ঢাকা, শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৫:০৬:৫৩ PM

উপন্যাস: মালি

মান্নান মারুফ
20-03-2026 11:35:40 AM
উপন্যাস: মালি

শেষ পর্ব

কুদ্দুছ প্রায়ই রাতের অন্ধকারে জেগে থাকত। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ কিংবা দূরের কুকুরের ডাক—সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা তাকে গ্রাস করত। তার বুকের ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেত—এই ভালোবাসার শেষ কোথায়?

নাদিয়া কি পারবে তার সেই বিলাসী অতীত ভুলে এই কাদা-মাটির জীবনে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিতে? নাকি একদিন হঠাৎ সবকিছু ভেঙে পড়বে?

আরেকটা ভয় তাকে তাড়া করে ফিরত—দুবাইয়ের সেই প্রভাবশালী শেখ। যার ছায়া যেন এখনও তাদের পিছু ছাড়েনি। কুদ্দুছ ভাবত, “যদি কোনোদিন সেই কালো হাত এই ছোট্ট গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়?”

এই ভয়, এই অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে তার ভেতরের লড়াইটা দিন দিন আরও তীব্র হয়ে উঠছিল।


নাদিয়া তখন উঠোনে বসে শাক কাটছিল। ভোরের আলো তার মুখে পড়েছে। একসময় যে মুখে শহরের চাকচিক্য ছিল, এখন সেখানে গ্রামবাংলার সাদামাটা শান্তি।

কুদ্দুছ চুপচাপ তাকে দেখছিল।

“কি ভাবছো?” নাদিয়া হেসে জিজ্ঞেস করল।

কুদ্দুছ একটু থেমে বলল,
“তুমি কি সুখে আছো?”

নাদিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে—
“সুখ কি জানো? যেখানে ভয় কম থাকে… আর ভালোবাসা বেশি থাকে। আমি চেষ্টা করছি।”

“চেষ্টা?” কুদ্দুছের গলায় কষ্ট ফুটে ওঠে।

“হ্যাঁ… কারণ সবকিছু এত সহজ না।”


দিনগুলো যেন এক অদ্ভুত ভার নিয়ে এগোতে থাকে। গ্রামের মানুষজন তাদের নিয়ে এখনও কথা বলে, সমাজের চোখে তারা এখনও অপরাধী।

কিন্তু তারা নিজেরা চেষ্টা করে—একটা ছোট্ট পৃথিবী গড়ে তোলার।

তবুও শান্তি যেন ধরা দেয় না।


একদিন দুপুরে, গ্রামের এক ছেলেমানুষ দৌড়ে এসে খবর দেয়—
“কুদ্দুছ ভাই, কিছু লোক আইছে… শহর থেকে। তোমারে খুঁজতেছে!”

কুদ্দুছের বুক ধক করে ওঠে। তার চোখে ভয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

“কেমন লোক?”

“দেখতে বড়লোকের মতো… গাড়ি নিয়া আইছে।”

নাদিয়ার হাত থেকে ছুরি পড়ে যায়। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে।

“ওরা… ওরা কি আমার জন্য?” তার কণ্ঠ কাঁপতে থাকে।

কুদ্দুছ কিছু বলে না। কিন্তু তার নীরবতাই সব বলে দেয়।


সেই বিকেলে, গ্রামের মেঠোপথে কালো রঙের একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। কয়েকজন লোক নেমে আসে—চোখে কালো চশমা, মুখে কঠোরতা।

গ্রামের মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে দেখে—কেউ এগিয়ে আসে না।

একজন লোক কুদ্দুছের সামনে এসে দাঁড়ায়।
“নাদিয়া কোথায়?”

কুদ্দুছ বুক সোজা করে দাঁড়ায়।
“আপনারা কারা?”

লোকটা হেসে বলে,
“আমরা ওকে নিতে এসেছি। যেখানে ওর থাকার কথা, সেখানে।”


নাদিয়া ভেতর থেকে সব শুনছিল। তার বুকের ভেতর কাঁপন শুরু হয়। অতীত যেন আবার তার সামনে এসে দাঁড়ায়।

সে ধীরে ধীরে বাইরে আসে।

“আমি যাবো না,” সে দৃঢ় কণ্ঠে বলে।

লোকগুলো একে অপরের দিকে তাকায়।
“তুমি ভুলে যাচ্ছো, তুমি কার?”

