ঢাকা, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৩:১২:৪৫ PM

উপন্যাস:সেই মেয়েটি

মান্নান মারুফ
22-03-2026 12:25:54 PM
উপন্যাস:সেই মেয়েটি

 পর্ব-১

বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে কুদ্দুছ গিয়েছিল এক অচেনা জায়গায়—বিয়ের দাওয়াতে। জায়গাটা তার নিজের এলাকার মতো নয়, মানুষের মুখগুলোও অজানা। তবুও গ্রামবাংলার বিয়ের এক চিরচেনা আবহ তাকে ঘিরে ধরেছিল—মাইকের শব্দ, হাসির কলরব, রান্নার গন্ধ, আর মানুষের আনাগোনা।

কুদ্দুছ প্রথমে যেতে চাইছিল না। কিন্তু বন্ধুদের জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত যেতে হয়েছিল।
—“চল না দোস্ত, মজা হবে!”
বন্ধুরা বলেছিল।
আর সেই মজার খোঁজেই সে চলে এসেছিল এই অচেনা বিকেলে।

খাওয়া-দাওয়া শেষে যখন সে রওনা দেবে, তখন সময়টা ঠিক বিকেল তিনটা। সূর্যের আলো তখন একটু নরম হয়ে এসেছে, চারপাশে একটা অলস নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। বিয়েবাড়ির ভেতরে তখনও ব্যস্ততা—কনে সাজানো হচ্ছে, আত্মীয়-স্বজনদের আনাগোনা চলছে। কিন্তু কুদ্দুছের মনে হচ্ছিল, তার আর এখানে থাকার কিছু নেই।

ঠিক তখনই—

তার সামনে দিয়ে হেঁটে গেল একটি মেয়ে।

হাঁটার ভঙ্গি ছিল শান্ত, ধীর। যেন সে এই পৃথিবীর তাড়াহুড়োর বাইরে অন্য এক জগতে বাস করে। কুদ্দুছ প্রথমে খেয়ালই করেনি। কিন্তু হঠাৎ করেই তার চোখ আটকে গেল মেয়েটির ওপর।

কিছুদূর গিয়ে মেয়েটি একটা রিকশায় উঠলো।

রিকশা ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করলো।

মেয়েটি একাই ছিল।

কুদ্দুছ তাকিয়ে রইলো। তার চোখ যেন সরছিল না। মেয়েটির মুখ পুরোটা দেখা যাচ্ছিল না—খোলা চুলের ফাঁকে আংশিক ঢাকা। কিন্তু সেই আড়াল করা মুখেই ছিল এক অদ্ভুত আকর্ষণ, এক অজানা টান।

—“কিরে? তাকিয়ে আছিস কেন?”
বন্ধু হেসে বললো।

কুদ্দুছ কোনো উত্তর দিল না।

তার ভেতরে তখন অদ্ভুত কিছু ঘটছে। সে নিজেই বুঝতে পারছিল না—এটা কৌতূহল, না অন্য কিছু।

—“চল, ফলো দেই!”
বন্ধু মজা করে বললো।

এই কথাটা হয়তো সাধারণ সময় হলে কুদ্দুছ হেসে উড়িয়ে দিত। কিন্তু আজ সে পারলো না।

বিয়েবাড়িতে তখনও সময় কাটানোর মতো কিছু নেই। কনে সাজাতে সময় লাগবে, অনুষ্ঠান শুরু হতে দেরি আছে। আর এই ফাঁকা সময়টাই যেন তাকে ঠেলে দিল সেই অজানা পথে।

—“চল…”
কুদ্দুছ নিজেই বলে ফেললো।

বন্ধু অবাক হয়ে তাকালো। তারপর হেসে উঠলো।

দু’জন দ্রুত একটা রিকশায় উঠে বসল।

—“ওই সামনে যে রিকশাটা যাচ্ছে, ওটার পিছু নিন।”
কুদ্দুছ রিকশাওয়ালাকে বললো,
—“কিন্তু সামনে যাবেন না।”

রিকশাওয়ালা একটু মুচকি হাসলো। হয়তো সে সব বুঝে গেছে।

রিকশা চলতে শুরু করলো।

সামনে সেই মেয়েটি, আর পেছনে কুদ্দুছ।

দূরত্বটা খুব বেশি নয়, আবার খুব কাছেও নয়। ঠিক যতটুকু দূরত্বে থাকলে দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না।

বাতাসে তখন এক অদ্ভুত শীতলতা। রাস্তার দু’পাশে গাছপালা, মাঝে মাঝে পাখির ডাক, আর সেই নির্জনতায় মেয়েটির উপস্থিতি যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠছিল।

