পর্ব–৪
বেশ কয়েকমাস ধরে রিচি আর কুদ্দুছ প্রায়ই কফির আড্ডায় বসতো। ছোট্ট সেই চায়ের দোকান, ভেজা বিকেল, ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ—সবকিছু মিলিয়ে যেন তাদের দুজনের জন্য আলাদা একটা পৃথিবী তৈরি হয়েছিল। অফিসের ব্যস্ততা, মানুষের কটূ কথা, জীবনের ক্লান্তি—সব যেন ওই কয়েকটা মুহূর্তের জন্য হারিয়ে যেত।
নানা ধরনের কথা হতো তাদের মধ্যে—বই, সিনেমা, শৈশবের স্মৃতি, জীবনের ব্যর্থতা, আবার ছোট ছোট আনন্দের গল্প। কখনো হাসি, কখনো নীরবতা—সব মিলিয়ে একটা গভীর বোঝাপড়া তৈরি হচ্ছিল।
এভাবেই অজান্তে, অপ্রকাশ্যভাবে, তাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠছিল।
কুদ্দুছ মাঝে মাঝে নিজের ভেতরে প্রশ্ন করত—
“এটা কি শুধু ভালো লাগা?”
না কি তার থেকেও বেশি কিছু?
তার ভেতরে একটা দ্বন্দ্ব চলত সবসময়—
“প্রেমে পড়েছো, আবার সম্মানও চাও?”
“ভালোবেসেছো, আবার মর্যাদাও চাও?”
সে জানত—ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, এটা দায়িত্বও। আর সেই দায়িত্ব নিতে গেলে শুধু নিজের না, চারপাশের সবকিছুর মুখোমুখি হতে হয়।
তবুও…
একটা সময় আসে, যখন মন আর যুক্তির কথা শোনে না।
সেদিন বিকেলটা অন্যরকম ছিল।
আকাশে মেঘ ছিল, কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছিল না। বাতাসে একটা চাপা উত্তেজনা, যেন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
চায়ের দোকানের কোণে বসে ছিল তারা।
রিচি কিছু একটা বলছিল, কিন্তু কুদ্দুছ শুনছিল না। তার মন অন্য কোথাও।
হঠাৎ সে বলেই ফেলল—
“রিচি… আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।”
রিচি থেমে গেল। তার চোখে কৌতূহল, আবার কোথাও যেন অজানা ভয়।
“বলুন…”
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে বলল—
“আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।”
কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল।
সময় যেন থেমে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য।
রিচির মুখের রং বদলে গেল। চোখ বড় হয়ে উঠল, ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
“কুদ্দুছ ভাই… আপনি পাগল হয়েছেন?”—তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
কুদ্দুছ চুপ।
রিচি হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল।
“আবেগ দিয়ে সব হয় না! আপনার সমাজ আছে, পরিবার আছে—তারা শুনলে আপনাকে কি ভাববে? এমন কথা আর মুখে আনবেন না… প্লিজ!”
চারপাশে কয়েকজন তাকিয়ে ছিল। রিচি তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল।
“এটা অফিসের পাশের জায়গা… কেউ শুনলে কত কথা বলবে!”
কুদ্দুছ ধীরে বলল, “আমি কাউকে ভয় পাই না।”
“আমি পাই!”—রিচি থামিয়ে দিল, “আপনি বুঝতে পারছেন না…”
তার চোখে পানি জমে উঠেছে।
“আমি একটা ডিভোর্সি মেয়ে… সমাজের চোখে আমি অন্যের ব্যবহৃত একটা জিনিস। আপনার মতো একটা অবিবাহিত ছেলের সাথে আমাকে আপনার পরিবার কোনোদিন মেনে নেবে না।”
কুদ্দুছের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“আমার আর কষ্ট সহ্য করার মতো ক্ষমতা নেই,”—রিচি বলল, “আমি আবার ভাঙতে চাই না।”
নীরবতা।
কুদ্দুছ যেন হঠাৎ করে বাস্তবতার মাটিতে পড়ে গেল।
সে এতদিন শুধু অনুভব করেছে—কিন্তু আজ বুঝল, এই ভালোবাসার পথটা কত কঠিন।
তবুও সে মাথা তুলে তাকাল।
তার চোখে ছিল দৃঢ়তা।
“আমি তো সমাজকে বিয়ে করতে চাইনি,”—সে ধীরে বলল, “আমি আপনাকে বলছি।”
রিচি থেমে গেল।
“সমাজ কি আমাকে কিছু দিয়েছে?”—কুদ্দুছ বলল, “আমার কষ্টে কি সমাজ পাশে ছিল? আমি যখন লড়াই করেছি, তখন কি সমাজ এসে সাহায্য করেছে?”
