ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০২:৪২:৪৩ PM

উপন্যাস: “অনুভূতি”

মান্নান মারুফ
31-03-2026 01:22:55 PM
উপন্যাস: “অনুভূতি”

পর্ব – ৩

মনে রাখিস, কুদ্দুসের এক ফোঁটা চোখের পানি—
তোমার এক যুগের কান্নার সমান, নিপা।

তুমি হয়তো আড়ালে চলে গেছো।
তুমি ভাবছো—আমি তোমাকে আর দেখি না।

ঠিক না।

চোখের দেখা না পেলেও, মনের দেখা তোমাকে সারাক্ষণই দেখি।

নিপার বিয়ের পর প্রথম কয়েকটা দিন আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ছিল।

দিনগুলো যেন পার হতে চাইত না।

ঘড়ির কাঁটা চলত, কিন্তু সময় যেন থেমে থাকত।

আমি আগের মতোই কলেজে যাই, ক্লাস করি, বন্ধুদের সঙ্গে বসি—কিন্তু সবকিছু যেন কোনো অর্থ বহন করে না।

চারপাশে এত মানুষ, এত শব্দ—তবুও আমি একা।

ভীষণ একা।

বন্ধুরা বুঝতে পারছিল—আমার মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে।

রাকিব একদিন জিজ্ঞেস করল,
— “তুই ঠিক আছিস তো?”

আমি হেসে বললাম,
— “হ্যাঁ, কেন?”

— “আগের মতো নেই তুই,” সে বলল।

আমি কিছু বললাম না।

কারণ আমি জানি—এই পরিবর্তনটা কথায় বোঝানো যায় না।

নিপার সঙ্গে এখন আর দেখা হয় না।

ও অন্য শহরে চলে গেছে—তার নতুন সংসার, নতুন জীবন।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ও যত দূরে যাচ্ছে, আমার ভেতরে ও তত গভীরে ঢুকে যাচ্ছে।

আমি ওকে ভুলতে চাই।

অনেক চেষ্টা করি।

পুরনো মেসেজগুলো ডিলিট করেছি, ওর দেওয়া ছোট ছোট জিনিসগুলো লুকিয়ে রেখেছি।

ভাবলাম—এতে হয়তো একটু হালকা লাগবে।

কিন্তু না।

স্মৃতি কি এত সহজে মুছে ফেলা যায়?

রাতে ঘুম আসে না।

আমি বিছানায় শুয়ে থাকি, আর অন্ধকারের ভেতরে তোমার মুখ খুঁজি, নিপা।

তোমার সেই মৃদু হাসি, সেই শান্ত চোখ—সবকিছু যেন আমার সামনে ভেসে ওঠে।

আমি হাত বাড়াই, ছুঁতে চাই।

কিন্তু কিছুই পাই না।

শুধু শূন্যতা।

একদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল।

জানালার বাইরে আলো ফুটছে।

পাখিরা ডাকছে।

একটা নতুন দিনের শুরু।

কিন্তু আমার কাছে সবকিছু মনে হয় একই রকম।

নতুন কিছু নেই।

আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকালাম।

চোখের নিচে কালি, মুখে ক্লান্তি।

আমি নিজেকে চিনতে পারলাম না।

এটা কি সেই মানুষ, যে একসময় হাসত, স্বপ্ন দেখত?

আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম—আমি শুধু নিপাকে হারাইনি, আমি নিজেকেও হারিয়েছি।

আমার ভেতরের যে মানুষটা বেঁচে ছিল, সে এখন কোথাও নেই।

তার জায়গায় একটা শূন্য খোলস দাঁড়িয়ে আছে।

একদিন বিকেলে হঠাৎ করে বৃষ্টি শুরু হলো।

আমি ছাদে উঠে গেলাম।

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আমার গায়ে পড়ছিল।

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

মনে হলো—এই বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা যেন আমার ভেতরের কান্না।

আমি অনেকদিন কাঁদিনি।

হয়তো কাঁদতে ভুলে গেছি।

কিন্তু সেদিন… সেদিন হঠাৎ করে চোখ দিয়ে পানি বের হতে শুরু করল।

আমি থামাতে পারলাম না।

নিপা, তুমি জানো?

