ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৩:০৭:১৮ PM

উপন্যাস: “বিয়ে”

মান্নান মারুফ
13-03-2026 11:48:51 AM
উপন্যাস: “বিয়ে”

পর্ব–

সকালটা ছিল নরম আলোয় ভেজা। জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের মৃদু রোদ এসে পড়ছিল ছোট্ট ঘরের মেঝেতে। বাইরে পাখির ডাক, দূরে কোনো এক বাড়ির উঠোনে ঝাড়ু দেওয়ার শব্দ—সব মিলিয়ে এক শান্ত, মায়াময় সকাল।

ছোট্ট রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ফাতিমা ডিম ভুনা বানাচ্ছিল। পেঁয়াজ কুচি, কাঁচামরিচ আর সামান্য হলুদের গন্ধে পুরো ঘরটা ভরে গেছে। রান্নাঘরের চুলার আগুনে তার মুখটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

এই দেশ তার নিজের দেশ নয়।
এই ঘরও একসময় তার ছিল না।

তবু এখন মনে হয়—এই ছোট্ট রান্নাঘরই যেন তার পৃথিবী।

ফাতিমা আলতো করে কড়াই নাড়তে নাড়তে একটু হাসল।
সে এখন ডিম ভুনা বানাতে শিখে গেছে ঠিক বাংলাদেশি স্টাইলে। প্রথম প্রথম ভুল করত। কখনো লবণ বেশি, কখনো মরিচ কম। তখন রাকিব মজা করে বলত—

সৌদি স্টাইলের ডিম ভুনা নাকি?”

সেই কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটে আবার হাসি ফুটল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে দুটো উষ্ণ হাত তাকে জড়িয়ে ধরল।

রাকিব।

হঠাৎ এই স্পর্শে ফাতিমা একটু চমকে উঠল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সে বুঝে গেল কে এসেছে।

রাকিব তার কাঁধে মুখ রেখে নরম গলায় বলল—
তুমি আমার জন্য সব ছেড়ে দিয়েছো। আমি কীভাবে তোমাকে শোধ করব?”

ফাতিমা ধীরে ধীরে ঘুরে তার দিকে তাকাল। তার চোখে যেন অদ্ভুত এক কোমলতা। সেই চোখের কোণায় চিকচিক করছে জল।

সে মৃদু স্বরে বলল—

তুমি আমাকে ভালোবাসো। এটাই আমার সবচেয়ে বড় শোধ। আমি সৌদি আরবের মেয়ে… কিন্তু তোমার সাথে থাকলে আমার দেশ যেন বাংলাদেশ হয়ে যায়।”

কথাটা বলার পর তার চোখ থেকে নীরবে একটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।

রাকিব চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন ভারী হয়ে উঠল।

এই মেয়েটা সত্যিই তার জন্য সবকিছু ছেড়ে এসেছে।
নিজের দেশ, পরিবার, বিলাসী জীবন—সবকিছু।

আর এখন সে আছে এই ছোট্ট বাড়িতে, একটা সাধারণ জীবনে।

রাকিব আলতো করে তার চোখের পানি মুছে দিল।

কাঁদছো কেন?” সে ফিসফিস করে বলল।

ফাতিমা হালকা হাসল।

কাঁদছি না… সুখে মানুষ কখনো কখনো কাঁদে।”

রাকিব তাকে বুকের কাছে টেনে নিল।

এই ছোট্ট রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে যেন তাদের দুজনের পৃথিবীটা আরও একটু কাছাকাছি এসে গেল।

কিছুক্ষণ পর তারা দুজন টেবিলে বসে নাস্তা করছিল।

রাকিব ডিম ভুনা মুখে দিয়েই হেসে উঠল।

ওহ! আজ তো একদম পারফেক্ট হয়েছে!”

ফাতিমা গর্বের সাথে বলল—
আমি কিন্তু এখন পুরো বাংলাদেশি রান্না শিখে ফেলছি।”

তা তো দেখতেই পাচ্ছি।”

এই ছোট্ট হাসি–মজার মধ্যেই যেন তাদের সংসারটা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল।

কিন্তু জীবনের গল্প কখনোই পুরোপুরি সহজ হয় না।

সেদিন বিকেলে হঠাৎ একটা ফোন এল।

ফোনটা ছিল সৌদি আরব থেকে।

ফাতিমার বাবার।

ফোন ধরতেই ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর ভারী কণ্ঠে তার বাবা বললেন—

ফাতিমা… তুমি কি সত্যিই সুখে আছো?”

