পর্ব–৫
“অনেক অপরিচিত ছিলে, তবুও আজ সবচেয়ে আপন তুমি,
এই অদ্ভুত ভালোবাসায় হারিয়ে যেতে চাই প্রতিদিন আমি।”
নেহা ডায়েরির পাতায় লাইন দুটো লিখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। শব্দগুলো যেন আজ আর শুধু কবিতা নয়—তার জীবনের বাস্তব অনুভূতি। একসময় যে মানুষটা তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল, সেই আরিয়ান আজ তার প্রতিদিনের চিন্তা, প্রতিটি অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
বিকেলের নরম আলো জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছে। বাইরে হালকা বাতাসে গাছের পাতা দুলছে, আর সেই সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেহার মনও যেন ভেসে যাচ্ছে অজানা এক আবেগে।
গত কয়েক সপ্তাহ যেন স্বপ্নের মতো কেটেছে।
আরিয়ানের সঙ্গে আবার নতুন করে শুরু—এটা প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। চার বছরের দূরত্ব, অভিমান, না বলা কথা—সবকিছু পেরিয়ে তারা আবার একসাথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এবার সবকিছু ধীরে, সতর্কভাবে, যেন কোনো ভঙ্গুর কাঁচের মতো এই সম্পর্কটাকে তারা আগলে রাখছে।
“নেহা, আজ বিকেলে সময় হবে?”
মেসেজটা আসে হঠাৎই।
নেহা ফোনটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসে।
“হবে। কোথায় দেখা করবো?”
সে রিপ্লাই করে।
“পুরোনো সেই কফিশপে।”
এই ছোট্ট মেসেজেই নেহার মনে এক অদ্ভুত আনন্দের ঢেউ ওঠে। সেই কফিশপ—যেখানে তারা একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছে, কথা না বলেও অনেক কথা বলে ফেলেছে।
বিকেল পাঁচটার একটু আগেই নেহা পৌঁছে যায়। কফিশপটা আগের মতোই আছে—একটু পুরোনো, কিন্তু খুব আপন। দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো, হালকা সুরের গান—সবকিছু যেন স্মৃতিকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
আরিয়ান আগেই এসে বসে আছে। তাকে দেখে নেহার মনে হয়—সময় অনেক কিছু বদলালেও কিছু জিনিস ঠিক আগের মতোই থাকে।
“হাই,” নেহা আস্তে বলে।
“হাই,” আরিয়ান হেসে ওঠে। “তুমি আগের মতোই সময় মেনে চল।”
নেহা মুচকি হাসে।
“আর তুমি আগের মতোই আগে এসে বসে থাকো।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। কিন্তু এই নীরবতা আর অস্বস্তিকর নয়—বরং এতে এক ধরনের স্বস্তি আছে।
“কেমন আছো?”
আরিয়ান জিজ্ঞেস করে।
“ভালো,” নেহা বলে, “তুমি?”
“আজকাল ভালো থাকার কারণ খুঁজে পাই,” আরিয়ান উত্তর দেয়।
নেহা একটু অবাক হয়ে তাকায়।
“কারণটা কি?”
আরিয়ান সরাসরি তার চোখের দিকে তাকায়।
“তুমি।”
নেহার গাল হালকা লাল হয়ে ওঠে।
এই সরল স্বীকারোক্তি, কোনো ঘুরপথ নয়—এটাই যেন নতুন আরিয়ান।
“জানো,” আরিয়ান আবার বলে,
“আমি আগে ভাবতাম ভালোবাসা মানেই অনেক বড় কিছু। কিন্তু এখন বুঝি—ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আসল।”
“যেমন?”
নেহা জানতে চায়।
“যেমন তোমার সঙ্গে এই সময়টা কাটানো, তোমার হাসি দেখা, কিংবা শুধু চুপ করে বসে থাকা,” আরিয়ান বলে।
নেহা ধীরে মাথা নাড়ে।
“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো।”
কফির কাপ এসে যায়। দুজনেই চুপচাপ কফিতে চুমুক দেয়।
“নেহা,” আরিয়ান একটু গম্ভীর হয়ে বলে,
“আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।”
“কি?”
“তুমি কি এখনো ভয় পাও?”
