ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:১১:২৬ PM

উপন্যাস: “তোমাকে ভালোবাসি”

মান্নান মারুফ
13-03-2026 03:02:22 PM
উপন্যাস: “তোমাকে ভালোবাসি”

পর্ব–

স্মৃতি মানুষের জীবনে অদ্ভুত এক জিনিস।
কিছু স্মৃতি সময়ের সাথে সাথে মুছে যায়, আবার কিছু স্মৃতি বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও হৃদয়ের গভীরে ঠিক আগের মতোই জেগে থাকে।

কুদ্দুছের জীবনে ঐশির স্মৃতিগুলো ঠিক তেমনই।

অনেক দিন আগে—যখন তারা দুজনই স্কুলে পড়ত—তখন থেকেই তাদের গল্পটা শুরু।

একই গ্রাম, একই রাস্তা, একই স্কুল।

প্রতিদিন সকালে তারা একসাথে স্কুলে যেত।

কখনো হাঁটতে হাঁটতে গল্প করত, কখনো আবার ছোটখাটো ঝগড়াও হয়ে যেত।

সেই ঝগড়াগুলো এখন ভাবলে খুব ছোট মনে হয়।

কিন্তু তখন মনে হতো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ লেগে গেছে।

একদিন সকালে এমনই একটা ঝগড়া হয়েছিল।

স্কুলে যাওয়ার পথে কুদ্দুছ কিছু একটা নিয়ে মজা করছিল।

ঐশি হঠাৎ রেগে গিয়ে বলেছিল—

তুমি না একদম অসভ্য!”

কুদ্দুছও রেগে গিয়ে বলেছিল—

তোমার সাথে আর কথা বলবো না।”

সেদিন তারা পুরো পথ চুপচাপ হেঁটেছিল।

কেউ কারও দিকে তাকায়নি।

কিন্তু স্কুলে পৌঁছানোর পর ক্লাসে বসতেই ঐশি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেছিল।

সেই হাসি দেখে কুদ্দুছও আর রাগ ধরে রাখতে পারেনি।

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাদের বন্ধুত্বকে অদ্ভুতভাবে গভীর করে তুলেছিল।

ঐশি হয়তো সেই সব ঘটনা অনেক আগেই ভুলে গেছে।

কিন্তু কুদ্দুছ আজও ভুলতে পারেনি।

সবকিছু যেন তার হৃদয়ের মধ্যে আটকে আছে।

স্কুলের সেই লাল দালান, মাঠের ধুলো, ক্লাসের বেঞ্চ—সবকিছু।

এসএসসি পরীক্ষার সময়টাও তার খুব মনে পড়ে।

সেই সময়টায় তারা দুজনই অনেক সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিল।

প্রতিদিন একসাথে স্কুলে যাওয়া, পরীক্ষা শেষে একসাথে বাড়ি ফেরা।

কখনো পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা, কখনো ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে গল্প।

ঐশি বলত—

আমি বড় হয়ে অনেক দূর পড়াশোনা করতে চাই।”

কুদ্দুছ হাসত।

তুমি পারবে।”

ঐশির চোখে তখন অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস ঝলমল করত।

এসএসসি পরীক্ষার শেষ দিনটা কুদ্দুছ কখনো ভুলতে পারে না।

পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সবার মুখে তখন অদ্ভুত এক স্বস্তি।

মনে হচ্ছিল যেন একটা বড় যুদ্ধ শেষ হয়েছে।

বন্ধুরা সবাই মিলে ঠিক করল—আজ সিনেমা দেখতে যাবে।

কুদ্দুছও গেল।

ঐশিও ছিল তাদের সাথে।

সেই ছোট্ট শহরের পুরোনো সিনেমা হলটায় তারা একসাথে বসে সিনেমা দেখেছিল।

সিনেমার গল্পটা আজ আর ঠিক মনে নেই কুদ্দুছের।

কিন্তু ঐশির হাসি, তার চোখের উজ্জ্বলতা—সবকিছু যেন এখনো পরিষ্কার মনে আছে।

সিনেমা শেষ হওয়ার পর সবাই বাইরে বের হলো।

গরমের বিকেল।

রাস্তার পাশে একটা আইসক্রিমের দোকান।

ঐশি হঠাৎ সবার জন্য আইসক্রিম কিনল।

তারপর একটা আইসক্রিম নিয়ে কুদ্দুছের দিকে এগিয়ে দিল।

নাও।”