নাদিয়া চোখ তুলে তাকায়—
“আমি এখন আমার নিজের।”


পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়ে যায়।

লোকগুলো জোর করে নাদিয়াকে নিয়ে যেতে চায়। কুদ্দুছ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।

“কেউ তাকে নিয়ে যেতে পারবে না!”

তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যা আগে কখনও শোনা যায়নি।

একজন লোক তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। কুদ্দুছ মাটিতে পড়ে যায়, কিন্তু আবার উঠে দাঁড়ায়।

“নাদিয়া আমার… আমি তাকে যেতে দেবো না!”


সংঘর্ষ শুরু হয়।

গ্রামের মানুষ দূর থেকে তাকিয়ে থাকে—কেউ সাহস করে এগিয়ে আসে না।

একটা ধাক্কা, একটা চিৎকার… আর হঠাৎ—

সবকিছু থেমে যায়।


নাদিয়া চিৎকার করে ওঠে—
“কুদ্দুছ!”

কুদ্দুছ মাটিতে পড়ে আছে। তার বুক থেকে রক্ত বের হচ্ছে।

সময় যেন থমকে যায়।

লোকগুলো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর দ্রুত গাড়িতে উঠে চলে যায়।


নাদিয়া ছুটে এসে কুদ্দুছের মাথা কোলে নেয়।

“তুমি চোখ খুলো… প্লিজ!”

তার চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরছে।

কুদ্দুছ কষ্ট করে চোখ খোলে। তার ঠোঁটে একটুখানি হাসি।

“ভয় পেয়ো না… আমি আছি…”

“না! তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারো না!”

নাদিয়ার কণ্ঠ ভেঙে যায়।

কুদ্দুছ ধীরে বলে—
“আমি তো কোথাও যাচ্ছি না… আমি তোমার মধ্যেই থাকবো…”


আকাশে তখন কালো মেঘ জমেছে।

বৃষ্টি নামতে শুরু করে।

নাদিয়ার চোখের পানি আর বৃষ্টির ফোঁটা এক হয়ে যায়।

“তুমি আমাকে একা রেখে যেতে পারো না…”

সে বারবার বলতে থাকে।

কুদ্দুছের চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে।

তার শেষ কথাটা ছিল—
“ভালোবাসি…”


বৃষ্টি থামে না।

গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। কিন্তু তখন সব শেষ।

নাদিয়া নিথর হয়ে বসে থাকে, কুদ্দুছের নিস্তব্ধ শরীর কোলে নিয়ে।

তার চারপাশে পৃথিবী ভেঙে পড়েছে, কিন্তু সে কিছুই অনুভব করতে পারে না।


দিন কেটে যায়।

গ্রাম আবার আগের মতো হয়ে যায়। মানুষ আবার তাদের নিজ নিজ জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

কিন্তু নাদিয়ার জীবন থেমে যায় সেই দিনেই।

সে এখনও সেই টিনের চালের বাড়িতেই থাকে।

সাদা শাড়ি পরে, নীরবে দিন কাটায়।

লোকজন এখনও কথা বলে, এখনও কটাক্ষ করে।

কিন্তু এখন আর সেগুলো তার কানে পৌঁছায় না।


প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে উঠোনে বসে থাকে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মনে হয়—কুদ্দুছ হয়তো কোথাও আছে, তাকে দেখছে।


একদিন গ্রামের এক মেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল—
“আপা, আপনি এখানে থাকেন কেন?”

নাদিয়া মৃদু হাসে।
“কারণ আমার সবকিছু এখানে…”


ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে এক করে দেয়।

আবার কখনো সবকিছু ছিনিয়ে নেয়।

কুদ্দুছ আর নাদিয়ার ভালোবাসা—সেটা কোনো সুখের গল্প নয়।

এটা এক ত্যাগের গল্প, এক অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প।


কিছু প্রেম শেষ হয় না।

তারা থেকে যায়—কষ্টের মধ্যে, স্মৃতির মধ্যে, আর এক বুক নিঃসঙ্গতার মধ্যে।

কুদ্দুছ আর নাদিয়ার ভালোবাসাও তেমনই—

অপূর্ণ…
অবিনশ্বর…
অমর।