ঢাকা, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৪:৫৬:৫০ PM

উপন্যাস: বাঁকা চোখ”

মান্নান মারুফ
06-04-2026 03:19:41 PM
উপন্যাস: বাঁকা চোখ”

পর্ব

ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের সেই গ্রামটা বাইরে থেকে যত শান্ত, ভেতরে ততটাই অস্থির। মানুষের চোখে যে বাঁকা দৃষ্টি লুকিয়ে থাকে, তা মাঝে মাঝে এমনভাবে প্রকাশ পায়যেন তা শুধু দৃষ্টি নয়, এক ধরনের নিষ্ঠুর বিচার।

সেদিন দুপুরটা ছিল অস্বাভাবিক নীরব।

আকাশে মেঘ জমেছিল, বাতাসে অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা। গ্রামের মাঝখানে কাঁচা রাস্তার ধারে কয়েকজন লোক জড়ো হয়েছিল। তাদের মুখে ফিসফাস নেই, বরং আজ কথা বলার ভঙ্গিটা স্পষ্ট, কড়া।

কারণ আজ সেখানে এসেছেন গ্রামের প্রভাবশালী মাতব্বরহাজী করিমুদ্দিন।

তার কথাই এই গ্রামে শেষ কথা।

মজিবুর রহমান তখন উঠানে বসে ছিলেন। হাতে একটা পুরোনো লাঠি, চোখে ক্লান্তি। তিনি বুঝতে পারছিলেন, আজ কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

হাজী করিমুদ্দিন এসে দাঁড়ালেন তার সামনে। সঙ্গে আরও কয়েকজন।

মজিবুর!”—তার কণ্ঠে ছিল কঠোরতা—“তোমার সাথে কিছু কথা আছে।

মজিবুর রহমান ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

জি, বলেন।

মাতব্বর চারপাশে তাকিয়ে একটু গলা খাঁকারি দিলেন, যেন সবাই শুনতে পায়।

এই গ্রামে আমরা অনেক কিছু সহ্য করেছি। কিন্তু একটা সীমা আছে।

মজিবুর রহমান চুপ।

তুমি একটা জোয়ান মেয়েকে নিয়ে একা থাকো। বলো, এটা কি ঠিক?”

চারপাশে ফিসফাস শুরু হলো।

মজিবুর রহমান শান্ত গলায় বললেন, “ আমার নাতনি।

নাতনি?”—মাতব্বর ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলেন—“এই গল্প আমরা অনেক শুনেছি।

তার কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল

সোজা কথা বলিহয় মেয়েটারে বিদেয় করো, নয়তো গ্রাম ছাড়ো।

এই কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো পড়ল।

চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

মজিবুর রহমান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

আপনি কী বলছেন?”—তিনি কষ্টে বললেন।

যা বলছি, স্পষ্ট বলছি,”—মাতব্বর উত্তর দিলেন—“বুড়ো বয়সে জোয়ান নাতনি নিয়ে ঘর করা মানায় না। গ্রামের মান-সম্মান বলে কিছু আছে।

এই কথাগুলো ছুরির মতো বিঁধল।

কিন্তু মজিবুর রহমান প্রতিবাদ করলেন না।

তিনি শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

কারণ তিনি জানেনএই সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সহজ না।

এই সবকিছু আড়াল থেকে শুনছিল রিমা।

ঘরের ভেতর দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে তার পুরো শরীর কাঁপছিল।

প্রতিটা শব্দ যেন তার হৃদয়ে আঘাত করছিল।

হয় মেয়েটারে বিদায় করো, নয়তো গ্রাম ছাড়ো”—এই কথাটা তার কানে বারবার বাজছিল।

সে বুঝতে পারলতার একমাত্র আশ্রয়টুকু কেড়ে নিতে চাইছে এই সমাজ।

তার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ল।

মাতব্বর চলে গেলেন।

লোকজনও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল।

কিন্তু সেই কথাগুলো বাতাসে থেকে গেলভারী, তীক্ষ্ণ, নির্মম।

মজিবুর রহমান অনেকক্ষণ উঠানে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বসে পড়লেন।

