পর্ব–৬
গলির বাতাস হঠাৎ করেই ঠান্ডা হয়ে উঠল। মুদি দোকানের ব্যস্ত কোলাহল যেন এক মুহূর্তের জন্য মৃদু গুঞ্জন হয়ে মিলিয়ে গেল। কুদ্দুছের চোখের সামনে তরুণীটি দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রতিটি অভিব্যক্তি যেন তার হৃদয়ের রেশকে স্পর্শ করছে।
তিনি উনিশ বছরের বেশি বয়সী হতে পারে না, কুদ্দুছ মনে মনে বলল। তার চোখে সেই চমকপ্রদ অ্যাম্বারের ছটা, যা লুসির চোখে ছিল—একই উজ্জ্বলতা, একই প্রাণবন্ত ভাসা। তবে চুলগুলো ছিল আরও কালো, ওভাবে পিছনে বাঁধা যা লুসি কখনোই করত না।
কুদ্দুছ গলার স্বর নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করল। শব্দগুলো কষ্টসাধ্যভাবে বের হয়ে এল—
“তোমার মা?… তার… তার নাম কী?”
মেয়েটি মাথা কাত করল। চোখে সতর্ক কৌতূহলের ঝলক দেখা গেল।
“তার নাম সারা। তুমি কেন জিজ্ঞেস করছ? তুমি কি তাকে চেনো?”
কুদ্দুছের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ঘুমন্ত ব্যথা জেগে উঠল। সারা। লুসি নয়।
“আমি… আমার মনে হয় অনেক দিন আগে আমি তাকে চিনতাম,” কুদ্দুছ মিথ্যে বলল, যেন নিজের ভেতরের এক অজানা আকাঙ্ক্ষা তাকে এমন কথা বলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে কোনো ঘটনা ঘটলে সারা হয়তো লুসি হতে পারে।
“সে এখানে? শহরে?” কুদ্দুছের কণ্ঠে ব্যাকুলতা।
মেয়েটি চোখের এক অদ্ভুত সতর্কতা দেখাল। সে ঝুড়িটা অন্য হাতে সরিয়ে নিল।
“দেখুন, আমার সত্যিই এখন যেতে হবে।”
কুদ্দুছ এক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে রইল। তার হৃদয় যেন ভেঙে পড়ছে।
“একটু অপেক্ষা করুন, প্লিজ।”
তার হাত অচেতনভাবে ওয়ালেটের দিকে গিয়ে ছবিটা বের করল। ঝরঝরে হয়ে যাওয়া সেই ছবি, যা কুদ্দুছ দুই দশক ধরে সঙ্গে রেখেছিল। সমুদ্র সৈকতে হাসিমাখা লুসি, গলার রূপালী লকেট ঝলমল করছে, চোখে উজ্জ্বলতা।
মেয়েটি ছবি দেখল। প্রথমে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কেবল চোখগুলো ছোট ছোট আন্দোলনে ভিজছে। কুদ্দুছ দেখল—মেয়েটির মুখ যেন রক্ত জমে গেল, স্নায়ুগুলো যেন হঠাৎ থমকে গেছে।
এক দীর্ঘ মুহূর্ত নীরবতার পর সে ফিসফিস করল—
“ওই তো আমার মা। কিন্তু… তিনি আমাকে বলেছিলেন তার আর কোনো পরিবার নেই। তিনি বলেছিলেন তার ‘আগের জীবন’ থেকে সবাই চলে গেছে।”
কুদ্দুছের হৃদয় ধক করে উঠল। দু'দশক ধরে যা স্বপ্ন দেখেছিল, তা যেন চোখের সামনে বিস্ফোরিত হয়ে এসেছে। লুসি। সে বেঁচে আছে, কিন্তু এত বছর ধরে তার জীবনটা আলাদা পথে গিয়েছে।
কুদ্দুছ নীরব হয়ে রইল। মুখে কোনো শব্দ নেই, চোখ ভিজে গেছে। মনে হচ্ছিল—সমস্ত পৃথিবী হঠাৎ থেমে গেছে।
