পর্ব–৫
কয়েকদিন হলো কুদ্দুছ তার ছোট ভাইয়ের বাড়িতে এসেছে।
শহরটা আগের মতোই ব্যস্ত, কিন্তু কুদ্দুছের মনটা যেন কোথাও স্থির হতে পারছে না। জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে, তবুও তার ভেতরের শূন্যতা যেন ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে।
ভাইয়ের বাড়িতে আসার উদ্দেশ্য ছিল একটু মন বদলানো। সবাই ভেবেছিল—পরিবেশ বদলালে হয়তো কুদ্দুছ কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারবে। কিন্তু মানুষের ভেতরের স্মৃতিগুলো কি এত সহজে বদলানো যায়?
সেদিন দুপুরে কুদ্দুছ বাড়ি থেকে বের হলো।
রাস্তার কোণের একটা ছোট মুদি দোকানে ঢুকল সে। দোকানটা খুব বড় নয়, কিন্তু সাজানো-গোছানো। কাঠের তাকগুলোতে ফল, সবজি, বিস্কুট আর নানা জিনিস সুন্দর করে সাজানো।
কুদ্দুছ ধীরে ধীরে ফলের তাকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
তার চোখ আপেলগুলোর দিকে গেল।
লাল, টাটকা আপেলগুলো ঝকঝক করছে।
হঠাৎ তার ঠোঁটে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
কারণ হঠাৎ করেই তার একটা কথা মনে পড়ে গেল।
লুসি আপেল খুব পছন্দ করত।
বিশেষ করে লাল আপেল। দোকানে গেলে সে নিজে হাতে অনেকক্ষণ ধরে আপেল বেছে নিত। একটা তুলে দেখত, আবার রেখে দিত, তারপর আরেকটা তুলত।
কুদ্দুছ তখন মজা করে বলত—
“এত সময় নিলে আপেলগুলো বুড়ো হয়ে যাবে।”
লুসি হেসে বলত—
“ভালো জিনিস বেছে নিতে সময় লাগে।”
সেই স্মৃতিটা মনে পড়তেই কুদ্দুছের বুকটা হালকা ব্যথায় ভরে উঠল।
ঠিক তখনই সে লক্ষ্য করল—
তার পাশে একজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছে।
সে খুব মনোযোগ দিয়ে আপেল বেছে নিচ্ছে।
একটা তুলে দেখে, আলতো করে ঘুরিয়ে দেখে, আবার অন্যটা হাতে নিচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখে কুদ্দুছের মুখে আবার হাসি ফুটল।
অদ্ভুত ব্যাপার।
ঠিক একইভাবে আপেল বাছত লুসিও।
কিন্তু হঠাৎ—
কুদ্দুছ যেন থমকে গেল।
তার চোখ আটকে গেল সেই তরুণীর গলার দিকে।
সেখানে একটা লকেট ঝুলছে।
একটা রূপার লকেট।
মাঝখানে ছোট একটা সবুজ পাথর।
কুদ্দুছের বুকের ভেতর হঠাৎ ধক করে উঠল।
সে চোখ কুঁচকে আরও ভালো করে তাকাল।
হ্যাঁ—
একই লকেট।
একই চেইন।
এমনকি পাথরের পাশে ছোট্ট একটা আঁচড়ও আছে।
কুদ্দুছের শরীর কেঁপে উঠল।
এই লকেটটা সে খুব ভালো করেই চেনে।
কারণ এটা সে নিজেই কিনেছিল।
লুসির জন্য।
তাদের পঞ্চম বিবাহবার্ষিকীর দিন।
সেই দিনটার কথা হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
সেদিন সন্ধ্যায় কুদ্দুছ লুসিকে নিয়ে নদীর ধারে গিয়েছিল।
ছোট একটা বাক্স বের করে বলেছিল—
“তোমার জন্য একটা ছোট উপহার।”
লুসি কৌতূহলী চোখে বাক্সটা খুলেছিল।
ভেতরে এই রূপার লকেটটা ছিল।
মাঝখানে সবুজ পাথরটা আলোয় ঝলমল করছিল।
লুসির চোখ আনন্দে ভরে উঠেছিল।
সে বলেছিল—
“এটা খুব সুন্দর।”
কুদ্দুছ মজা করে বলেছিল—
“পছন্দ না হলে বদলে দেব।”
লুসি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলেছিল—
“না, এটা আমি কখনো খুলব না।”
সত্যিই সে কখনো খুলেনি।
কুদ্দুছ বহুবার দেখেছে—লুসি সেই লকেটটা সবসময় গলায় পরে থাকে।
দুর্ঘটনার দিনটাতেও সেই লকেটটার কথা কুদ্দুছের মনে পড়েছিল।
কারণ সে জানত—লুসি এটা ছাড়া কোথাও যায় না।
আজ এত বছর পর—
ঠিক একই লকেটটা অন্য কারও গলায়।
কুদ্দুছের হৃদয় ধড়াস ধড়াস করে উঠল।
এটা কীভাবে সম্ভব?
