ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৩:৪৪:৫১ PM

উপন্যাস: একাকী মনে

মান্নান মারুফ
24-03-2026 01:56:53 PM
উপন্যাস: একাকী মনে

 (শেষ পর্ব)

“যদি কখনো হারিয়ে যাই, খুঁজে নিও তোমারই মাঝে—
কারণ আমার সব অনুভূতি আজ তোমাকেই ঘিরে সাজে…”

নেহা ডায়েরির শেষ পাতায় লাইনগুলো লিখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানালার বাইরে সকালের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। একটা নতুন দিনের শুরু, অথচ তার মনে হচ্ছে—এটা যেন শুধু একটা দিনের নয়, বরং একটা গল্পের শেষ এবং আরেকটা জীবনের শুরু।

গত কয়েক মাসে অনেক কিছু বদলে গেছে।

আরিয়ান এখন আর আগের সেই দূরত্বে থাকা মানুষটা নয়। সে এখন নেহার প্রতিদিনের অভ্যাস, প্রতিটি হাসির কারণ, প্রতিটি দুঃখের সান্ত্বনা। তাদের সম্পর্কটা ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে আর কোনো ভয় নেই—শুধু আছে বিশ্বাস।

তবুও, আজকের দিনটা অন্যরকম।

আজ আরিয়ান নেহাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে—গতকাল ফোনে শুধু এতটুকুই বলেছিল,
“নেহা, কাল তোমার সঙ্গে দেখা করা খুব দরকার। একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

এই কথাটা রাতভর নেহার মনে ঘুরেছে।
কী সিদ্ধান্ত?
কোনো খারাপ খবর?
নাকি নতুন কোনো শুরু?

হাজারো প্রশ্নের ভিড়ে তার মন অস্থির হয়ে আছে।

বিকেলে তারা দেখা করে সেই পুরোনো পার্কে—যেখানে তাদের গল্পটা আবার নতুন করে শুরু হয়েছিল।

নেহা এসে দেখে, আরিয়ান আগেই বসে আছে। তার চোখে আজ এক ধরনের দৃঢ়তা, কিন্তু সেই সঙ্গে একটা অদ্ভুত টেনশনও আছে।

“তুমি ঠিক আছো?”
নেহা কাছে এসে জিজ্ঞেস করে।

আরিয়ান হালকা হাসে।
“হ্যাঁ… তবে আজ একটু নার্ভাস লাগছে।”

নেহা অবাক হয়।
“তুমি? নার্ভাস?”

“হ্যাঁ,” আরিয়ান বলে, “কারণ আজ আমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলতে যাচ্ছি।”

নেহার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।

“বল,” সে ধীরে বলে।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থাকে, যেন শব্দগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে।

“নেহা,” সে শুরু করে,
“আমরা অনেক পথ পেরিয়ে এখানে এসেছি। ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব, কষ্ট—সবকিছু পার হয়ে আমরা আবার একসাথে দাঁড়িয়ে আছি।”

নেহা চুপচাপ শুনছে।

“এই সময়টা আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে,” আরিয়ান বলে,
“ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়—এটা দায়িত্ব, প্রতিশ্রুতি, আর একে অপরকে ধরে রাখার ইচ্ছা।”

নেহার চোখে জল এসে যায়।

“আমি আর কখনো তোমাকে হারাতে চাই না,” আরিয়ান বলে,
“তাই আমি চাই… আমরা আমাদের এই সম্পর্কটাকে একটা নাম দিই।”

নেহা নিঃশ্বাস আটকে রাখে।

আরিয়ান পকেট থেকে একটা ছোট্ট বাক্স বের করে।

“নেহা, তুমি কি আমার সঙ্গে সারাজীবন থাকতে রাজি?”

চারপাশ যেন হঠাৎ থেমে যায়।

নেহার চোখ ভিজে ওঠে।
এই মুহূর্তটা সে কল্পনা করেছে অনেকবার, কিন্তু বাস্তবে এটা এতটা গভীর হবে, তা সে ভাবেনি।

“আরিয়ান…”
তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।

“আমি পারফেক্ট না,” আরিয়ান বলে,
“আমি ভুল করি, আমি মাঝে মাঝে হারিয়ে যাই। কিন্তু আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—আমি সবসময় তোমার কাছে ফিরে আসবো।”

নেহা চোখ মুছে।

“তুমি কি জানো,” সে ধীরে বলে,
“আমি সবসময় এই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করেছি?”

আরিয়ানের চোখে আশার ঝলক দেখা যায়।

“তাহলে?”

নেহা হেসে ওঠে, চোখে জল নিয়েই—
“হ্যাঁ, আমি রাজি।”

আরিয়ান যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
সে আঙুলে আংটিটা পরিয়ে দেয়।

এই ছোট্ট মুহূর্তেই তাদের ভালোবাসা যেন একটা পূর্ণতা পায়।

হালকা বাতাস বইছে, সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে।
আকাশে লালচে আলো, আর সেই আলোয় দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ—যারা অনেক হারিয়ে গিয়ে আবার একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে।

“ধন্যবাদ,” আরিয়ান আস্তে বলে।

“কিসের জন্য?”

“আমার জন্য অপেক্ষা করার জন্য,” সে বলে।

নেহা মাথা নাড়ে।
“ভালোবাসা কখনো অপেক্ষা করতে ক্লান্ত হয় না।”

তারা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

এই নীরবতায় কোনো অস্বস্তি নেই—শুধু আছে শান্তি।

রাতে নেহা বাসায় ফিরে আবার ডায়েরিটা খুলে।

আজকের দিনটা সে কখনো ভুলতে পারবে না।

সে লিখতে শুরু করে—

“আজ আমার গল্পটা সম্পূর্ণ হলো।
একসময় যে একাকীত্ব আমাকে ঘিরে ছিল, আজ সেই জায়গাটা ভরেছে ভালোবাসায়।”

তারপর কিছুক্ষণ থেমে আবার লেখে—

“আরিয়ান, যদি কখনো আমি হারিয়ে যাই, তুমি আমাকে তোমার মাঝেই খুঁজে নিও।
কারণ আমি আর আলাদা কোনো সত্তা নই—আমি এখন তোমার অনুভূতির অংশ।”

নেহা কলমটা নামিয়ে রাখে।

তার মনে হয়—
এই গল্পটা আসলে শেষ নয়।

এটা একটা নতুন অধ্যায়ের শুরু, যেখানে তারা একসাথে পথ চলবে, নতুন স্বপ্ন দেখবে, আর একে অপরকে আগলে রাখবে।

ফোনে একটা মেসেজ আসে।

আরিয়ান—
“আজকের দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন।”

নেহা মুচকি হাসে।

“আমারও,” সে রিপ্লাই করে।

জানালার বাইরে তাকিয়ে সে দেখে—আকাশে পূর্ণ চাঁদ।

এই চাঁদটা যেন আজ অন্যরকম উজ্জ্বল।

হয়তো ভালোবাসা এমনই—
এটা অন্ধকারের মধ্যেও আলো খুঁজে নেয়।

নেহা চোখ বন্ধ করে।

তার মনে আর কোনো ভয় নেই, কোনো একাকীত্ব নেই।

শুধু আছে একটা নিশ্চিন্ত অনুভূতি—
সে আর একা নয়।

“একাকী মনে” আর একাকীত্ব নেই—
এখন সেখানে শুধু ভালোবাসা।

।। সমাপ্ত ।।