ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৪:০৩ PM

গল্প: বাবা

মান্নান মারুফ
21-04-2026 02:56:57 PM
গল্প: বাবা

১৯১৩ সালের ১ জানুয়ারি, শুক্রবার—তুমি চলে গেলে বাবা, কারও কাছে কিছু না বলেই চলে গেলে। সেই দিনটা আজও আমার মনে গেঁথে আছে, যেন সময় হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছিল। সকালের আলোটা ছিল অন্য দিনের মতোই, অথচ সেই দিনের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর বিদায়ের ছায়া। কেউ বুঝতেই পারেনি, এভাবে নিঃশব্দে তুমি বিদায় নেবে। না কোনো শেষ কথা, না কোনো ইশারা—শুধু এক গভীর নীরবতা রেখে তুমি হারিয়ে গেলে, না ফেরার দেশে।

বাবা, তুমি কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছিলে আমাকে। ছোট্ট সেই দিনগুলো আজও বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে। তোমার হাতটা শক্ত করে ধরে বাজারে যেতাম—কী আনন্দ, কী উচ্ছ্বাস! আমার ছোট্ট পা তোমার বড় পায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারত না, তবুও তুমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে। মাঝে মাঝে আমাকে কোলে তুলে নিতে, আর আমি হাসতে হাসতে তোমার কাঁধে মাথা রেখে দুনিয়াটাকে নতুন করে দেখতাম।

তুমি হাসতে, আর বলতে, “কুদ্দুছ, আজ তোকে রসগোল্লা খাওয়াবো।”
সেই রসগোল্লার মিষ্টি স্বাদ যেন এখনও জিভে লেগে আছে। কিন্তু তুমি নেই—তাই আর সেই স্বাদ খুঁজে পাই না কোথাও। কোথায় যে হারিয়ে গেল বাবার সঙ্গে বাজারে যাওয়ার সেই আনন্দ? এখন বাজারে গেলে সবকিছু আগের মতোই থাকে—মানুষ, দোকান, মিষ্টির গন্ধ—কিন্তু তুমি নেই বলে সবকিছুই অর্থহীন লাগে।

মিষ্টিমুড়ি, দই—এই সামান্য জিনিসগুলোই ছিল আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ। কারণ, সেগুলো কিনে দিতে তুমি। তোমার চোখে ছিল মমতা, কণ্ঠে ছিল নিশ্চয়তা—যেন পৃথিবীর কোনো কষ্টই আমাকে ছুঁতে পারবে না। তুমি পাশে থাকলে পৃথিবীটা নিরাপদ মনে হতো।

তুমি আমার ছোট্ট হাত ধরে হাঁটা শিখিয়েছিলে। বারবার পড়ে গেলে আবার তুলে দাঁড় করাতে। বলতে, “পড়লে ভয় পাবি না, আবার উঠে দাঁড়াবি।” তখন বুঝিনি, তুমি শুধু হাঁটা নয়—জীবনের পথ চলাটাও শেখাচ্ছিলে। আজ জীবনের কঠিন পথে হাঁটতে গিয়ে যখন হোঁচট খাই, তখন তোমার সেই কথাগুলো কানে ভেসে আসে।

কিন্তু হঠাৎ করেই তুমি চলে গেলে। কোনো কথা না বলে, কোনো বিদায় না নিয়ে। একদিন সকালেও তুমি ছিলে, আর পরদিন তুমি আর নেই। কীভাবে যে এই শূন্যতা সহ্য করছি—আমি নিজেই জানি না। বাড়ির প্রতিটি কোণে তোমার স্মৃতি, অথচ তুমি নেই।

তোমার বিছানাটা খালি পড়ে থাকে। তোমার ব্যবহৃত কাপড়গুলো আলমারিতে গুছিয়ে রাখা—কিন্তু সেগুলোতে আর তোমার গন্ধ নেই। উঠোনে বসে তুমি যে জায়গায় চা খেতে, সেখানে এখন শুধু নীরবতা। যেন সবকিছু তোমার অপেক্ষায় থমকে আছে।

রাতের বেলা ঘুমাতে গেলে মনে হতো, তুমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছো। বিচার-শালিস করে রাতে ফিরবে, আমি দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলব, আর তুমি আগের মতো হাসিমুখে বলবে, “কুদ্দুছ, আমি এসেছি।” কিন্তু এখন দরজা খুললে শুধু নিঃশব্দ অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পাই না। সেই অন্ধকারই এখন আমার জীবনের প্রতিচ্ছবি।

বাবা, তুমি কি জানো? তোমার চলে যাওয়ার পর আমি আর মিষ্টিমুড়ি খাই না। রসগোল্লা দেখলেই চোখে পানি চলে আসে। মনে হয়, তুমি নেই—তাই এসব খাওয়ার কোনো মানে নেই। তুমি ছিলে বলেই তো সবকিছু এত মধুর ছিল।

