ঢাকা, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৩:৫৯:৩৪ PM

গল্প:“তেল”

মান্নান মারুফ
19-04-2026 01:58:18 PM
গল্প:“তেল”

ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে তেল না পেয়ে পাম্পের কাছেই বিছানা পেতে ঘুমিয়ে পড়েছেন লোকটি। ষোল ঘন্টারও বেশি সময় ধরে তেলের জন্য পাম্পের লাইনে অপেক্ষা। এর মধ্যে তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধির খবর। এবার হয়ত খাদ্যদ্রব্যেরও দাম বাড়বে। দিস ইজ দ্য লাইফ ইন বাংলাদেশ। আহা, কত সুখ এই দেশটাতে! সারাদিন কত লোকের মুখে শুধু সুখের খবর শুনি। শোনা খবর কি বাস্তবে ফিরবে কখনও?

লোকটার নাম রফিকুল ইসলাম—সবাই তাকে রফিক বলে ডাকে। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা। পেশায় সে একটি ছোট ট্রাকের চালক। নিজের ট্রাক নয়—মালিকের। মাস শেষে বেতন পায়, তার ওপর নির্ভর করে তার সংসার—স্ত্রী হালিমা, দুই মেয়ে আর এক ছেলে।

রফিকের দিন শুরু হয় ভোরের অন্ধকারে। আজও হয়েছিল। কিন্তু আজকের দিনটা অন্য দিনের মতো ছিল না। গতকাল সন্ধ্যায়ই শুনেছিল—তেলের দাম আবার বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে মালিক ফোন করে বলেছিল, “কাল ভোরেই লাইনে দাঁড়াইবা। তেল না পাইলে গাড়ি বন্ধ।”

সেই থেকেই শুরু। ভোর পাঁচটায় পাম্পে এসে দাঁড়িয়েছে রফিক। তখনও লাইনে এক-দেড়শো গাড়ি। সে ভেবেছিল, দুই-তিন ঘন্টার মধ্যেই কাজ শেষ হবে। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধ্যা—লাইন যেন শেষই হচ্ছে না।

তার সামনে দাঁড়ানো ট্রাকের ড্রাইভার আজিজ বলছিল,
—“ভাই, এই দেশে কিছু ঠিক নাই। আমরা সারাদিন কাম করি, শেষে পাই শুধু কষ্ট।”
রফিক মৃদু হেসে বলেছিল,
—“কষ্টই তো জীবন ভাই।”

রোদে পুড়ে, ক্ষুধায় কাতর হয়ে, মাঝে মাঝে চায়ের দোকানে গিয়ে এক কাপ চা খেয়ে আবার লাইনে ফিরে এসেছে। দুপুরে এক প্যাকেট বিস্কুট দিয়ে দিন চালিয়েছে রফিক। পকেটে টাকা কম—তেলের দাম বাড়লে সব হিসাবই এলোমেলো হয়ে যাবে।

বিকেলের দিকে খবর এলো—তেলের দাম সত্যিই বেড়েছে। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে যেন একসাথে বিষাদের ছায়া নেমে এলো। কেউ গালি দিচ্ছে, কেউ চুপ করে আছে। কেউ আবার মোবাইলে কারো সঙ্গে তর্ক করছে—
—“দাম বাড়ছে, কিন্তু আয় তো বাড়ে না!”

রফিক ফোন বের করে হালিমাকে কল দিল।
—“শুনছো?”
—“হ্যাঁ, কই আছো?”
—“এখনো লাইনে। তেল পাই নাই।”
—“বাচ্চারা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
—“কি খাইছে ওরা?”
—“ভাত আর ডাল ছিল, তাই খাইছে। কিন্তু চাল শেষ।”
রফিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর বললো,
—“আজকে তেল পাইলে কাল টাকা দিবো। তারপর চাল আনবো।”

ফোনটা কেটে দিয়ে সে আকাশের দিকে তাকালো। আকাশে তখন সন্ধ্যার লাল আভা। তার মনে হলো—এই আকাশও যেন তাদের কষ্ট দেখে লজ্জা পায়।

রাত বাড়তে থাকলো। লাইনে থাকা অনেকেই গাড়ির ভেতরে ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ কেউ মাটিতে চাদর পেতে শুয়ে আছে। রফিকও শেষে ট্রাকের পাশে একটা পুরোনো চট বিছিয়ে শুয়ে পড়লো।

কিন্তু ঘুম কি আসে?

তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে হাজার চিন্তা।
তেলের দাম বাড়লে মালিক হয়ত ভাড়া বাড়াবে। তখন পণ্য পরিবহন খরচ বাড়বে। বাজারে সব কিছুর দাম বাড়বে। চাল, ডাল, তেল—সবকিছু। তার বাচ্চাদের জন্য একবেলা ভালো খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে যাবে।

সে মনে মনে হিসাব করতে লাগলো—
মাসে আয় ১৮ হাজার টাকা।
ভাড়া, খাবার, স্কুলের খরচ—সব মিলিয়ে খরচ ২০ হাজারের বেশি।
ঘাটতি মেটাতে ধার করতে হয়।
ধার বাড়তে বাড়তে এখন প্রায় ৫০ হাজার।

“এইভাবে আর কত?”—নিজেকেই প্রশ্ন করলো সে।

হঠাৎ পাশ থেকে একটা কাশি শোনা গেল। একজন বৃদ্ধ ড্রাইভার বসে আছে, চোখে ক্লান্তি। তিনি বললেন,
—“বাবা, এই জীবন আর ভালো লাগে না।”
রফিক জিজ্ঞেস করলো,
—“কেন কাকা?”
—“ছেলে ছিল একটা। বিদেশে গেছে। টাকা পাঠায় না। আমি এখনো গাড়ি চালাই। এই বয়সে লাইনে দাঁড়াই।”

রফিক কিছু বললো না। শুধু মাথা নিচু করে বসে রইলো।

রাত দুইটার দিকে পাম্পে হঠাৎ নড়াচড়া শুরু হলো। লোকজন দৌড়াদৌড়ি করছে। কেউ বলছে তেল এসেছে, কেউ বলছে শেষ। এই অনিশ্চয়তাই যেন সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা।

রফিক উঠে দাঁড়ালো। তার চোখ লাল, শরীর ক্লান্ত। তবুও আশা—আজ হয়ত তেল পাবে।

কিন্তু যখন তার সামনে মাত্র তিনটা গাড়ি বাকি, তখনই ঘোষণা এলো—
“তেল শেষ!”

এক মুহূর্তে যেন সবকিছু থেমে গেল। কেউ চিৎকার করছে, কেউ রাগে গাড়ি থেকে নেমে যাচ্ছে। কেউ আবার নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে।

রফিকের ভেতরে যেন কিছু ভেঙে গেল। এতক্ষণ অপেক্ষা, এত কষ্ট—সব বৃথা।

সে ধীরে ধীরে ট্রাকের পাশে গিয়ে বসে পড়লো। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে তা মুছলো না।

তার মনে পড়লো—তার ছোট মেয়ে সুমি গতকাল বলেছিল,
—“বাবা, তুমি কাল আইসা আমারে চকলেট কিনে দিবা?”

সে কথা রাখতে পারলো না।

ভোর হয়ে এলো। আকাশে আলো ফুটলো। কিন্তু রফিকের জীবনে যেন কোনো আলো নেই।

সে আবার লাইনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল। কারণ তার আর কোনো পথ নেই।

এই দেশ তাকে শিখিয়েছে—কষ্টকে মেনে নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।

চারপাশে মানুষের ভিড় বাড়ছে। সবাই একই গল্পের চরিত্র। কেউ শ্রমিক, কেউ ড্রাইভার, কেউ ছোট ব্যবসায়ী। তাদের সবার চোখে একই প্রশ্ন—
“এই জীবন কি বদলাবে কখনও?”

কেউ উত্তর জানে না।

দূরে কোথাও মাইকে বাজছে—
“দেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে…”

রফিক মৃদু হেসে ফেললো। সেই হাসির মধ্যে ছিল তীব্র বিদ্রূপ, অসহায়তা আর ক্লান্তি।

সে আবার লাইনে দাঁড়ালো।
কারণ—
এই লাইনই তার জীবন।
এই অপেক্ষাই তার বাস্তবতা।
এই কষ্টই তার প্রতিদিনের গল্প।

আর সেই গল্পের নামই—
“তেল”।