আমি এখনো তোমার সঙ্গে কথা বলি।

হয়তো তুমি শুনতে পাও না।

কিন্তু আমি বলি।

নিজের মনে মনে।

তোমাকে বলি—
আজ কী করেছি, কোথায় গিয়েছি, কেমন আছি।

তুমি উত্তর দাও না।

কিন্তু আমি কল্পনা করি—তুমি শুনছো।

একদিন হঠাৎ করে তোমার একটা পুরনো ছবি খুঁজে পেলাম।

ফোনের একটা ফোল্ডারে লুকিয়ে ছিল।

আমি অনেকক্ষণ ধরে ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

তোমার সেই হাসি…

এই হাসিটাই তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল।

আমি আঙুল দিয়ে ছবিটা ছুঁয়ে বললাম—
“তুমি ভালো আছো তো?”

কোনো উত্তর এল না।

শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি—
তুমি কি কখনো আমাকে মনে করো?

তোমার নতুন জীবনের ভিড়ে, নতুন মানুষের মাঝে—
আমাকে কি একবারও তোমার মনে পড়ে?

নাকি আমি শুধু একটা অতীত?

একটা স্মৃতি, যাকে ভুলে যাওয়াই সহজ?

একদিন রাতে হঠাৎ করে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো।

মনে হলো—তুমি খুব কাছে আছো।

আমি জানালার পাশে দাঁড়ালাম।

চারপাশে নীরবতা।

কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল—তুমি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছো।

আমি চোখ বন্ধ করে বললাম—
“নিপা…”

কোনো শব্দ নেই।

তবুও মনে হলো—তুমি শুনেছো।

আমি জানি, এটা বাস্তব না।

এটা আমার মনের কল্পনা।

কিন্তু এই কল্পনাটুকুই এখন আমার বেঁচে থাকার কারণ।

নিপা, তুমি হয়তো ভাবছো—আমি তোমাকে ভুলে গেছি।

কিন্তু সত্যি হলো—

আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি।

ভুলতে চাইনি।

তুমি আড়ালে চলে গেছো, ঠিকই।

কিন্তু তুমি আমার ভেতর থেকে কখনেই যাওনি।

আমি চোখে তোমাকে দেখি না—
কিন্তু মনে দেখি।

প্রতিদিন।

প্রতিটা মুহূর্তে।

তুমি জানো, কুদ্দুসের এক ফোঁটা চোখের পানি—
তোমার এক যুগের কান্নার সমান কেন?

কারণ এই একটা ফোঁটার ভেতরে লুকিয়ে আছে—
অগণিত না বলা কথা,
অসংখ্য অপূর্ণ স্বপ্ন,
আর এক সমুদ্র ব্যথা।

আমি হয়তো বাইরে থেকে শক্ত আছি।

মানুষ ভাবে—আমি ঠিক হয়ে গেছি।

কিন্তু কেউ জানে না—
ভেতরে আমি কতটা ভেঙে পড়েছি।

একদিন কি আমি আবার আগের মতো হতে পারব?

আবার কি হাসতে পারব, সত্যিকারের?

আবার কি কাউকে ভালোবাসতে পারব?

আমি জানি না।

শুধু জানি—
তুমি আমার জীবনের এমন একটা অংশ,
যাকে আমি চাইলেও মুছে ফেলতে পারব না।

নিপা, তুমি যেখানে থাকো—ভালো থেকো।

তোমার সুখটাই আমার শেষ চাওয়া।

যদিও সেই সুখের মধ্যে আমার কোনো জায়গা নেই।

আর আমি?

আমি এখনো হাঁটছি—
একটা অনুভূতির ভেতরে আটকে।

যেখানে ভালোবাসা আছে,
কিন্তু তার কোনো গন্তব্য নেই।

তুমি আমার চোখের আড়াল হয়েছো—
কিন্তু মনের আড়াল কখনো হওনি।

আর হয়তো কোনোদিন হবে না।

এই একতরফা ভালোবাসাই এখন আমার পরিচয়।

আমার অস্তিত্ব।

আমার “অনুভূতি”।

(চলবে…)