তুমি আমার জন্য কত কষ্ট করেছো! নিজের চাওয়া-পাওয়া ভুলে গিয়ে শুধু আমাকে বড় করেছো। কত রাত না খেয়ে কাটিয়েছো, শুধু যেন আমি ভালো থাকি। আমার জন্য নতুন জামা কিনে দিতে গিয়ে নিজের জন্য কিছুই কিনোনি। আমি তখন বুঝিনি, এখন বুঝি—তোমার ভালোবাসা কত গভীর ছিল।

তুমি কেন এত ভালোবেসেছিলে আমাকে, বাবা?
যদি জানতেই যে একদিন চলে যাবে, তবে কেন এত মায়া গেঁথে গেলে আমার হৃদয়ে? এই মায়া নিয়েই তো এখন আমি বেঁচে আছি, আর প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছি।

তুমি রেখে গেছো কিছু ধন-সম্পদ, কিছু স্বপ্ন—কিন্তু তুমি তো নেই। এই সম্পদ দিয়ে আমি কী করবো, যদি তোমার হাতটা আর না পাই? তোমার সেই স্নেহমাখা কণ্ঠ, সেই আশ্বাস—এসবই তো ছিল আমার আসল সম্পদ।

বাবা, তুমি কি এখন আমাকে স্মরণ করো?
তুমি কি কোথাও বসে ভাবো—তোমার কুদ্দুছ কেমন আছে? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, তুমি কি আমার কথা মনে করো? আমার কষ্ট কি তোমার কাছে পৌঁছায়?

আমি মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। ভাবি, তুমি হয়তো কোনো এক তারা হয়ে জ্বলছো। আমি তোমার সাথে কথা বলি—নীরবে, একা একা। বলি, “বাবা, আমি ভালো নেই। তুমি ফিরে আসো।” কিন্তু কোনো উত্তর পাই না।

মানুষ বলে, কেউ একবার এই পৃথিবী থেকে চলে গেলে আর ফিরে আসে না। আমি জানি, সেটাই সত্যি। তবুও মন মানতে চায় না। আমি এখনও অপেক্ষা করি—হয়তো কোনো অলৌকিক কিছু ঘটবে, আর তুমি ফিরে আসবে।

কিয়ামতের সেই মাঠে তোমাকে চিনতে পারবো কিনা জানি না।
তবুও মনে মনে ভাবি—সেই দিন যদি আসে, আমি ভিড়ের মাঝে তোমাকে খুঁজে বের করবো। তোমার হাতটা শক্ত করে ধরবো, আর বলবো—“বাবা, এতদিন কোথায় ছিলে?” আর যেতে দিব না।

তুমি চলে যাওয়ার পর আমি অনেক বদলে গেছি। আগের মতো হাসতে পারি না, সহজে আনন্দ পাই না। মানুষজন ভাবে, আমি শক্ত হয়ে গেছি। কিন্তু তারা জানে না—ভেতরে ভেতরে আমি কতটা ভেঙে পড়েছি।

তোমার অনুপস্থিতি আমাকে প্রতিদিন নতুন করে কষ্ট দেয়। কোনো কিছু ভালো লাগলে মনে হয়—তুমি থাকলে আজ কত খুশি হতে। আবার কোনো কষ্ট এলে মনে হয়—তুমি থাকলে সব সহজ হয়ে যেত।

বাবা, তুমি কি জানো? আমি এখনও তোমার জন্য অপেক্ষা করি। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ। হয়তো তুমি আসবে না, তবুও এই অপেক্ষা আমি ছাড়তে পারি না। কারণ এই অপেক্ষাই আমাকে তোমার কাছাকাছি রাখে।

আমি জানি, তুমি আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।
তবুও আমার মন চায়—একবার, শুধু একবার তুমি ফিরে আসো। আমি তোমাকে দেখতে চাই। তোমার কণ্ঠ শুনতে চাই। তোমার হাতটা ধরতে চাই।

শেষবারের মতো যদি তোমাকে দেখতে পেতাম, তাহলে হয়তো এই কষ্টটা একটু কম হতো। কিন্তু সেই সুযোগটুকুও তুমি দিলে না, বাবা।

তবুও আমি তোমাকে দোষ দিই না। কারণ আমি জানি, তুমি আমাকে খুব ভালোবাসতে। সেই ভালোবাসাই আজ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি—আর সবচেয়ে বড় কষ্ট।

সময় যতই এগিয়ে যায়, তোমার স্মৃতিগুলো ততই গভীর হয়ে ওঠে। আগে যেগুলো ছিল সাধারণ, এখন সেগুলোই অমূল্য। তোমার প্রতিটি কথা, প্রতিটি স্পর্শ—সবকিছু মনে পড়ে।

বাবা, যদি কোথাও থেকে আমার কথা শুনতে পাও, তবে জেনে রেখো—
তোমার কুদ্দুছ এখনও তোমাকে খুঁজে ফেরে। এখনও তোমার জন্য কাঁদে। এখনও তোমাকে ভালোবাসে—অপরিসীমভাবে।

তুমি নেই, কিন্তু তোমার ভালোবাসা রয়ে গেছে।
সেই ভালোবাসাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আর যতদিন বাঁচবো, ততদিন তোমাকে মনে রেখেই বাঁচবো।

বাবা, আর একবার ফিরে আসো…
অন্তত স্বপ্নে হলেও।

সমাপ্ত।।