ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে নাটকীয় পরিবর্তন আসে, তার অন্যতম দিক ছিল নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের দ্রুত উত্থান। অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে দল গঠনের এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই প্রবণতা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। নবীন-প্রবীণ রাজনীতিক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে একেবারে নতুন মুখ—অনেকে হঠাৎ করেই রাজনীতির মঞ্চে সামনে চলে আসেন। কিন্তু নিবার্চনের পর পরই এনসিপি ছাড়া অন্যান্য দলগুলোর কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়েছে।
নির্বাচনের আগে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব নতুন দলের বড় বড় ব্যানার, ফেস্টুন ও প্রচারণা কার্যক্রম রাজনৈতিক পরিবেশকে এক ধরনের নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিয়েছিল। ইনডোর-আউটডোর কর্মসূচির মাধ্যমে তারা নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করে। অনেকের ধারণা ছিল, এই নতুন দলগুলো হয়তো দেশের রাজনীতিতে একটি ভিন্নধারার সূচনা করবে। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর মাত্র দুই মাসের মধ্যেই বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। ‘বসন্তের কোকিল’ হিসেবে পরিচিত এসব দলের বেশিরভাগই এখন কার্যত অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
মাঠের রাজনীতির সাম্প্রতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নতুন দলগুলোর মধ্যে কেবল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সক্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে আমজনতার দল, বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি কিংবা জনতা পার্টি বাংলাদেশের মতো দলগুলো এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে ড্রয়িংরুমভিত্তিক আলোচনা কিংবা আনুষ্ঠানিক কাগুজে কার্যক্রমে। নির্বাচনের সময় ‘ব্যাঙের ছাতার’ মতো গজিয়ে ওঠা এসব দলের জৌলুস দ্রুতই ফিকে হয়ে গেছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই দলটি শুরু থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে তারা জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে সংসদে বিরোধী দলের আসনে রয়েছে এবং তাদের ছয়জন সংসদ সদস্য রয়েছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারের সমালোচনায় সরব থেকে দলটির তরুণ নেতারা নিজেদের দৃশ্যমানতা বজায় রেখেছেন।
নাহিদ ইসলাম এবং আখতার হোসেন-এর নেতৃত্বে এনসিপি শুরুর দিকে তরুণ প্রজন্মের আস্থা অর্জনে সক্ষম হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠছে। তবুও সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের কারণে দলটি এখনো অন্য নতুন দলগুলোর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। তারা ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগরসহ বিভিন্ন জেলায় সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং নতুন নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিজেদের বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, নিবন্ধন পাওয়ার পরও জনপ্রিয়তা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে আমজনতার দল। সাবেক গণঅধিকার পরিষদের নেতা তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই দলটি নির্বাচনের আগে বেশ আলোচনায় আসে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের দাবিতে তার অনশন কর্মসূচি ব্যাপক আলোচিত হয়। অবশেষে ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর দলটি নিবন্ধন পেলেও নির্বাচনে একটি আসনও জয় করতে পারেনি।
নির্বাচনের পর দলটির কার্যক্রমে দৃশ্যমান স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদিও দলটির নেতারা দাবি করছেন যে তারা ইনডোর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ করছেন, বাস্তবে মাঠপর্যায়ে তাদের উপস্থিতি খুবই সীমিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলটি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক হওয়ায় সংগঠনগত শক্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।
একই চিত্র দেখা যায় মোহাম্মদ রফিকুল আমীন-এর নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টির ক্ষেত্রেও। কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি বড় আকারে দল গঠনের ঘোষণা দেন এবং একটি বিশাল কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেন। কিন্তু নির্বাচনে দলটি কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। বর্তমানে দলটির কার্যক্রম প্রায় নেই বললেই চলে, এবং তাদের কার্যালয়ও অনেকাংশে নিষ্ক্রিয়।
বিশ্লেষকদের মতে, রফিকুল আমীন বর্তমানে রাজনৈতিক কার্যক্রমের চেয়ে নিজের ব্যবসায়িক অবস্থান পুনরুদ্ধারে বেশি মনোযোগী। ফলে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমও থমকে গেছে।
আরও সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে জনতা পার্টি বাংলাদেশ। জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন-এর নেতৃত্বে গঠিত এই দলটি শুরুতে নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর করতে পারেনি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম সারওয়ার মিলনের মৃত্যু, ইলিয়াস কাঞ্চনের অসুস্থতা এবং মহাসচিব শওকত মাহমুদের কারাবন্দিত্ব—সব মিলিয়ে দলটি বর্তমানে গভীর নেতৃত্ব সংকটে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়কালে প্রায় ৩০টির মতো নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর মধ্যে নিউক্লিয়াস পার্টি, জনপ্রিয় পার্টি, জাগ্রত পার্টিসহ আরও অনেক দল ছিল, যাদের অনেকেরই কোনো কার্যকর সাংগঠনিক ভিত্তি বা স্থায়ী কার্যালয় নেই। এদের অধিকাংশই এখন নামসর্বস্ব দলে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দল গঠনের যে প্রবণতা দেখা যায়, তা মূলত ‘কিংস পার্টি’ বা সুবিধাবাদী রাজনীতির অংশ। এসব দল সাধারণত ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়, কিন্তু জনসম্পৃক্ততা ও আদর্শিক ভিত্তির অভাবে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না।
ড. মো. শামসুল আলম মনে করেন, ভোটের আগে নতুন দলের উত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে অধিকাংশ দলই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়। তার মতে, যেসব দলের শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তি, সুসংগঠিত কাঠামো এবং জনগণের সঙ্গে গভীর সংযোগ রয়েছে, কেবল তারাই টিকে থাকতে পারে।
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন দলগুলোর মধ্যে এনসিপি কিছুটা ব্যতিক্রম তৈরি করতে পারলেও অন্যদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাস্তবতা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তি-নির্ভরতা, দুর্বল সংগঠন, সীমিত জনসম্পৃক্ততা এবং নির্বাচনী ব্যর্থতা—এসব কারণেই অধিকাংশ দল দ্রুতই প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি স্পষ্ট যে, কেবলমাত্র নির্বাচনের আগে দৃশ্যমানতা তৈরি করলেই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন সুদৃঢ় সাংগঠনিক কাঠামো, আদর্শিক অবস্থান এবং জনগণের আস্থা অর্জনের সক্ষমতা। অন্যথায় ‘বসন্তের কোকিল’ হয়ে আবির্ভূত হওয়া দলগুলোর পরিণতি একই—স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া।