ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:০৭:৫৫ PM

উপন্যাস: গুডবয়

মান্নান মারুফ
26-03-2026 02:45:10 PM
উপন্যাস: গুডবয়


পর্ব–৬

একদিন সময় চাইলো কুদ্দুছ।

সবকিছু যেন খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল—ভালোবাসা, দ্বন্দ্ব, সিদ্ধান্ত, আর সেই সিদ্ধান্তের ভার। সে বুঝতে পারছিল, এভাবে তাড়াহুড়ো করে কোনো পথ বেছে নেওয়া ঠিক হবে না। শুধু নিজের জন্য না—রিচির জন্যও, তার পরিবারর জন্যও।

সেদিন বিকেলে কুদ্দুছ রিচিকে নিয়ে গেল সেই পরিচিত চায়ের দোকানে। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে অদ্ভুত এক চাপা নীরবতা।

রিচি চুপচাপ বসে ছিল।

“আমি একটু সময় চাই,”—কুদ্দুছ ধীরে বলল।

রিচি তাকাল। তার চোখে ক্লান্তি, ভয়, আর কোথাও যেন একটুখানি আশার আলো।

“সময়?”—সে ধীরে বলল, “কিসের জন্য?”

“সবকিছু ঠিকভাবে বোঝার জন্য… নিজেকে বোঝার জন্য… আর আপনাকে ঠিকভাবে নিজের জীবনে আনার জন্য।”

রিচি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“আপনি কি পিছিয়ে যাচ্ছেন?”—তার কণ্ঠে ছিল চাপা আতঙ্ক।

“না,”—কুদ্দুছ দ্রুত বলল, “আমি কখনও পিছিয়ে যাব না। কিন্তু আমি চাই না—আমাদের সিদ্ধান্তটা হঠাৎ আবেগের কারণে হোক। আমি চাই এটা হোক দৃঢ়, স্থায়ী।”

তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক স্থিরতা।

সেদিন কুদ্দুছ অনেকক্ষণ ধরে রিচিকে বুঝালো।

“ভয় পাবেন না,”—সে বলল, “সব ঠিক হয়ে যাবে।”

রিচি হালকা হেসে বলল, “সব ঠিক হয় না কুদ্দুছ… কিছু কিছু জিনিস শুধু মেনে নিতে হয়।”

কুদ্দুছ মাথা নাড়ল, “আমি মেনে নিতে আসিনি… আমি বদলাতে এসেছি।”

এই কথাটা শুনে রিচি চুপ করে গেল।

সে জানে—এই ছেলেটা সহজে হার মানার নয়।

কিন্তু বাস্তবতা কি এত সহজে বদলায়?

সেই প্রশ্নটা তার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল।


ওদিকে কুদ্দুছের ভেতরের লড়াইটা দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছিল।

একদিকে তার মা-বাবা—যারা তাকে বড় করেছে, তার প্রতিটা কষ্টে পাশে ছিল। তাদের চোখের জল, তাদের অভিমান—সবকিছু তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল।

অন্যদিকে রিচি—একটা আহত হৃদয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আবার নতুন করে বিশ্বাস করতে শিখছে।

কুদ্দুছ জানে—সে যদি এখন পিছিয়ে যায়, তাহলে শুধু একটা সম্পর্ক ভাঙবে না, একটা মানুষের ভেতরের শেষ ভরসাটুকুও ভেঙে যাবে।

রাতে ঘুমাতে পারে না সে।

মাঝরাতে উঠে বসে থাকে। কখনো মায়ের মুখ ভেসে ওঠে, কখনো রিচির কান্না।

সে নিজেকে প্রশ্ন করে—
“আমি কি একজন খারাপ ছেলে হয়ে যাচ্ছি?”

তারপর আবার আরেকটা উত্তর আসে—
“না… তুমি শুধু একজন মানুষ হয়ে উঠছো।”


একদিন সাহস করে আবার কথা বলতে বসল বাবা-মায়ের সাথে।

ঘরে ভারী নীরবতা।

মা মুখ ফিরিয়ে বসে আছেন। বাবা গম্ভীর।

কুদ্দুছ ধীরে বলল,
“আমি আবার কথা বলতে চাই।”

বাবা ঠান্ডা গলায় বললেন, “বল।”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—

“তোমরা একটা মেয়ের ডিভোর্স হওয়াকে পণ্য ভাবছো। কিন্তু সে একজন মানুষ… যার জীবনে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে।”

মা কেঁপে উঠলেন।

“তোমরা যাকে সম্মান দিতে পারো না,”—কুদ্দুছ বলল, “আমি তাকেই আমার স্ত্রী হিসেবে সম্মান দিতে চাই।”

এই কথাটা ঘরের ভেতর গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হলো।

বাবার চোখে রাগের আগুন জ্বলে উঠল।

“তুই আমাদের শিক্ষা দিবি?”—তিনি বললেন।

“না,”—কুদ্দুছ শান্তভাবে বলল, “আমি শুধু আমার অনুভূতির কথা বলছি।”

মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“তুই কি আমাদের ছেড়ে চলে যাবি?”