এই প্রশ্ন শুনে ফাতিমার বুকটা কেঁপে উঠল।

সে জানে—তার বাবা এখনো এই বিয়েটা মেনে নিতে পারেননি।

অনেকদিন ধরে তাদের মধ্যে দূরত্ব।

ফাতিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল—

হ্যাঁ বাবা… আমি খুব সুখে আছি।”

ওপাশে আবার নীরবতা।

তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস।

তুমি জানো… আমরা তোমাকে খুব মিস করি।”

এই কথাটা শুনে ফাতিমার চোখ আবার ভিজে উঠল।

সে জানালার দিকে তাকাল।

এই দেশের আকাশটা আজ খুব পরিষ্কার।

কিন্তু তার বুকের ভেতরটা যেন মেঘে ঢেকে যাচ্ছে।

আমিও তোমাদের খুব মিস করি বাবা…” সে ফিসফিস করে বলল।

ফোনটা কেটে যাওয়ার পর সে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

রাকিব দূর থেকে সব দেখছিল।

সে এগিয়ে এসে নরম গলায় বলল—

বাড়ির কথা মনে পড়ছে?”

ফাতিমা মাথা নাড়ল।

হ্যাঁ… একটু।”

রাকিব তার হাতটা শক্ত করে ধরল।

চাইলে আমরা একদিন সৌদি আরব যেতে পারি। তোমার পরিবারকে দেখতে।”

ফাতিমা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

সত্যি?”

হ্যাঁ। আমি চাই না তুমি আমার জন্য তোমার পরিবারকে হারাও।”

এই কথাটা শুনে ফাতিমার বুকটা হঠাৎ ভরে উঠল।

সে বুঝল—এই মানুষটা শুধু তাকে ভালোবাসে না, তার সমস্ত অনুভূতিকেও সম্মান করে।

ফাতিমা ধীরে ধীরে রাকিবের কাঁধে মাথা রাখল।

তুমি জানো… আমি কেন তোমাকে বিয়ে করেছি?”

রাকিব মুচকি হেসে বলল—

কারণ আমি খুব সুদর্শন?”

ফাতিমা হেসে ফেলল।

না… কারণ তুমি মানুষের হৃদয় বুঝতে পারো।”

ঘরের ভেতর তখন সন্ধ্যার নরম আলো।

জানালার বাইরে আকাশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে।

দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি ভেসে এল।

সেই ধ্বনির মধ্যে যেন তাদের জীবনের গল্পটাও নতুন করে শুরু হলো।

দুজন মানুষ—
দুই ভিন্ন দেশ থেকে আসা।
দুই ভিন্ন সংস্কৃতি।

তবু তাদের ভালোবাসা যেন সব দূরত্বকে ছোট করে দিয়েছে।

রাকিব জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল—

জানো ফাতিমা… আমি কখনো ভাবিনি আমার জীবনে এমন কিছু ঘটবে।”

কেমন কিছু?”

একদিন একটা সৌদি মেয়ে আমার রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ডিম ভুনা বানাবে… আর বলবে বাংলাদেশই তার দেশ।”

ফাতিমা মৃদু হাসল।

ভালোবাসা মানুষকে বদলে দেয়।”

রাকিব তার দিকে তাকিয়ে বলল—

আর তুমি আমাকে সম্পূর্ণ করে দিয়েছো।”

রাত ধীরে ধীরে নেমে এলো।

ছোট্ট ঘরের আলো জ্বলে উঠল।

রান্নাঘরে আবারও ভেসে আসছে মসলার গন্ধ।

এই ছোট্ট সংসারে হয়তো বড় কোনো বিলাসিতা নেই।

কিন্তু আছে কিছু অমূল্য জিনিস—
ভালোবাসা, ত্যাগ, আর একে অপরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস।

ফাতিমা জানে—তার জীবনের পথ সহজ হবে না।

কখনো পরিবারকে মিস করবে।
কখনো অতীত মনে পড়বে।

কিন্তু তারপরও সে নিশ্চিত—

এই মানুষটার হাত ধরে থাকলে পৃথিবীর যেকোনো জায়গাই তার কাছে বাড়ি হয়ে যাবে।

রাতের নিস্তব্ধতায় রাকিব ফাতিমার হাতটা শক্ত করে ধরল।

ফাতিমা…”

হুম?”

ধন্যবাদ… আমার জীবনে আসার জন্য।”

ফাতিমা মৃদু হেসে বলল—

ধন্যবাদ তোমাকেও… আমাকে ভালোবাসার জন্য।”

বাইরে তখন আকাশ ভরা তারা।

আর সেই তারাভরা আকাশের নিচে, ছোট্ট একটি ঘরে—
দুজন মানুষের ভালোবাসার গল্প ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠছে।

চলবে…