মাথার ভেতর যেন ঝড় বইতে লাগল।
তার শরীর কাঁপছিল।
অস্বস্তি লাগছিল, কিন্তু সে নিজেকে থামাতে পারল না।
সত্যিটা জানতে হবেই।
কুদ্দুছ ধীরে ধীরে সেই তরুণীর কাছে এগিয়ে গেল।
তার কণ্ঠস্বর যেন একটু কাঁপছিল।
সে ভদ্রভাবে বলল—
“ক্ষমা করবেন… আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত।”
তরুণীটি একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
কুদ্দুছ ধীরে বলল—
“আপনি কি বলতে পারবেন… ওই লকেটটা কোথা থেকে পেয়েছেন?”
তরুণী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর আলতো করে লকেটটায় হাত বুলিয়ে দিল।
তার চোখে যেন হালকা এক স্মৃতির ছায়া।
সে শান্ত গলায় বলল—
“এটা আমার মায়ের ছিল।”
কুদ্দুছ যেন স্থির হয়ে গেল।
তার বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।
মায়ের?
মানে—
এই মেয়েটার মা?
কুদ্দুছের মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।
সে ধীরে জিজ্ঞেস করল—
“আপনার… মায়ের?”
তরুণী মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
সে একটু হাসল।
“আমি ছোটবেলা থেকেই এটা দেখছি। মা সবসময় এটা পরতেন।”
কুদ্দুছের গলা শুকিয়ে গেল।
সে সাবধানে আবার প্রশ্ন করল—
“আপনার মা এখন কোথায়?”
তরুণী একটু থেমে বলল—
“তিনি অনেক বছর আগে হারিয়ে গেছেন।”
এই কথাটা শুনে কুদ্দুছের বুক যেন থেমে গেল।
তার চোখ বড় হয়ে গেল।
মনে হচ্ছিল—পুরো পৃথিবীটা যেন হঠাৎ ঘুরতে শুরু করেছে।
তরুণী আবার বলল—
“আমি তখন খুব ছোট ছিলাম।”
সে একটু দুঃখের হাসি দিল।
“মা হঠাৎ একদিন নিখোঁজ হয়ে গেলেন। তারপর আর কখনো ফিরে আসেননি।”
কুদ্দুছের হাত কাঁপছিল।
তার মনে হচ্ছিল—সে যেন কোনো স্বপ্নের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে।
সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল—
“আপনার মায়ের নাম… কী ছিল?”
তরুণী একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে বলল—
“লুসি।”
কুদ্দুছের চোখে যেন হঠাৎ অন্ধকার নেমে এলো।
তার বুকের ভেতর বজ্রপাতের মতো শব্দ হলো।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
মনে হচ্ছিল—বিশ বছর আগের সেই রহস্য হঠাৎ করে আবার তার সামনে দাঁড়িয়ে গেছে।
কুদ্দুছের ঠোঁট কাঁপছিল।
সে শুধু মনে মনে বলল—
“লুসি… তাহলে তুমি কোথায়?”
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়েটা—
সে কি তবে…
লুসির মেয়ে?
রহস্য আরও ঘন হয়ে উঠল।
কুদ্দুছ জানে না সামনে কী আছে।
কিন্তু সে বুঝতে পারছে—
বিশ বছর আগের হারিয়ে যাওয়া গল্পটা আবার শুরু হয়েছে। চলবে...............