তার কণ্ঠে ছিল চাপা ক্ষোভ।
“তাহলে আজ কেন আমি সমাজের কথা ভাবব?”
রিচি কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
কুদ্দুছ আরও কাছে ঝুঁকে বলল—
“আমি জানি, আপনার অতীত আছে। কষ্ট আছে। কিন্তু সেই জন্য কি আপনি ভালোবাসা পাবেন না?”
রিচির চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
“আমি আপনাকে সম্মান করি,”—কুদ্দুছ বলল, “আপনার সাহসকে ভালোবাসি। আপনার লড়াইকে ভালোবাসি। আর… আপনাকেও ভালোবাসি।”
এই প্রথম সে সরাসরি বলল।
শব্দগুলো ভারী ছিল, কিন্তু সত্যি ছিল।
রিচি মাথা নিচু করে ফেলল।
তার ভেতরে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
একদিকে তার ভয়—সমাজ, অপমান, আবার ভেঙে যাওয়ার আতঙ্ক।
অন্যদিকে কুদ্দুছ—যে তাকে কখনও বিচার করেনি, শুধু বুঝতে চেয়েছে।
“আপনি বুঝতে পারছেন না…”—রিচি ধীরে বলল, “ভালোবাসা শুধু দুজন মানুষের না… এর সাথে অনেক কিছু জড়িত।”
“আমি সব মেনে নেব,”—কুদ্দুছ বলল।
“আপনার পরিবার?”
“আমি বুঝিয়ে নেব।”
“যদি না মানে?”
“তবুও…”
কুদ্দুছ থেমে গেল।
এই ‘তবুও’-র ভেতরে অনেক অনিশ্চয়তা, অনেক অজানা পথ।
রিচি মাথা নাড়ল।
“না… এটা এত সহজ না। আপনি আজ যা বলছেন, কাল হয়তো বদলে যাবে। কিন্তু আমি… আমি আর পারব না।”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল।
“আমি আপনাকে হারাতে চাই না,”—সে বলল, “আপনি আমার জীবনে যেভাবে আছেন, সেভাবেই থাকুন। এর বেশি কিছু চাই না।”
এই কথাটা কুদ্দুছের জন্য ছিল সবচেয়ে কঠিন।
কারণ সে জানে—এই ‘এভাবেই থাকা’ মানে নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করা।
তবুও সে কিছু বলল না।
শুধু তাকিয়ে রইল।
সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল। তাদের দুজনের মাঝখানে এক অদ্ভুত দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল—যা আগে কখনও ছিল না।
সেদিন তারা একসাথে বাড়ি ফেরেনি।
রিচি আগে উঠে চলে গেল।
কুদ্দুছ অনেকক্ষণ বসে রইল।
তার মনে হচ্ছিল—সে হেরে গেছে। কিন্তু কার কাছে? সমাজের কাছে? না কি রিচির ভয়-এর কাছে?
তবুও তার ভেতরে একটা জেদ কাজ করছিল।
সে জানে—এটা শেষ না।
ভালোবাসা এত সহজে থেমে যায় না।
রাতের আকাশে তখন মেঘ জমেছে। কিন্তু বৃষ্টি নামেনি।
যেমন কুদ্দুছের চোখে জল ছিল—কিন্তু গড়িয়ে পড়েনি।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
নিজেকে বলল—
“আমি হাল ছাড়ব না।”
কারণ সে জানে—
সত্যিকারের ভালোবাসা শুধু পাওয়া না, লড়াই করাও।
আর সেই লড়াইটা এখনই শুরু হলো।
চলবে…