এই প্রশ্নটা কুদ্দুছের বুক ভেঙে দিল।

সে চুপ করে গেল।

এই একটা জায়গায় এসে সে দুর্বল হয়ে পড়ে।

কারণ সে জানে—এই মানুষগুলো ছাড়া তার জীবন কল্পনা করা সহজ না।

কিন্তু সে এটাও জানে—রিচিকে ছেড়ে দিলে সে নিজের কাছেই হেরে যাবে।

“আমি কাউকে ছাড়তে চাই না,”—সে ধীরে বলল, “আমি শুধু চাই তোমরা বুঝো।”

“আমরা বুঝব না,”—বাবা দৃঢ় গলায় বললেন, “এই সম্পর্ক আমরা মেনে নেব না।”

নীরবতা।

এই ‘না’-এর ভেতরে ছিল দেয়াল, দূরত্ব, আর এক অদ্ভুত কঠোরতা।

কুদ্দুছ বুঝল—এই লড়াই সহজে জেতা যাবে না।

তবুও সে উঠে দাঁড়াল।

তার চোখে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু হার মানার ছাপ ছিল না।


পরদিন রিচির সাথে দেখা।

রিচি তাকিয়েই বুঝল—কিছু একটা হয়নি।

“কথা বলেছেন?”—সে জিজ্ঞেস করল।

কুদ্দুছ মাথা নাড়ল।

“কি বললেন?”

কুদ্দুছ একটু হেসে বলল, “যেটা ভাবছিলাম… সেটাই।”

রিচি চোখ নামিয়ে ফেলল।

“আমি বলেছিলাম…”—তার কণ্ঠে ছিল হালকা কষ্ট।

“হ্যাঁ, আপনি ঠিক ছিলেন,”—কুদ্দুছ বলল, “কিন্তু তবুও… আমি থামছি না।”

রিচি তাকাল।

“কেন?”—সে ধীরে বলল।

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—

“কারণ… আমি যদি এখন থামি, তাহলে আমি সারাজীবন আফসোস করব। আর আপনাকে হারালে… আমি নিজেকেই হারাবো।”

এই কথাটা শুনে রিচির চোখ ভিজে উঠল।

“কিন্তু আপনার পরিবার?”—সে বলল।

“আমি চেষ্টা করব,”—কুদ্দুছ বলল, “শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করব।”

“আর যদি না মানে?”

কুদ্দুছ থামল।

তারপর ধীরে বলল—
“তাহলে… আমি আমার পথ বেছে নেব।”

এই কথাটার ভেতরে ছিল ত্যাগ, সাহস, আর এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা।

রিচির বুক কেঁপে উঠল।

সে বুঝতে পারছিল—এই ছেলেটা সত্যিই তাকে ভালোবাসে।

কিন্তু এই ভালোবাসার মূল্য অনেক বড়।

“আমি ভয় পাচ্ছি,”—রিচি বলল।

কুদ্দুছ তার দিকে তাকিয়ে বলল—
“আমি আছি।”

এই তিনটা শব্দ যেন সব ভয়কে কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দিল।


সন্ধ্যা নামছে। আকাশে মেঘ জমেছে।

দুজন পাশাপাশি হাঁটছে—কিন্তু তাদের পথ এখনো নির্ধারিত না।

ভালোবাসা তাদের একসাথে এনেছে,
কিন্তু বাস্তবতা এখনো তাদের পরীক্ষা নিচ্ছে।

এই পথের শেষে কি আছে—
মিলন?
নাকি বিচ্ছেদ?

কেউ জানে না।

তবে একটা জিনিস নিশ্চিত—
এই ভালোবাসা আর আগের মতো সরল নেই।
এটা এখন পরিণত, গভীর… আর লড়াইয়ে প্রস্তুত।

কুদ্দুছ এখন আর শুধু ‘গুড বয়’ না—
সে একজন মানুষ, যে ভালোবাসার জন্য দাঁড়াতে শিখেছে।

আর রিচি?
সে ধীরে ধীরে শিখছে—
সব ভালোবাসা ভাঙার জন্য আসে না…
কিছু ভালোবাসা লড়াই করে বাঁচার জন্য আসে।

চলবে…