ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০২:২৪:০৬ PM

উপন্যাস: একাকী মনে

মান্নান মারুফ
24-03-2026 12:44:59 PM
উপন্যাস: একাকী মনে

পর্ব – ২
শত জন্মের সম্পর্ক লুকিয়ে আছে তোমার চোখের আলো,
তোমার সাথে কথাগুলো, অজানা এক মায়ার জাল,
প্রতিটি শব্দে খুঁজে পাই, অদ্ভুত এক ভালোবাসার রঙিন খেয়াল।

নেহা চলে যাওয়ার পর দিনগুলো আর আগের মতো ছিল না।
সময় যেন ঠিকই এগোচ্ছিল, কিন্তু আরিয়ানের জীবন কোথাও গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল।

সেই চিঠিটা—ছোট্ট কয়েকটা লাইন—তার কাছে যেন এক রহস্যময় দরজা হয়ে উঠেছিল।
“আমি যাচ্ছি, কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ না…”
এই কথাগুলো তাকে প্রতিদিন নতুন করে ভাবাতো।

কোথায় গেল নেহা?
কেন গেল?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সে কি আবার ফিরে আসবে?

সকালের রোদটা জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছিল।
আরিয়ান বিছানার পাশে বসে ছিল, হাতে সেই কাগজটা।
অনেকবার পড়েছে, তবুও মনে হচ্ছিল কিছু একটা এখনো অজানা রয়ে গেছে।

হঠাৎ তার চোখ পড়ল কাগজের নিচের দিকে।
একটা খুব ছোট্ট চিহ্ন—যেন একটা ঠিকানা বা কোনো সংকেত।

সে চোখ কুঁচকে দেখল—
একটা নাম লেখা—
“নীলতারা”

আরিয়ান ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল—
“নীলতারা… এটা কি কোনো জায়গা?”

তার ভেতরে হঠাৎ করে এক নতুন কৌতূহল জন্ম নিল।
নেহা এমনিতেই কিছু করে না—এটা সে বুঝে গিয়েছিল।
এই নামটার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো অর্থ আছে।

সেদিনই সে বেরিয়ে পড়ল।

শহরের ভিড়, গাড়ির শব্দ, মানুষের কোলাহল—সবকিছুর মাঝেও তার মাথায় শুধু একটা শব্দ ঘুরছিল—
“নীলতারা…”

সে অনেক জায়গায় খোঁজ করল—কেউ ঠিক করে কিছু বলতে পারল না।
কেউ বলল এটা হয়তো কোনো ক্যাফের নাম,
কেউ বলল কোনো পুরোনো লাইব্রেরি,
আবার কেউ বলল—“শুনিনি কখনো।”

দিনের শেষে ক্লান্ত হয়ে যখন সে প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছিল, তখন এক বৃদ্ধ তাকে বললেন—
“নীলতারা? ওটা কি নদীর ধারের সেই পুরোনো বাড়িটার নাম না?”

আরিয়ানের চোখে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল—
“কোথায়?”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে একটা পথ দেখিয়ে দিলেন।

সন্ধ্যার আলো তখন নরম হয়ে এসেছে।
আরিয়ান পৌঁছাল নদীর ধারে।

জায়গাটা ছিল অদ্ভুত শান্ত।
নদীর পানি ধীরে ধীরে বইছে, বাতাসে একটা শীতল স্পর্শ, আর দূরে একটা পুরোনো বাড়ি—দেয়ালে নীল রঙের ছাপ।

বাড়িটার সামনে একটা ছোট্ট সাইনবোর্ড—
“নীলতারা”

তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

এটাই কি সেই জায়গা?

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

দরজাটা আধখোলা ছিল।

ভেতরে ঢুকতেই একটা অন্যরকম অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরল—
দেয়ালে পুরোনো ছবি, কিছু বই, আর একটা পিয়ানো।

ঠিক তখনই—

“আপনি এসেছেন।”

চেনা কণ্ঠ।

আরিয়ান ঘুরে দাঁড়াল।

নেহা।

আজ নেহাকে অন্যরকম লাগছিল।
চোখে সেই একই গভীরতা, কিন্তু তার ভেতরে যেন আরও অনেক অজানা গল্প জমে আছে।

“তুমি… এখানে?”—আরিয়ানের গলায় কাঁপন।

নেহা হালকা হাসল—
“জানতাম, তুমি আসবে।”

“কিন্তু তুমি না বলে চলে গেলে কেন?”

নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“সব কথা একসাথে বলা যায় না, আরিয়ান।”

“তাহলে এখন বলো।”

নেহা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
নদীর দিকে তাকিয়ে বলল—
“এই জায়গাটা… আমার সবচেয়ে প্রিয়। যখনই আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি, এখানে চলে আসি।”

“তাহলে আমাকে কেন এখানে আনলে?”