নেহা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। প্রশ্নটা সহজ নয়।
“পাই,” সে ধীরে বলে,
“ভয় পাই আবার সবকিছু হারানোর।”
আরিয়ান তার হাতটা আলতো করে ধরে।
“আমি এবার তোমাকে হারাতে দেবো না।”
নেহা তার দিকে তাকায়।
“প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, আরিয়ান। রাখা কঠিন।”
“আমি জানি,” আরিয়ান বলে,
“তাই এবার কথা নয়, কাজ দিয়ে প্রমাণ করতে চাই।”
এই কথাটা নেহার মনে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
সময়টা ধীরে ধীরে গড়িয়ে যায়। তারা অনেক কথা বলে—পুরোনো স্মৃতি, নতুন স্বপ্ন, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
হঠাৎ আরিয়ান বলে—
“চলো, একটু বাইরে হাঁটি।”
কফিশপ থেকে বের হয়ে তারা পাশের রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে, চারপাশে হালকা আলো।
“নেহা,” আরিয়ান আবার বলে,
“তুমি কি কখনো ভেবেছো, যদি আমরা তখন আলাদা না হতাম, তাহলে এখন আমাদের জীবন কেমন হতো?”
নেহা হালকা হাসে।
“হয়তো ভালো হতো, আবার হয়তো খারাপও হতে পারতো।”
“কেন?”
“কারণ আমরা তখন এতটা পরিণত ছিলাম না,” নেহা বলে,
“এই সময়টা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে।”
আরিয়ান মাথা নাড়ে।
“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর নেহা বলে—
“তবে একটা কথা সত্যি।”
“কি?”
“আমি কখনো তোমাকে ভুলতে পারিনি।”
আরিয়ান থেমে যায়।
“আমিও না,” সে আস্তে বলে।
তাদের চোখাচোখি হয়।
এই মুহূর্তে যেন চারপাশের সবকিছু থেমে গেছে।
“নেহা…”
আরিয়ান ধীরে বলে,
“আমি কি তোমার হাতটা ধরতে পারি?”
নেহা মুচকি হাসে।
“তুমি তো ধরেই রেখেছো।”
দুজনেই হেসে ওঠে।
এই হাসির মধ্যে নেই কোনো চাপ, নেই কোনো ভয়—শুধু আছে স্বস্তি আর ভালোবাসা।
রাত হয়ে যায়। নেহা বাসায় ফিরে আসে।
ঘরে ঢুকে সে আবার ডায়েরিটা খুলে।
আজকের দিনটা যেন তার জীবনের একটা নতুন অধ্যায়।
সে লিখতে শুরু করে—
“আজ বুঝতে পারলাম, ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না।
এটা শুধু সময়ের সাথে বদলে যায়, গভীর হয়, আর একসময় আবার ফিরে আসে নতুন রূপে।”
নেহা কলম থামিয়ে কিছুক্ষণ ভাবে।
তারপর আবার লেখে—
“আরিয়ান, তুমি একসময় আমার জীবনের অসমাপ্ত গল্প ছিলে।
কিন্তু আজ তুমি আমার নতুন শুরু।”
তার চোখে হালকা জল এসে যায়, কিন্তু এই জল কষ্টের নয়—এটা আনন্দের।
ফোনটা আবার বেজে ওঠে।
আরিয়ানের মেসেজ—
“আজকের দিনটার জন্য ধন্যবাদ। অনেকদিন পর সত্যি হাসলাম।”
নেহা রিপ্লাই করে—
“আমিও।”
কিছুক্ষণ পর আরেকটা মেসেজ—
“আমি প্রতিদিন তোমার সঙ্গে এমন মুহূর্ত কাটাতে চাই।”
নেহা ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরে।
“আমিও চাই,” সে মনে মনে বলে।
জানালার বাইরে তাকিয়ে সে দেখে—আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছে।
এই বিশাল আকাশের নিচে, কোটি কোটি মানুষের মাঝে—দুজন মানুষ আবার একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে।
হয়তো এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর দিক—
যত দূরেই যাওয়া হোক, সত্যিকারের অনুভূতি একদিন ঠিক ফিরে আসে।
নেহা চোখ বন্ধ করে।
তার মনে হয়—
এই অদ্ভুত ভালোবাসায় হারিয়ে যেতে পারলে, প্রতিদিনই যেন নতুন করে বাঁচা যায়।
আর সে প্রস্তুত—
এই ভালোবাসার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে।
(চলবে…)