উপন্যাস: বিয়ে
পর্ব–২
সেই থেকে শুরু।
অফিসের ব্যস্ততা, হিসাবের খাতা আর কম্পিউটারের ফাইলের মাঝখানে অদ্ভুত এক সম্পর্ক ধীরে ধীরে জন্ম নিতে লাগল। প্রথমে ছিল শুধুই বন্ধুত্ব, তারপর অজান্তেই সেই বন্ধুত্বে মিশে গেল অদৃশ্য এক টান—যার নাম ভালোবাসা।
ফাতিমা এখন প্রায়ই রাকিবের ডেস্কে এসে দাঁড়াত।
“আজ আমাকে নতুন একটা বাংলা শব্দ শেখাও,” সে বলত।
রাকিব হাসত।
“তুমি এত বাংলা শিখে কী করবে?”
ফাতিমা চোখ টিপে বলত,
“তোমার সাথে কথা বলব।”
একদিন বিকেলে অফিসের কাজ শেষের দিকে। বাইরে সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। জানালার কাঁচে লাল আলো পড়েছে।
রাকিব কাগজপত্র গুছাচ্ছিল। হঠাৎ ফাতিমা এসে বলল—
“আজ আমাকে একটা বাক্য শেখাও।”
“কোন বাক্য?”
ফাতিমা একটু ভেবে বলল,
“যেটা প্রেমের।”
রাকিব থমকে গেল। তার গলায় শব্দ আটকে গেল।
কিছুক্ষণ পরে সে ধীরে ধীরে বলল—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
ফাতিমা শব্দগুলো কয়েকবার উচ্চারণ করল।
“আমি… তোমাকে… ভালোবাসি।”
তারপর হেসে বলল,
“এই কথাটা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ?”
রাকিব একটু চুপ করে থাকল।
“হ্যাঁ,” সে বলল, “এই কথাটা বলার জন্য অনেক সাহস লাগে।”
ফাতিমা তখনও হাসছিল, কিন্তু তার চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা ফুটে উঠেছিল।
এরপর থেকে তাদের সময় কাটতে লাগল নতুন এক ছন্দে।
কখনও অফিসের ছাদে বসে তারা চা খেত। কখনও কাজ শেষ করে কাছের পার্কে হাঁটতে যেত।
একদিন ফাতিমা বলল—
“তুমি আমাকে তোমার দেশের গল্প শোনাও।”
রাকিব একটু দূরের দিকে তাকাল।
তার চোখে যেন অন্য এক পৃথিবী ভেসে উঠল।
“আমাদের দেশে অনেক নদী,” সে বলল। “বড় বড় নদী। বর্ষাকালে যখন বৃষ্টি নামে, তখন মনে হয় আকাশ আর মাটির মধ্যে কোনো সীমা নেই।”
“সত্যি?” ফাতিমা মুগ্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“হুম। আর গ্রামের বাড়িতে আমার মা আছে। তিনি যখন ইলিশ মাছ ভাজেন… পুরো বাড়ি গন্ধে ভরে যায়।”
ফাতিমা হেসে উঠল।
“ইলিশ মাছ কি খুব সুস্বাদু?”
“তুমি খেলে বুঝতে পারবে।”
ফাতিমা তখন একটু থেমে বলল—
“আমি একদিন বাংলাদেশ যাব। তোমার সাথে।”
রাকিবের বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
সে কিছু বলল না। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
দিন যত যেতে লাগল, তাদের সম্পর্ক তত গভীর হতে লাগল।
কিন্তু ভালোবাসার গল্পে সবসময় পথটা সহজ হয় না।
সমস্যাটা শুরু হল এক সন্ধ্যায়।
সেদিন ফাতিমা বাড়িতে গিয়েছিল বাবা–মার সাথে ডিনার করতে। অনেকদিন পর সবাই একসাথে বসে খাচ্ছিল।
হঠাৎ তার মা বললেন—
“ফাতিমা, আমরা তোমার জন্য একটা প্রস্তাব পেয়েছি।”
ফাতিমা অবাক হয়ে তাকাল।
“কিসের প্রস্তাব?”