কুদ্দুছের মনে হচ্ছিল—সে যেন কোনো স্বপ্নের পিছু নিয়েছে।

—“দোস্ত, প্রেমে পড়লি নাকি?”
বন্ধু আবার খোঁচা দিল।

কুদ্দুছ এবারও কিছু বললো না।

কারণ সে জানতো না—এটা প্রেম কিনা।

শুধু মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটিকে সে আগে কোথাও দেখেছে। হয়তো স্বপ্নে, হয়তো কোনো কল্পনায়। অথবা হয়তো কোনো জন্মের স্মৃতিতে।

রিকশা এগোতে থাকলো।

ধীরে ধীরে লোকজন কমে এলো। রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেল। শহরের শব্দ পেছনে পড়ে গেল। সামনে শুধু নির্জনতা।

হঠাৎ করেই মেয়েটির রিকশা একটা মোড়ে ঢুকে পড়লো।

কুদ্দুছের বুক ধক করে উঠলো।

—“তাড়াতাড়ি যান!”
সে রিকশাওয়ালাকে বললো।

রিকশা মোড় ঘুরলো।

কিন্তু আশ্চর্য—

সামনে কোনো রিকশা নেই।

কুদ্দুছ হতবাক হয়ে গেল।

—“কই গেল?”
বন্ধু বিস্ময়ে বললো।

চারপাশে তাকালো তারা।

রাস্তা ফাঁকা।

কোনো মানুষ নেই।

কোনো রিকশা নেই।

শুধু এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।

—“এই তো সামনে ছিল…”
কুদ্দুছ নিজের কাছেই যেন বললো।

রিকশাওয়ালা বললো,
—“ভাই, আমি তো চোখের সামনে দেখলাম, কিন্তু হঠাৎ কোথায় গেল বুঝলাম না।”

কুদ্দুছের শরীর শিউরে উঠলো।

তার মনে হলো—সে কি কিছু ভুল দেখেছে?

না কি—

মেয়েটি সত্যিই হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে?

বাতাস হঠাৎ ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

চারপাশে যেন একটা চাপা অন্ধকার নেমে এলো, যদিও তখনও পুরো সন্ধ্যা হয়নি।

কুদ্দুছ রিকশা থেকে নেমে পড়লো।

সে চারপাশে হাঁটতে লাগলো, খুঁজতে লাগলো মেয়েটিকে।

কোথাও নেই।

কোনো চিহ্ন নেই।

শুধু সেই অনুভূতি—যেন কেউ ছিল, কিন্তু এখন নেই।

বন্ধু একটু ভয় পেয়ে গেল।

—“চল ফিরে যাই…”
সে বললো।

কুদ্দুছ চুপ করে রইলো।

তার মনে হচ্ছিল—এই ঘটনা শুধু একটা কাকতালীয় নয়।

এখানে কিছু আছে।

কিছু অদ্ভুত।

কিছু অজানা।

সে আবার একবার চারপাশে তাকালো।

হঠাৎ—

দূরে, এক গাছের আড়ালে, যেন কারো সাদা ওড়না উড়লো।

কুদ্দুছের বুক কেঁপে উঠলো।

—“ওই!”
সে দৌড় দিল সেই দিকে।

কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলো—

কিছুই নেই।

শুধু বাতাস।

আর নড়তে থাকা গাছের পাতা।

কুদ্দুছ থেমে গেল।

তার শ্বাস দ্রুত চলছে।

সে বুঝতে পারছিল না—সে কী দেখলো।

বন্ধু এসে পাশে দাঁড়ালো।

—“কি হলো?”

কুদ্দুছ ধীরে বললো,
—“ও ছিল…”

—“কে?”

—“সেই মেয়েটি…”

তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত নিশ্চয়তা।

যেন সে জানে—মেয়েটি বাস্তব।

কিন্তু কোথায় গেল সে?

কেন এভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল?

কুদ্দুছের মনে এক অদ্ভুত টান জন্ম নিল।

এই রহস্যের প্রতি।

এই মেয়েটির প্রতি।

সে জানতো না—

এই টান তাকে কোথায় নিয়ে যাবে।

শুধু জানতো—

সে থামবে না।

সে আবার খুঁজবে সেই মেয়েটিকে।

যে এসেছিল হঠাৎ,
আর চলে গেল হঠাৎ—

কিন্তু রেখে গেল এক অদ্ভুত শূন্যতা।

একটা অসমাপ্ত অনুভূতি।

একটা শুরু—

যার শেষ হয়তো খুবই বেদনাদায়ক।

চলবে…