ঢাকা, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৬:৩৯:৩০ PM

উপন্যাস: বাঁকা চোখ”

মান্নান মারুফ
06-04-2026 03:56:40 PM
উপন্যাস: বাঁকা চোখ”

শেষ পর্ব

ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের সেই গ্রামটায় আজ এক অদ্ভুত নীরবতা। যেন কিছু একটা ঘটেছেযা সবাই জানে, কিন্তু কেউ উচ্চস্বরে বলতে চায় না। কাঁচা রাস্তার ধুলো, চায়ের দোকানের বেঞ্চ, বাঁশঝাড়ের ফাঁকসব জায়গায় যেন এক অদৃশ্য প্রশ্ন ভাসছে।

কিন্তু আজ আর কেউ ফিসফাস করছে না।

কারণ তারা যা চেয়েছিল, তা- হয়েছে।

গ্রামের কাজিকে ডেকে খুব নীরবে, খুব ছোট আয়োজনে রিম‘র বিয়ে হয়ে গেছে।

মজিবুর রহমান আর রিমাএখন স্বামী-স্ত্রী।

যে সম্পর্ক একদিন ছিল আশ্রয়ের, স্নেহের, পিতৃত্বের মতো এক গভীর বন্ধনআজ তা বদলে গেছে সমাজের চাপে, অপবাদের ভয়ে।

কেউ বলছে—“ঠিকই হয়েছে।

কেউ বলছে—“এখন আর কিছু বলার নেই।

কিন্তু এইঠিকহওয়ার আড়ালে যে কত বড় ভুল লুকিয়ে আছে, সেটা কেউ ভাবছে না।

বিয়েটা হয়েছিল এক সন্ধ্যায়।

আকাশে তখন ম্লান আলো। কুয়াশা নেমে আসছিল ধীরে ধীরে। উঠোনে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলনীরব, উদাসীন।

কাজি সাহেব প্রয়োজনীয় কথা বললেন, কাগজে সই হলো।

রিমা মাথা নিচু করে বসে ছিল। তার হাত কাঁপছিল।

কবুল”—শব্দটা তার ঠোঁট থেকে বের হলো, কিন্তু সেই শব্দে কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না।

মজিবুর রহমানওকবুলবললেন।

তার কণ্ঠে ছিল ক্লান্তি, পরাজয়, আর এক গভীর যন্ত্রণা।

সেই মুহূর্তে তারা সমাজকে হারিয়ে দিল।

কিন্তু নিজেদের ভেতরে কী হারালতা শুধু তারা দুজনই জানে।

বিয়ের পরের দিনগুলো খুব নিঃশব্দে কেটে যেতে লাগল।

বাইরের পৃথিবী যেন হঠাৎ শান্ত হয়ে গেছে।

চায়ের দোকানে আর কেউ কথা তোলে না।

রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কেউ আর বাঁকা চোখে তাকায় না।

সবকিছু যেন স্বাভাবিক।

কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অস্বাভাবিক শূন্যতা।

রিমার চোখে এখন সারাক্ষণ এক গভীর বিষণ্ণতা।

সে আগের মতো হাসে না।

তার চোখের ডাগর দৃষ্টি এখন যেন সবসময় ভেতরের কোথাও হারিয়ে থাকে।

সে নিজের কাজ করে, দাদুরনা, এখন তার স্বামীরখেয়াল রাখে।

সময়মতো ওষুধ দেয়, খাবার বানায়, রাতে পাশে বসে থাকে।

সবকিছু আগের মতোই।

তবুও কিছু একটা আর আগের মতো নেই।

একদিন রাতে মজিবুর রহমান কাশছিলেন।

রিমা আগের মতোই তার পাশে বসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।

কিন্তু আজ সেই স্পর্শে একটা অদ্ভুত সংকোচ ছিল।

মজিবুর রহমান সেটা বুঝতে পারলেন।

কষ্ট হচ্ছে?”—তিনি আস্তে জিজ্ঞেস করলেন।

রিমা একটু থেমে বলল

নাআমি তো আছি…”

কথাটা বলল, কিন্তু তার কণ্ঠে সেই আগের স্বচ্ছতা ছিল না।

মজিবুর রহমান চোখ বন্ধ করলেন।

তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

তিনি বুঝতে পারছেনসমাজের চাপ থেকে বাঁচতে গিয়ে তারা নিজেদের ভেতরের সম্পর্কটাই হারিয়ে ফেলেছেন।

যে মেয়েটা একদিন তাকেদাদুবলে ডাকত, তার হাত ধরে নিরাপত্তা খুঁজতআজ সে অন্য পরিচয়ে তার পাশে আছে।

কিন্তু সেই পরিচয় তাদের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে।

রিমা একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে নিজের দিকে তাকাল।

তার মনে হলোসে কি সত্যিই জিতেছে?