শহরের রোদ, বাতাস, গাড়ির শব্দ—সব মিলিয়ে এক মুহূর্তের জন্য নিঃশব্দ। শুধু সেই তরুণী, সেই লকেট, এবং কুদ্দুছের ভেতরের উদ্দাম অনুভূতির ধ্বনি বাকি।
সারা ধীরে বলল—
“আমি ছোটবেলা থেকে এই লকেট নিয়ে বড় হয়েছি। মা সবসময় এটা পরতেন। আমি কখনোও তাকে সত্যি দেখিনি, কিন্তু এই লকেটের গল্প শুনেছি বারবার।”
কুদ্দুছ ভেতরে থেকে কেঁপে উঠল। সে বুঝতে পারল—লুসি, তার হারানো লুসি, এই নগরীর কোনো এক অজানা পথে বেঁচে আছেন। তিনি তার জন্য স্বরূপ পরিবর্তন করেছেন, জীবনকে অন্যভাবে সাজিয়েছেন, কিন্তু কোনো কারণে নিজের পরিচয় লুকিয়েছেন।
“সে… ঠিক কোথায়?” কুদ্দুছ বিনম্রভাবে জিজ্ঞেস করল, চোখে আর্দ্রতা।
সারা ফিসফিস করে বলল—
“সে আমার কাছে এই সব জানাতে চায়নি। বলতে চেয়েছে, তার ‘আগের জীবন’ থেকে সবাই চলে গেছে। আমি… আমি শুধু এই লকেটের মাধ্যমে তাকে চিনতে পেরেছি।”
কুদ্দুছের হৃদয় হাহাকার করল। সে অনুভব করল—বিশ বছর ধরে যে ব্যথা, যে অপেক্ষা, যে নিঃশ্বাসের অবসান—সবই এখন শেষের দিকে এসে দাঁড়িয়েছে। লুসি বেঁচে আছেন। কিন্তু তিনি নিজের জীবনকে এতদিন আলাদা রেখেছেন।
কুদ্দুছ ধীরে ধীরে ছবিটা নিজের কাছে আঁকড়ে ধরল। চোখে জল। মনে মনে বলল—
“লুসি… তুমি এখানে আছ, অথচ এতকাল কেমন করে হারিয়েছিলে? এত বছর কীভাবে কাটিয়েছ?”
সারা কিছুই বলল না। কেবল চোখে জল এবং লকেটের উজ্জ্বলতা।
দোকানের বাতাস হঠাৎ যেন ঠান্ডা হয়ে গেল। কুদ্দুছ এক মুহূর্তের জন্য নিজের সত্তা হারাতে বসল। মনে হল—সমস্ত সময়, সমস্ত ব্যথা, সমস্ত নিঃশ্বাস—সবই এই মুহূর্তের জন্য।
তরুণীর ঝুড়ির শব্দ ধীরে ধীরে নিভে গেল। কুদ্দুছ স্থির হয়ে দাঁড়াল, চোখে অশ্রু, হৃদয় যেন নতুন জীবনের জন্য উদগ্রীব।
সে জানে না—এই খোঁজ তাকে কোথায় নিয়ে যাবে। লুসি কীভাবে ফিরে আসবেন? তাদের পুনর্মিলনের মুহূর্ত কীভাবে হবে?
তবুও কুদ্দুছ অনুভব করল—এই যাত্রার শেষ নয়।
একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। লুসির জীবন, তার নিজের হৃদয়—সব কিছু এখন নতুন আঙ্গিকে সামনে এসেছে।
কুদ্দুছ ধীরে ধীরে তার চোখ বন্ধ করল। মনে মনে বলল—
“লুসি, আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি। এখন, তোমাকে আবার হারাব না। কখনো নয়।”
মুহূর্তের জন্য দোকানের গলির শব্দ ম্লান হয়ে গেল। বাতাস নীরব। শুধু কুদ্দুছের হৃদয় এবং লুসির স্মৃতির নরম আলো।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে কুদ্দুছ ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। চোখে অশ্রু, হৃদয়ে এক অজানা শান্তি।
এখন যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তা শেষ হবে কেবল তখনই, যখন লুসি আবার তার সামনে দাঁড়াবেন, পুরনো স্মৃতি আর নতুন জীবনের মেলবন্ধনে। চলবে…