ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০১:০৫:৫৪ AM

”অজ পাড়াগাঁ"

মান্নান মারুফ
15-04-2026 08:38:06 PM
”অজ পাড়াগাঁ"
 

দ্বিতীয় পর্ব

দু:খ যদি বিক্রি হইতো আমি হইতাম ধনী…
আমার কাছে আছে শুধু দু:খেরই খনি…
ভাই, দু:খেরই খনি… এই গান রাশেদ এখন চুপে চুপে বলে।

কারন রাশেদ এখন আর এই কথাগুলো জোরে বলে না। তার কণ্ঠ যেন হারিয়ে গেছে। শব্দগুলো এখন শুধু তার বুকের ভেতর ঘুরপাক খায়—নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গভাবে।

রিমি হারিয়ে যাওয়ার পর তার জীবনটা যেন এক ভয়ংকর শূন্যতায় আটকে যায়। আগে তার কষ্ট ছিল, কিন্তু সেই কষ্টের মাঝেও একটা উদ্দেশ্য ছিল—মা আর রিমি। এখন সেই উদ্দেশ্যটুকুও নেই।

তার ঘরটা এখন নিঃশব্দ। আগে যেখানে রিমির হাসির শব্দ ভেসে আসত, সেখানে এখন শুধু নীরবতা।

একদিন রাতে সে রিমির খাটের পাশে বসে ছিল। খাটটা খালি। কিন্তু তার চোখে যেন রিমিকে দেখতে পাচ্ছিল।

“ভাইয়া, তুমি দেরি করে আসছো কেন?”
মনে মনে সে শুনতে পেল সেই পরিচিত কণ্ঠ।

রাশেদ চোখ বন্ধ করল।
“আমি আসছি রিমি… একটু কাজ ছিল…”

কিন্তু চোখ খুলতেই সবকিছু আবার ফাঁকা।

এই ফাঁকা অনুভূতিটা ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করতে থাকে।

রাশেদ এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারে না। শরীর কাজ করলেও মন যেন কোথাও হারিয়ে যায়।

কাজের জায়গায় ভুল করে, লোকজন বকাঝকা করে। কেউ কেউ বলে—“ছেলেটা পাগল হয়ে গেছে।”

সে কোনো জবাব দেয় না।

তার কাছে এখন সব শব্দই অর্থহীন।

একদিন মালিক তাকে ডেকে বলল, “এইভাবে কাজ করলে তো চলবে না। তোমাকে দিয়ে হচ্ছে না।”

রাশেদ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।

“কাল থেকে আর আসতে হবে না।”

এই কথাটা শোনার পরও তার ভেতরে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না।

যেন সবকিছু আগেই শেষ হয়ে গেছে।

কাজ হারানোর পর তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।

টাকা নেই, খাবার নেই।

কখনো একবেলা খায়, কখনো না খেয়েই থাকে।

কিন্তু তার এসব নিয়ে কোনো চিন্তা নেই।

তার চিন্তা শুধু একটাই—রিমি। ছোট বোন।

সে প্রতিদিন বের হয়, রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। কেউ যদি কোনো খবর দেয়—“এইরকম একটা মেয়ে দেখেছি”—সে ছুটে যায়।

কিন্তু প্রতিবারই ফিরে আসে খালি হাতে।

একদিন এক লোক বলল, “এভাবে খুঁজে কি পাবি? এতদিন হয়ে গেছে…”

রাশেদ তার দিকে তাকাল।

তার চোখে এমন এক দৃষ্টি ছিল—যেন সে লোকটাকে ভেদ করে ফেলবে।

“তুই বুঝবি না,” সে ধীরে বলল।

লোকটা চুপ হয়ে গেল।

সময় গড়াতে থাকে।

মানুষের মনে সবকিছু ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়।

কিন্তু রাশেদের ক্ষেত্রে তা হয়নি।

তার কষ্ট দিন দিন আরও তীব্র হতে থাকে।

কারণ তার কাছে কোনো উত্তর নেই।

রিমি বেঁচে আছে, না মরে গেছে—সে কিছুই জানে না।

এই অজানাটাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

একদিন সে থানায় গেল।

“স্যার, কোনো খবর আছে?”

পুলিশ অফিসার ক্লান্ত গলায় বলল, “দেখো, আমরা চেষ্টা করছি… কিন্তু এতদিন হয়ে গেছে…”

“মানে?” রাশেদের গলা কেঁপে উঠল।

“বাস্তবতা মেনে নিতে শেখো।”

এই কথাটা শুনে রাশেদের মাথার ভেতর যেন কিছু ভেঙে গেল।

সে কিছু না বলে বের হয়ে এল।

সেদিন রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল।

রাশেদ রাস্তায় একা একা হাঁটছিল।

কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে—সে নিজেও জানে না।

হঠাৎ সে একটা জায়গায় থেমে গেল।

রাস্তার পাশে একদল ছেলেপেলে আগুন জ্বালিয়ে বসে আছে। তাদের মধ্যে একটা ছোট মেয়ে কাঁদছে।

রাশেদের বুক কেঁপে উঠল।

সে দৌড়ে গেল।

“কেন কাঁদছে?”