সমাজ আজ চুপ।

কেউ কিছু বলছে না।

কেউ আর আঙুল তুলছে না।

তাহলে কি সে জিতেছে?

তার চোখে জল চলে এলো।

সে ধীরে ধীরে নিজের মুখ স্পর্শ করল।

তার মনে হলোসে সমাজকে হারিয়েছে, কিন্তু নিজের একটা অংশ হারিয়ে ফেলেছে।

তার দাদু-নাতনির সম্পর্কটা।

সেই নির্মল, নিঃস্বার্থ, নির্ভরতার সম্পর্ক।

কিন্তু তবুও

তবুও তার ভেতরে একটা শান্তি আছে।

কারণ এখন সে তার দাদুর পাশে থাকতে পারছেকেউ তাকে সরিয়ে দিতে পারছে না।

সে তার সেবা করতে পারছে, তার যত্ন নিতে পারছেএকটাবৈধপরিচয়ের আড়ালে।

এই সমাজ, যে সমাজ তাকে একসময় দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছিল, আজ সেই সমাজই তার থাকার অনুমতি দিয়েছে।

এই অনুমতির জন্য তাকে যে মূল্য দিতে হয়েছেতা অনেক বড়।

তবুও সে মেনে নিয়েছে।

কারণ তার কাছে ভালোবাসা মানেএকজন মানুষকে হারাতে না দেওয়া।

ভালোবাসা মানেতার পাশে থাকা, যেকোনো মূল্যে।

একদিন বিকেলে রিমা আবার নদীর পাড়ে গেল।

অনেকদিন পর।

ব্রহ্মপুত্র আগের মতোই বয়ে যাচ্ছে।

নদী বদলায়নি।

বদলেছে শুধু মানুষের জীবন।

সে বসে রইল, নদীর দিকে তাকিয়ে।

তার মনে হলোনদী সব জানে।

এই গ্রামের গল্প, মানুষের নিষ্ঠুরতা, আর তার নিজের ত্যাগ।

হঠাৎ তার চোখে জল এলো।

কিন্তু সে কাঁদল না।

কারণ সে জানেতার কান্না কেউ বুঝবে না।

সে শুধু আস্তে করে বলল

আমি তোমাকে ছাড়িনি দাদুআমি শুধু অন্যভাবে তোমার পাশে দাঁড়িয়েছি…”

বাতাস বয়ে গেল।

নদীর জল একটু দুলে উঠল।

যেন কোথাও থেকে একটা নীরব উত্তর এলো।

সন্ধ্যা নেমে এলো ধীরে ধীরে।

রিমা উঠে দাঁড়াল।

তার পথ এখন স্পষ্টযত কষ্টই হোক, সে এই পথেই হাঁটবে।

কারণ এই পথেই আছে তার ভালোবাসা।

বাড়িতে ফিরে সে দেখল, মজিবুর রহমান উঠানে বসে আছেন।

সে এগিয়ে গিয়ে তার পাশে বসলো।

কিছু বলল না।

মজিবুর রহমানও কিছু বললেন না।

কিন্তু তাদের নীরবতার ভেতরেই ছিল এক গভীর সত্য

ভালোবাসা কখনো সহজ না।

কখনো তা ত্যাগ চায়, কখনো আত্মসমর্পণ।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত, ভালোবাসা মানেপাশে থাকা।

এই গল্পে সমাজ জিতেছে, আবার হেরেছে।

রিমা জিতেছে, আবার হেরেছে।

মজিবুর রহমান জিতেছেন, আবার হেরেছেন।

কিন্তু একটাই জিনিস শেষ পর্যন্ত টিকে আছে

একটি মানুষ আরেকটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প।

বাঁকা চোখের সমাজ হয়তো আজ চুপ।

কিন্তু সেই বাঁকা চোখের আড়ালে যে অন্ধকার, তা এখনো রয়ে গেছে।

আর সেই অন্ধকারের মাঝেই ছোট্ট এক আলো জ্বলছে

ভালোবাসার আলো।

যে ভালোবাসা নিখুঁত না, নিঃস্বার্থ না, কিন্তু সত্য।

আর সেই সত্যই এই গল্পের শেষ কথা।

সমাপ্ত।