পর্ব – ৪
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে শীত নামে একটু ভিন্নভাবে। কুয়াশা ধীরে ধীরে গ্রামটাকে ঢেকে ফেলে, যেন সাদা এক চাদরে সবকিছু ঢেকে গেছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা আরও তীব্র হয়, বাতাসে এক ধরনের কাঁপুনি মেশে। দূরের কোনো বাঁশবাগান থেকে শোঁ শোঁ শব্দ আসে, আর মাঝে মাঝে কুকুরের ডাকে নিস্তব্ধতা ভেঙে যায়।
এই শীতের রাতগুলো মজিবুর রহমানের জন্য কষ্টের।
তার পুরোনো হাঁপানিটা শীত পড়লেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বুকের ভেতর থেকে অদ্ভুত এক শব্দ বের হয়—যেন প্রতিটা নিঃশ্বাসই এক একটা লড়াই।
সেই রাতেও ঠিক এমনটাই হলো।
রাত প্রায় বারোটা। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে কাশির শব্দ শোনা গেল।
রিমার ঘুম ভেঙে গেল।
সে উঠে দৌড়ে গেল মজিবুর রহমানের ঘরে। দেখল, তিনি খাটে বসে আছেন, বুক চেপে ধরে হাঁপাচ্ছেন।
“দাদু!”—রিমা ভয় পেয়ে ডাকল।
মজিবুর রহমান কিছু বলতে পারছিলেন না। শুধু কষ্ট করে শ্বাস নিচ্ছিলেন।
রিমা দ্রুত তার পাশে বসে গেল। বালিশটা একটু উঁচু করে দিল, তারপর ধীরে ধীরে তার পিঠে হাত বুলাতে লাগল।
“ধীরে ধীরে শ্বাস নাও দাদু… আমি আছি…”—সে ফিসফিস করে বলল।
তার কণ্ঠে ছিল মায়া, সান্ত্বনা আর অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
রাত বাড়তে লাগল।
ঘরের ভেতর শুধু মজিবুর রহমানের কষ্টের শ্বাস আর রিমার নরম কণ্ঠের শব্দ।
সে সারারাত তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। মাঝে মাঝে পানি খাওয়াল, মাথায় হাত রাখল।
তার নিজের চোখে ঘুম ছিল, শরীর ক্লান্ত ছিল—তবুও সে থামেনি।
কারণ এই মুহূর্তে তার নিজের আরাম কোনো বিষয় না।
মজিবুর রহমানের কষ্টটাই তার কাছে সবচেয়ে বড়।
একসময় একটু স্বস্তি পেলেন তিনি। শ্বাসটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে লাগল।
রিমা তখনও তার পাশে বসে।
“এবার একটু শুয়ে পড়ো দাদু…”—সে আস্তে বলল।
মজিবুর রহমান তার দিকে তাকালেন। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু সেই সাথে এক গভীর স্নেহ।
“তুই ঘুমাসনি?”—তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
রিমা হেসে বলল, “ঘুম তো পরে হবে। তুমি আগে ঠিক হও।”
তিনি কিছু বলতে পারলেন না। শুধু তার হাতটা ধরে রাখলেন।
সেই হাতটা খসখসে, শক্ত—কিন্তু সেই স্পর্শে রিমার মনে হলো, এটাই তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
তার মনে হলো—এই হাত দুটোই তার পরম তীর্থ।
এই হাতই তাকে আগলে রেখেছে, তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
রাত শেষ হলো ধীরে ধীরে।
ভোরের আলো ফুটতেই কুয়াশার ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো ঘরে ঢুকল।
রিমা তখনো জেগে।
তার চোখ লাল, কিন্তু মুখে শান্তি।
মজিবুর রহমান একটু ঘুমিয়ে পড়েছেন।
রিমা চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটার জন্যই তার সবকিছু।
এমন সময় দরজার বাইরে কারো কণ্ঠ শোনা গেল।
“এই মজিবুর ভাই, জেগে আছেন?”
