

লিখল—

“আমি তাকে আর কষ্ট দিতে চাই না।
যদি আমার উপস্থিতিই তার অস্বস্তির কারণ হয়,
তাহলে আমার দূরে থাকাটাই ভালোবাসা।”

তার চোখে জল আসছিল, কিন্তু সে কাঁদল না।

কারণ, সে এখন কাঁদাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছে।

তবুও, কিছু প্রশ্ন তাকে ছাড়ে না।

“যদি একদিন সে বুঝতে পারে?
যদি একদিন সে জানতে পারে—আমি খারাপ ছিলাম না?”

এই আশাটা খুব ছোট, কিন্তু পুরোপুরি নিভে যায়নি।

এই আশাটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে।

একদিন বিকেলে কলেজের মাঠে হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটল।

একজন ছেলে মেহরিনের সঙ্গে জোরে জোরে কথা বলছিল। তার ভঙ্গিতে ছিল রুক্ষতা।

কুদ্দুছ দূর থেকে দেখছিল।

তার ভেতরে একটা অস্থিরতা তৈরি হলো। সে এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু সাথে সাথে থেমে গেল।

“আমি কে?”

এই প্রশ্নটা তাকে থামিয়ে দিল।

সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেল। মেহরিন সেখান থেকে চলে গেল।

কুদ্দুছ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তার মনে হলো—ভালোবাসা মানে শুধু কাছে থাকা না, অনেক সময় দূরে থেকেও ভালো চাওয়া।

রাতে সে আবার লিখল—

“আজ আমি কিছু করতে পারতাম।
কিন্তু করিনি।
কারণ, আমি চাই না সে আবার আমাকে ভুল বুঝুক।”

কুদ্দুছ এখন একটা জিনিস বুঝতে শুরু করেছে—ভালোবাসা সবসময় সুন্দর হয় না। অনেক সময় তা কষ্টের, অপমানের, ভুল বোঝাবুঝির মধ্য দিয়ে যায়।

কিন্তু তবুও, ভালোবাসা তার কাছে পবিত্র।

সে বিশ্বাস করে—একদিন না একদিন, সত্যিকারের অনুভূতি নিজের জায়গা করে নেবে।

শেষ রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকাল।

মৃদু হাওয়া বইছে। দূরে কোথাও একটা গান ভেসে আসছে।

সে আস্তে করে বলল—

“তুমি আমাকে লুচ্চা বলেছো—ঠিক আছে।
আমি সেটা মেনে নিলাম।
কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসা বন্ধ করতে পারব না।”

তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল শুধু এক ধরনের স্বীকারোক্তি।

এইভাবে কুদ্দুছ তার কষ্টকে নিজের মধ্যে ধারণ করে এগিয়ে যেতে শুরু করল।

সে ভাঙেনি, বরং একটু একটু করে বদলাচ্ছে—আরও গভীর হচ্ছে, আরও নীরব হচ্ছে।

তার ভালোবাসা এখন আর কারও চোখে পড়ে না।

কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতরে—সেটা আগের চেয়েও বেশি জ্বলছে।

আর সেই আগুনই হয়তো একদিন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।

(চলবে…)