কুদ্দুছ একটু অবাক হয়ে বলেছিল—

আমার জন্য?”

ঐশি হেসে বলেছিল—

হ্যাঁ, তোমার জন্য।”

সেদিন তাদের সাথে অনেক মানুষ ছিল।

বন্ধুরা, পরিচিত লোকজন।

তবুও ঐশি কোনো দ্বিধা না করে কুদ্দুছকে আইসক্রিম দিতে ভুলেনি।

এই ছোট্ট ঘটনাটা কুদ্দুছের হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে গেছে—যেন সেটা একটা অমূল্য স্মৃতি।

আজ এত বছর পরও সেই মুহূর্তটা তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

মাঝে মাঝে সে ভাবে—

ঐশির কাছে হয়তো এটা খুব সাধারণ একটা ঘটনা ছিল।

কিন্তু তার কাছে সেটা ছিল অনেক বড় কিছু।

সময় গড়িয়ে গেছে।

স্কুলের দিনগুলো শেষ হয়েছে।

সবাই নিজের নিজের পথে চলে গেছে।

কেউ কলেজে গেছে, কেউ শহরে পড়তে গেছে।

কুদ্দুছ আর ঐশির মাঝেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

তবুও স্মৃতিগুলো কখনো দূরে যায়নি।

কুদ্দুছ মাঝে মাঝে রাতে একা বসে সেই দিনগুলোর কথা ভাবে।

সেই স্কুলের রাস্তা।

সেই ঝগড়া।

সেই হাসি।

সেই আইসক্রিমের বিকেল।

সবকিছু যেন তার হৃদয়ের ভেতর এখনো জীবন্ত।

একদিন সন্ধ্যায় কুদ্দুছ পুরোনো সেই স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

স্কুলটা এখন অনেক বদলে গেছে।

নতুন বিল্ডিং হয়েছে, মাঠে নতুন গাছ লাগানো হয়েছে।

কিন্তু তার কাছে মনে হলো—সবকিছু আগের মতোই আছে।

সে ধীরে ধীরে মাঠের দিকে তাকাল।

মনে হলো যেন দূরে কোথাও ঐশি দাঁড়িয়ে আছে।

হাসছে।

ডাকছে—

কুদ্দুছ, তাড়াতাড়ি করো!”

কুদ্দুছের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

কিছু স্মৃতি মানুষকে সুখ দেয়।

আবার কিছু স্মৃতি গভীর কষ্টও দেয়।

কারণ সেই মুহূর্তগুলো আর কখনো ফিরে আসে না।

তবুও কুদ্দুছ সেই স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে।

কারণ সেই স্মৃতির মধ্যেই আছে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি।

ভালোবাসা।

যে ভালোবাসা সে কখনো বলতে পারেনি।

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এলো।

কুদ্দুছ আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে আবার সেই কথাটা ভেসে উঠল—

তোমাকে ভালোবাসি ঐশি।

অনেক ভালোবাসি।

হয়তো তুমি ভুলে গেছো সবকিছু।

কিন্তু আমি ভুলিনি।

তোমার সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত এখনো আমার হৃদয়ের মধ্যে জীবন্ত।

আর সেই স্মৃতিগুলোই আমাকে বারবার তোমার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

একটা অসম্পূর্ণ ভালোবাসার গল্প ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠতে থাকে।

চলবে…