রিমা দরজা খুলে দেখল, পাশের বাড়ির রহিম চাচা দাঁড়িয়ে।
“কী হয়েছে?”—রিমা জিজ্ঞেস করল।
“শুনলাম রাতে আবার অসুখ বাড়ছিল?”
রিমা মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, এখন একটু ভালো।”
রহিম চাচা ভেতরে ঢুকে মজিবুর রহমানের দিকে তাকালেন।
তার মুখে একটা অদ্ভুত ভাব।
“এই বয়সে এত কষ্ট… আর তুমি একা সামলাও?”—তিনি বললেন।
রিমা শান্তভাবে উত্তর দিল, “সে একা না। আমি আছি তার সাথে।”
এই কথাটা শুনে রহিম চাচা একটু থেমে গেলেন।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তুমি খুব সাহসী মেয়ে।”
রিমা কিছু বলল না।
কিন্তু এই কথাটা তার মনে একটা আলাদা অনুভূতি তৈরি করল।
সবাই যে শুধু বাঁকা চোখে তাকায়, তা না।
কেউ কেউ আছে, যারা বুঝতে শেখে।
ওদিকে চায়ের দোকানে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে।
“রাতে নাকি মেয়েটা সারারাত পাশে ছিল!”
“হ, এত যত্ন করে! ব্যাপারটা বুঝেন!”
কেউ একজন একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনারা কি কখনো ভাবছেন, এটা হয়তো ভালোবাসা?”
সবাই তাকাল।
“ভালোবাসা?”—একজন হেসে বলল—“এই যুগে?”
লোকটা বলল, “হ্যাঁ, এই যুগেই। ভালোবাসা মানে শুধু স্বামী-স্ত্রী না। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোও ভালোবাসা।”
চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো।
কেউ কোনো উত্তর দিল না।
কিন্তু কথাটা যেন বাতাসে ভেসে রইল।
সেদিন বিকেলে রিমা আবার নদীর পাড়ে গেল।
শীতের রোদটা মোলায়েম, বাতাস ঠান্ডা।
সে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে আজ এক অদ্ভুত শান্তি।
গত রাতের কষ্ট, ভয়—সবকিছুর মাঝেও সে একটা জিনিস খুব স্পষ্টভাবে বুঝেছে—
ভালোবাসা কখনো শব্দে বোঝানো যায় না।
এটা কাজের মধ্যে থাকে, স্পর্শের মধ্যে থাকে, নিঃশব্দে পাশে থাকার মধ্যে থাকে।
সে নিজের হাতের দিকে তাকাল।
এই হাত দিয়েই সে সারারাত দাদুর পিঠে হাত বুলিয়েছে।
এই হাত দিয়েই সে তাকে আগলে রেখেছে।
তার মনে হলো—এই হাতই তার শক্তি।
এই হাতই তার ভালোবাসার ভাষা।
দূরে কিছু মানুষ এখনো তাকিয়ে আছে।
বাঁকা চোখে।
কিন্তু আজ সেই দৃষ্টিগুলো তাকে কষ্ট দিচ্ছে না।
কারণ সে জানে—তাদের দৃষ্টির চেয়ে তার ভালোবাসা অনেক বড়।
রাত নামবে আবার।
শীত আরও বাড়বে।
হয়তো আবার অসুখ বাড়বে।
কিন্তু রিমা প্রস্তুত।
সে জানে, যত কষ্টই আসুক, সে পাশে থাকবে।
কারণ ভালোবাসা মানে—কাউকে ছেড়ে না যাওয়া।
ভালোবাসা মানে—একজন মানুষকে নিজের সবটুকু দিয়ে আগলে রাখা।
আর সেই ভালোবাসাই একদিন এই গ্রামের বাঁকা চোখকে সোজা করে দেবে।
(চলবে…)