তার বাবা শান্ত কণ্ঠে বললেন—
“বিয়ের।”
ঘরটা হঠাৎ যেন নীরব হয়ে গেল।
“ছেলেটা খুব ভালো পরিবার থেকে,” তার মা বললেন। “সে এখানে বড় ব্যবসা করে।”
ফাতিমা ধীরে ধীরে বলল—
“আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।”
তার বাবা একটু কঠিন গলায় বললেন—
“কেন?”
ফাতিমা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“কারণ আমি… কাউকে পছন্দ করি।”
তার বাবা–মা একসাথে তাকালেন।
“কে?” তার মা জিজ্ঞেস করলেন।
ফাতিমা সাহস জোগাড় করে বলল—
“আমাদের অফিসে কাজ করে। তার নাম রাকিব।”
“রাকিব?” তার বাবা ভ্রু কুঁচকে বললেন।
“সে কোথাকার?”
“বাংলাদেশের।”
কথাটা শুনেই তার বাবা মুখ শক্ত করে ফেললেন।
“অসম্ভব,” তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন।
“কেন?” ফাতিমা জিজ্ঞেস করল।
“কারণ আমরা চাই না আমাদের মেয়ে বিদেশি একজন সাধারণ কর্মচারীকে বিয়ে করুক।”
ফাতিমার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
“কিন্তু আমি তাকে ভালোবাসি,” সে বলল।
তার বাবা কঠোর গলায় বললেন—
“ভালোবাসা দিয়ে জীবন চলে না।”
সেদিন রাতে ফাতিমা নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসে অনেকক্ষণ কাঁদল।
পরের দিন অফিসে এসে রাকিব বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে।
“তুমি ঠিক আছো?” সে জিজ্ঞেস করল।
ফাতিমা চোখ নামিয়ে বলল—
“আমার পরিবার আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবে না।”
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ধীরে বলল—
“আমি জানতাম এমন হতে পারে।”
“তাহলে তুমি আমাকে বলোনি কেন?” ফাতিমা জিজ্ঞেস করল।
“কারণ আমি ভেবেছিলাম… হয়তো ভালোবাসা সবকিছু জয় করতে পারে।”
কিন্তু সমস্যাটা শুধু এখানেই শেষ হলো না।
কিছুদিন পরে রাকিব ফোন পেল তার মায়ের কাছ থেকে ঢাকা থেকে।
তার মা বললেন—
“বাবা, আমরা শুনেছি তুমি নাকি একটা বিদেশি মেয়ের সাথে ঘুরছো?”
রাকিব চুপ করে রইল।
“মা, সে খুব ভালো মেয়ে।”
তার মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“বাবা, তারা বড়লোক দেশের মানুষ। আমরা গরিব মানুষ। এই সম্পর্ক টিকবে না।”
রাকিব ধীরে বলল—
“মানুষের মূল্য কি দেশের ওপর নির্ভর করে?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তার মা শুধু বললেন—
“তুমি কষ্ট পাবে, বাবা।”
ফোনটা রেখে রাকিব অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
সেদিন সন্ধ্যায় ফাতিমা আর রাকিব আবার দেখা করল।
দুজনেই জানত—তাদের সামনে পথটা সহজ নয়।
শহরের আলো ঝলমল করছিল, কিন্তু তাদের চোখে ছিল অজানা এক অনিশ্চয়তা।
ফাতিমা ধীরে বলল—
“যদি সবাই আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়?”
রাকিব তার দিকে তাকাল।
তার চোখে ছিল গভীর দৃঢ়তা।
“তাহলে আমরা একসাথে দাঁড়াব,” সে বলল।
ফাতিমার চোখ ভিজে উঠল।
সেই মুহূর্তে তারা দুজনেই বুঝতে পারল—
ভালোবাসা শুধু হাসির গল্প নয়।
ভালোবাসা মানে লড়াইও।
আর সেই লড়াইয়ের শুরুটা হয়তো আজ থেকেই।
চলবে............