তার চোখে চিন্তার ছাপ।

এই মানুষটা, যিনি এতদিন সবকিছু সহ্য করে গেছেন, আজ যেন ভেঙে পড়লেন।

রিমা আর থাকতে পারল না।

সে দৌড়ে এসে তার সামনে বসে পড়ল।

দাদু…”—তার কণ্ঠ কাঁপছিল।

মজিবুর রহমান মুখ তুলে তাকালেন।

তার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে

সব শুনেছিস?”—তিনি ধীরে জিজ্ঞেস করলেন।

রিমা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না।

তারপর রিমা বলল

আমি চলে যাবো।

এই কথাটা শুনে মজিবুর রহমান যেন চমকে উঠলেন।

কি বলছিস?”

আমি চলে গেলে তো সমস্যা শেষ হয়ে যাবে। তুমি শান্তিতে থাকতে পারবে।

তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, কিন্তু চোখে অশ্রু।

মজিবুর রহমান হঠাৎ রাগে কাঁপতে লাগলেন।

এই কথা আর কখনো বলবি না!”—তিনি জোরে বললেন।

রিমা থমকে গেল।

তুই চলে গেলে আমি বাঁচবো কীভাবে?”—তার কণ্ঠ ভেঙে গেল—“তুই কি ভাবিস, তুই আমার ওপর বোঝা?”

রিমা কাঁদতে লাগল।

কিন্তু েআমার জন্যই তো এত অপমান…”

অপমান আমি সহ্য করতে পারি,”—তিনি বললেন—“কিন্তু তোকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।

এই কথাটা শুনে রিমা ভেঙে পড়ল।

সে মজিবুর রহমানের হাত ধরে কাঁদতে লাগল।

আমি তোমাকে ছাড়বো না দাদু…”

আমিও না,”—তিনি তার মাথায় হাত রেখে বললেন—“যাই হোক, আমরা একসাথে থাকবো।

সেই মুহূর্তে তাদের মাঝে এক অদ্ভুত শক্তি তৈরি হলো।

বাইরের সমাজ যতই নিষ্ঠুর হোক, তাদের ভেতরের বন্ধনটা আরও শক্ত হয়ে উঠল।

ওদিকে গ্রামের মানুষ আবার আলোচনা শুরু করেছে।

মাতব্বর ঠিকই করেছে!”

গ্রামের মান-সম্মান রাখতে হবে!”

কিন্তু সবাই একমত না।

কিছু মানুষ চুপচাপ আছে।

তারা কিছু বলছে না, কিন্তু ভাবছে।

হয়তো তাদের ভেতরে কোথাও প্রশ্ন জাগছেএই বিচারটা কি ঠিক?

সেই রাতে রিমা ঘুমাতে পারল না।

সে বারবার ভাবছিলতার জন্যই কি দাদুকে এত কষ্ট পেতে হচ্ছে?

কিন্তু একই সঙ্গে সে এটাও বুঝছিলএই সম্পর্কটা কোনো ভুল না।

এটা ভালোবাসা।

নিঃস্বার্থ, নির্মল ভালোবাসা।

ভোরের দিকে সে একটা সিদ্ধান্ত নিল।

সে ভয় পাবে না।

সে পালিয়ে যাবে না।

সে লড়বে।

নিজের জন্য না, এই সম্পর্কটার জন্য।

এই ভালোবাসার জন্য।

পরদিন সকালে সে যখন বাইরে বের হলো, তার চোখে এক অন্যরকম দৃঢ়তা।

মানুষ এখনো তাকাচ্ছে।

বাঁকা চোখে।

কিন্তু আজ সেই দৃষ্টিগুলো তাকে থামাতে পারছে না।

কারণ সে জানেভালোবাসা কখনো লজ্জার না।

লজ্জা তাদের, যারা ভালোবাসাকে অপমান করে।

ব্রহ্মপুত্রের জল তখন ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে।

নদী যেন সবকিছু দেখছে, শুনছে।

সমাজের নিষ্ঠুরতা, মানুষের সংকীর্ণতা, আর দুইটি মানুষের অটল ভালোবাসা।

ঝড় আসছে।

কিন্তু এই ঝড়ের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে দুইটি মানুষএকসাথে।

আর সেই একসাথে থাকাটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

(চলবে…)