পর্ব–২:
বটগাছের নিচে বসে রায়হান তখনও স্থির হতে পারেনি। কবরের শিলালিপির সেই নাম—“নীলাঞ্জনা”—তার চোখে যেন বারবার জ্বলজ্বল করছিল। মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল একটাই প্রশ্ন—
সে কি সত্যিই একজন মৃত মানুষের প্রেমে পড়েছে?
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ভয় তার মনে স্থায়ী হতে পারল না। বরং এক অদ্ভুত টান তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল আরও গভীরে—যেন এই রহস্যের ভেতরেই তার জীবনের সত্য লুকিয়ে আছে।
সেই দিন থেকে রায়হানের জীবন বদলে গেল আরও একবার।
সে প্রতিদিন সেই কবরের কাছে যেত। কখনো সকালবেলা, কখনো সন্ধ্যায়, কখনো গভীর রাতে। কিন্তু নীলাঞ্জনা আর সেভাবে দেখা দিত না। মাঝে মাঝে শুধু হালকা বাতাস বইত, আর সেই বাতাসে ভেসে আসত পরিচিত এক সুবাস—শিউলি ফুলের মতো।
এক রাতে, আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা। চারদিকে নিস্তব্ধতা। রায়হান আবার গেল পুকুরপাড়ে।
“নীলাঞ্জনা… তুমি কি আছো?”
তার কণ্ঠে ছিল আকুলতা।
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
হঠাৎ পুকুরের জলে ছোট একটা ঢেউ উঠল।
“আমি তো আছি…”
মৃদু, ভেসে আসা কণ্ঠ।
রায়হানের শরীর কেঁপে উঠল।
“তুমি… তুমি মারা গেছো… তাই না?”—সে ধীরে ধীরে বলল।
একটু নীরবতা।
তারপর—
“মৃত্যু মানে কি শেষ?”—নীলাঞ্জনার কণ্ঠে এক গভীর শান্তি।
রায়হান উত্তর দিতে পারল না।
“যখন শরীর মরে যায়, তখন মানুষ ভাবে সব শেষ। কিন্তু আত্মা… অনুভূতি… ভালোবাসা—এসব কি এত সহজে শেষ হয়?”
রায়হান চোখ বন্ধ করল। তার মনে হচ্ছিল—এই কথাগুলো সে শুধু শুনছে না, অনুভব করছে।
“তাহলে তুমি… এখানে কেন?”—সে জিজ্ঞেস করল।
“কারণ আমি বেঁচে আছি… তোমার ভেতরে,”
নীলাঞ্জনার কণ্ঠ যেন আরও কাছে এসে গেল।
রায়হান চোখ খুলে তাকাল।
এইবার সে তাকে দেখতে পেল—আগের চেয়েও স্পষ্ট, কিন্তু তবুও যেন অদৃশ্য।
“তুমি কি কখনো কাউকে এত ভালোবেসেছো,” নীলাঞ্জনা বলল, “যে মৃত্যুও তাকে আলাদা করতে পারেনি?”
রায়হান ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“এখন… বুঝতে পারছি।”
নীলাঞ্জনা মৃদু হাসল।
“আমারও একজন ছিল… অনেক বছর আগে।”
রায়হান চমকে উঠল।
“ছিল?”
“হ্যাঁ… সে আমাকে খুব ভালোবাসত। আমিও তাকে। কিন্তু আমাদের প্রেম সমাজ মেনে নেয়নি।”
“তারপর?”—রায়হানের কণ্ঠে কৌতূহল।
নীলাঞ্জনার চোখে হঠাৎ এক ছায়া নেমে এল।
“একদিন… আমাকে বিয়ে দিতে চাইল অন্য কারও সঙ্গে। আমি রাজি হইনি। আমি পালাতে চেয়েছিলাম… তার সঙ্গে।”
“তোমরা পালিয়েছিলে?”
“না…”—নীলাঞ্জনা ধীরে বলল—
“আমি পৌঁছাতে পারিনি।”
“মানে?”
“পথেই… আমার মৃত্যু হয়।”
চারপাশ যেন হঠাৎ আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
রায়হানের বুক ভারী হয়ে উঠল।
“আর সে?”
“সে অপেক্ষা করেছিল… অনেকদিন। তারপর একদিন… সে-ও চলে যায়।”
“মরে যায়?”
“হয়তো… হয়তো না,”
নীলাঞ্জনার কণ্ঠে রহস্য।
“তুমি কি তাকে এখনো খুঁজছো?”—রায়হান জিজ্ঞেস করল।
নীলাঞ্জনা তার দিকে তাকাল গভীরভাবে।
“হ্যাঁ… খুঁজছি,”
তার চোখে যেন জল চিকচিক করছিল।
“প্রতিটা জন্মে, প্রতিটা সময়ে… আমি তাকে খুঁজি।”
রায়হানের হৃদয় কেঁপে উঠল।
“আর যদি… তুমি তাকে খুঁজে পাও?”
নীলাঞ্জনা একটু এগিয়ে এল।
“তাহলে আমার অপেক্ষা শেষ হবে।”
রায়হান হঠাৎ অনুভব করল—তার বুকের ভেতর কেমন যেন ব্যথা হচ্ছে। যেন কোনো পুরনো স্মৃতি জেগে উঠছে, যেটা সে কখনো জানত না।
“রায়হান…”
নীলাঞ্জনা তার নাম ধরে ডাকল।
“হ্যাঁ?”
“তুমি কি কখনো অনুভব করো… আমাদের এই সম্পর্কটা নতুন নয়?”
রায়হান কিছু বলতে পারল না।
কারণ সে সত্যিই এমনটাই অনুভব করছিল।
“মনে হয়… আমি তোমাকে অনেক আগে থেকেই চিনি…”—সে ধীরে বলল।
নীলাঞ্জনা মৃদু হাসল।
“হয়তো… আমরা আগেও দেখা করেছি।”
“কোথায়?”
“অন্য কোনো জীবনে।”
রায়হান স্তব্ধ হয়ে গেল।
হঠাৎ তার চোখের সামনে ঝলক দিয়ে উঠল কিছু দৃশ্য—
একটা পুরনো রাস্তা…
একটা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছেলে…
আর তার পাশে—একটা মেয়ে, ঠিক নীলাঞ্জনার মতো…
সে মাথা চেপে ধরল।
“কি হলো?”—নীলাঞ্জনা উদ্বিগ্ন।
“আমি… কিছু দেখতে পাচ্ছি…”—রায়হান কাঁপা গলায় বলল।
“কি দেখছো?”
“আমরা… আমরা একসাথে ছিলাম… আগে…”
নীলাঞ্জনার চোখ বড় হয়ে গেল।
“তুমি… মনে করতে পারছো?”
রায়হান হাঁপাতে লাগল।
“আমি… নিশ্চিত নই… কিন্তু মনে হচ্ছে… আমি… সেই মানুষটা…”
কথাটা শেষ করতে পারল না সে।
চারদিকে হঠাৎ ঝড়ের মতো বাতাস বইতে শুরু করল।
নীলাঞ্জনার মুখে এক অদ্ভুত আলো ফুটে উঠল।
“তাহলে… তুমি-ই…”
ঠিক তখনই দূরে কোথাও থেকে কুদ্দুসের কণ্ঠ ভেসে এল—
“সব প্রেম এক জন্মে শেষ হয় না…”
রায়হান আর নীলাঞ্জনা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তাদের মাঝখানে সময়, মৃত্যু, আর অজানা জন্মের এক গভীর রহস্য দাঁড়িয়ে আছে।
আর সেই রহস্যের দরজা যেন ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে…
চলবে…