ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৪:১৯:১৬ PM

কে হচ্ছেন বিএনপি”র পরবর্তী মহাসচিব !

মান্নান মারুফ
23-04-2026 01:48:17 PM
কে হচ্ছেন বিএনপি”র পরবর্তী মহাসচিব !

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির আসন্ন কাউন্সিলকে ঘিরে দলটির সর্বোচ্চ সাংগঠনিক পদ মহাসচিব নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই অবসরের ইঙ্গিত দেওয়ায় নতুন নেতৃত্বে কে আসবেন, তা এখন দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত দুটি নাম হলো রুহুল কবির রিজভী এবং সালাহউদ্দিন আহমেদ। তবে এর বাইরে আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা আলোচনায় রয়েছেন, যা প্রমাণ করে এবারের কাউন্সিল শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের নয়, বরং দল পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ১ সেপ্টেম্বর উপলক্ষে এবছরই জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও নানা রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক দশকের বেশি সময় তা সম্ভব হয়নি। ফলে এবারের কাউন্সিলকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এবার ভিন্ন। দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপি এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে এবং সরকারের বিভিন্ন স্তরে দলের বহু নেতা দায়িত্ব পালন করছেন। এতে করে সংগঠনের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে কাউন্সিল অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। শীর্ষ নেতৃত্বও বিষয়টি উপলব্ধি করে দ্রুত সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে।

দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে থাকা তারেক রহমান এখন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর মৃত্যুর পর দলীয় নেতৃত্বে তার অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে। ফলে নতুন মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মহাসচিব পদে আলোচনায় থাকা দুই প্রধান নেতা—রুহুল কবির রিজভী ও সালাহউদ্দিন আহমেদ—উভয়েরই রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দলের প্রতি উল্লেখযোগ্য অবদান। রুহুল কবির রিজভী দীর্ঘদিন ধরে দলের দপ্তর ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। বিশেষ করে কঠিন সময়গুলোতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন ও ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ জুগিয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্য, যা তাকে এই পদের জন্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অন্যদিকে সালাহউদ্দিন আহমেদ দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে তার দক্ষতা এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তাকে আলাদা অবস্থানে নিয়ে গেছে। বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার অভিজ্ঞতাও তাকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। ফলে মহাসচিব পদে তার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এছাড়াও আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, শামসুজ্জামান দুদু, আমান উল্লাহ আমানসহ আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ নেতা। দলীয় অভ্যন্তরে অনেকেই মনে করছেন, অভিজ্ঞতা, ত্যাগ এবং সাংগঠনিক দক্ষতার সমন্বয়েই নতুন মহাসচিব নির্বাচিত হবেন।

দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এবারের কাউন্সিল আগের তুলনায় আরও বড় পরিসরে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। এতে করে দলের ভেতরে নতুন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে এবং সাংগঠনিক গতিশীলতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, তিনি শারীরিকভাবে ক্লান্ত এবং আসন্ন কাউন্সিলের পর রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। তার এই ঘোষণার পর থেকেই নতুন মহাসচিব নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। দলীয় নেতারা মনে করছেন, তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার পর নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এটি দলের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করবে।

স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের মতে, শুধু মহাসচিব নয়, দলের স্থায়ী কমিটি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে স্থায়ী কমিটির নির্ধারিত সদস্যসংখ্যা পূর্ণ নয় এবং কয়েকজন সদস্য বয়সজনিত কারণে সক্রিয় নন। ফলে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে কমিটিকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের কাউন্সিল বিএনপির জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলের মাধ্যমে দল তার সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে কিনা, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে নতুন মহাসচিব কে হচ্ছেন, সেটিও নির্ধারণ করবে দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল ও দিকনির্দেশনা।

সবশেষে বলা যায়, বিএনপির আসন্ন কাউন্সিল শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি দলের পুনর্গঠন, শক্তি পুনর্বিন্যাস এবং ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রুহুল কবির রিজভী নাকি সালাহউদ্দিন আহমেদ—কে হচ্ছেন নতুন মহাসচিব, তা জানতে এখন তাকিয়ে আছে পুরো রাজনৈতিক অঙ্গন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে দলের হাইকমান্ড ও কাউন্সিলের ওপর, যেখানে অভিজ্ঞতা, ত্যাগ এবং সাংগঠনিক দক্ষতাই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়।