একটা ছেলে বলল, “ওর মা অসুস্থ। খাওয়ার কিছু নেই।”

মেয়েটার মুখে কান্না, গায়ে ছেঁড়া কাপড়।

রাশেদের মনে হলো—সে যেন আবার রিমিকে দেখছে।

সে হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটার মাথায় হাত রাখল।

“কাঁদিস না…”

মেয়েটা তার দিকে তাকাল।

“আমার মা মরবে না তো?”

এই প্রশ্নটা শুনে রাশেদের বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে গেল।

সে কোনো উত্তর দিতে পারল না।

কারণ সে জানে—এই প্রশ্নের উত্তর সবসময় সুখের হয় না।

সেদিন রাতে সে প্রথমবার নিজের কষ্টের বাইরে অন্য কারও কষ্ট অনুভব করল।

সে বুঝতে পারল—এই পৃথিবীতে শুধু সে একা না, আরও অনেক মানুষ আছে যারা একইভাবে লড়াই করছে। দু:খ নিয়ে দিন পার করছে।

কিন্তু তবুও তার নিজের যন্ত্রণা কমে না।

বরং এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব শুরু হয় তার ভেতরে।

একদিকে নিজের হারানো মানুষদের জন্য অসহনীয় কষ্ট, অন্যদিকে অন্যদের কষ্ট দেখে নিজের অতীতের প্রতিফলন।

ধীরে ধীরে তার ভেতরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে—কিন্তু সেটা শান্তির পরিবর্তন না, বরং আরও গভীর অনুভূতির। কষ্টের

সে মাঝে মাঝে নিজের সাথে কথা বলে।

“কেন বেঁচে আছি আমি?”

কোনো উত্তর আসে না।

“কার জন্য?”

নীরবতা।

“রিমি যদি না থাকে… তাহলে আমার বেঁচে থাকার মানে কি?”

তার চোখে জল আসে না আর।

কারণ কান্নারও একটা সীমা আছে।

একদিন সেই বৃদ্ধ লোকটির সাথে আবার দেখা হয়।

বৃদ্ধ বললেন, “কেমন আছো?”

রাশেদ একটু হেসে বলল, “ভালো।”

বৃদ্ধ তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিথ্যা বলছো।”

রাশেদ কিছু বলল না।

বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “তোমার কষ্ট কমেনি, তাই না?”

“কষ্ট কি কখনো কমে?” রাশেদ প্রশ্ন করল।

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন, “কষ্ট কমে না, কিন্তু মানুষ কষ্ট নিয়ে বাঁচতে শিখে।”

“আমি শিখতে পারছি না,” রাশেদ বলল।

“পারবে,” বৃদ্ধ বললেন, “কিন্তু তার আগে তোমাকে ভাঙতে হবে আরও।”

রাশেদ চমকে উঠল।

“আরও?”

বৃদ্ধ শুধু বললেন, “জীবন যখন সবকিছু কেড়ে নেয়, তখন সে মানুষকে নতুন কিছু শেখানোর প্রস্তুতি নেয়।”

এই কথাগুলো রাশেদের মাথায় ঘুরতে থাকে।

সেদিন রাতে সে আবার আকাশের দিকে তাকায়। সৃষ্টিকর্তাকে ডাকে।“দু:খ যদি বিক্রি হইতো… আমি হইতাম ধনী…”

তার কণ্ঠ শুকনো গান।

“আমার কাছে আছে শুধু দু:খেরই খনি…”

কিন্তু এবার সে থেমে যায় না।

সে বলে—

“এই খনির শেষ কোথায়?”

তার প্রশ্নটা বাতাসে মিলিয়ে যায়।

কোনো উত্তর আসে না।

রাশেদের জীবন এখন এক অদ্ভুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে।

সে বেঁচে আছে, কিন্তু জীবিত না।

সে হাঁটে, কিন্তু তার কোনো গন্তব্য নেই।

সে দেখে, কিন্তু তার চোখে কোনো স্বপ্ন নেই।

তার ভেতরে জমে থাকা কষ্টগুলো এখন পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।

সে জানে না—এই পাথর কখন ভাঙবে, বা আদৌ ভাঙবে কিনা।

কিন্তু সে একটা জিনিস অনুভব করতে শুরু করেছে—

এই অন্ধকারের শেষ এখনো আসেনি।

বরং সে ধীরে ধীরে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

আর সেই অন্ধকারে এমন কিছু লুকিয়ে আছে—যা তার জীবনের মোড় পুরোপুরি বদলে দেবে।

চলবে..........