নেহা তার দিকে তাকাল।
চোখে এক অদ্ভুত মায়া।

“কারণ তুমি আমার গল্পের অংশ হয়ে গেছো।”

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার ভেতরে অনেক প্রশ্ন, অনেক অনুভূতি একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছিল।

“তুমি কি আমাকে আগে থেকেই চিনতে?”—সে জিজ্ঞেস করল।

নেহা একটু হাসল—
“হয়তো… এই জন্মে না, কিন্তু অনুভূতিতে।”

“মানে?”

“কখনো কি মনে হয়নি, কিছু মানুষকে প্রথম দেখাতেই খুব চেনা লাগে?”

আরিয়ান উত্তর দিল না।
কারণ সে নিজেও সেই অনুভূতিটা পেয়েছিল।

নেহা ধীরে ধীরে পিয়ানোর কাছে গিয়ে বসল।

তার আঙুলগুলো যখন সুর তুলতে শুরু করল, পুরো ঘরটা যেন অন্য এক জগতে চলে গেল।

সুরের মাঝে একটা অদ্ভুত কষ্ট, আবার সেই কষ্টের মাঝেও এক ধরনের ভালোবাসা।

আরিয়ান চোখ বন্ধ করে শুনছিল।

তার মনে হচ্ছিল—
এই সুর, এই মুহূর্ত—সবকিছু যেন অনেক আগে থেকেও সে অনুভব করেছে।

সুর থামার পর নেহা বলল—
“ভালোবাসা সবসময় সহজ হয় না, আরিয়ান।”

“জানি।”

“কখনো কখনো এটা শুধু অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে নয়।”

“তুমি কি বলতে চাও?”

নেহা ধীরে বলল—
“আমি তোমার জীবনে এসেছি, কিন্তু হয়তো থাকতে পারব না।”

এই কথাটা শুনে আরিয়ানের বুকটা হঠাৎ করে চেপে ধরল।

“কেন?”

নেহা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
চোখে জল চিকচিক করছে।

“কারণ আমার জীবনে এমন কিছু সত্য আছে, যা তোমাকে কষ্ট দেবে।”

“আমি কষ্ট সহ্য করতে পারি।”

“সব কষ্ট না।”

নীরবতা নেমে এল।

বাইরে নদীর শব্দ, ভেতরে দু’জন মানুষের অজানা অনুভূতির ঢেউ।

আরিয়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল—
“তুমি চলে গেলে আমি আবার আগের মতো হয়ে যাবো। একা। তুমি কি সেটা চাও?”

নেহা চোখ নামিয়ে ফেলল।

“আমি চাই না… কিন্তু সবকিছু আমাদের চাওয়ার ওপর নির্ভর করে না।”

“তাহলে অন্তত আমাকে সত্যিটা বলো।”

নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল—
“সময় হলে বলব।”

সেই রাতটা তারা একসাথে কাটাল—কথায়, নীরবতায়, আর অনুভূতিতে।

নেহা তার ছোটবেলার গল্প বলল, তার স্বপ্নের কথা বলল, তার ভয়গুলোর কথা বলল।

আরিয়ান বুঝতে পারছিল—এই মেয়েটা বাইরে থেকে যতটা সহজ, ভেতরে ততটাই জটিল।

কিন্তু এই জটিলতাই তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছিল।

রাতের শেষে, যখন আরিয়ান ফিরে যাওয়ার জন্য উঠল, নেহা তাকে একটা ছোট্ট বাক্স দিল।

“এটা কী?”—সে জিজ্ঞেস করল।

“এখন খুলবে না।”

“কখন?”

“যখন মনে হবে, তুমি আমাকে সত্যিই বুঝতে পেরেছো।”

আরিয়ান বাক্সটা হাতে নিল।

তার মনে হচ্ছিল—এই ছোট্ট জিনিসটার ভেতরে হয়তো অনেক বড় কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে।

বাড়ি ফেরার পথে আকাশে তারা ঝলমল করছিল।

আরিয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল—
“শত জন্মের সম্পর্ক…”

এই কথাটা কি সত্যি?

নাকি এটা শুধু একটা অনুভূতির খেলা?

সে জানত না।

কিন্তু একটা জিনিস সে নিশ্চিতভাবে জানত—
নেহা তার জীবনে এমন এক জায়গা করে নিয়েছে, যেখান থেকে তাকে সরানো সম্ভব না।

কিন্তু সে বুঝতে পারছিল না—
এই ভালোবাসার শেষ কোথায়?

এটা কি একটা সুন্দর শুরু?

নাকি আসন্ন কোনো ভাঙনের পূর্বাভাস?

তার হাতে ধরা ছোট্ট বাক্সটা যেন সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে রইল।

আর নেহা—
সে যেন এক রহস্য,
যাকে যতই জানা যায়, ততই অজানা থেকে যায়।

(চলবে…)