ঢাকা, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৫:৩৫:২৩ PM

উপন্যাস: পত্রদিও

মান্নান মারুফ
25-03-2026 03:24:16 PM
উপন্যাস: পত্রদিও

শেষ পর্ব

ভালবাসা খুন হয়েছে কুদ্দুছের —কি আসে যায়? এক জীবনে কতটা আর নষ্ট হবে? সেই তো পত্র আসলো না…
কিন্তু কুদ্দুছ শয্যাশায়ী। হয়তো চিঠি আসবে কুদ্দুছের কাছে। কিন্তু কি আছে সে চিঠিতে—তা হয়তো দেখতে পারবে না। কুদ্দুছ এখন জীবিত থেকেও মৃত্যু। সে নিজেও জানে না—জীবিত না মৃত। কুদ্দুছের জ্ঞান নেই। সে চলে যাচ্ছে ওপারে। পরপারেরও নেহার চিঠির অপেক্ষায় থাকবে কুদ্দুছ।

ঘরটা অন্ধকার নয়, তবুও আলো নেই।

জানালার পাশে পর্দা অর্ধেক সরে আছে। বিকেলের আলো ঢুকে বিছানার এক কোণে পড়ে আছে—যেন কোনো পুরনো স্মৃতির মতো, মলিন অথচ স্থির।

সেই বিছানায় শুয়ে আছে কুদ্দুছ।

চোখ বন্ধ, নিঃশ্বাস ধীর, শরীর নিস্তেজ। যেন জীবনের সমস্ত শব্দ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।

কেউ যদি বাইরে থেকে দেখে, মনে হবে—সে শুধু ঘুমাচ্ছে। কিন্তু ভেতরের গল্পটা অন্যরকম।

সে এখন এক অদ্ভুত অবস্থায় আছে—জীবন আর মৃত্যুর মাঝামাঝি কোথাও।

ডাক্তাররা বলেছে—“অবস্থা ভালো না।”

কিন্তু কেউ জানে না—কুদ্দুছের ভেতরে এখনো একটা অপেক্ষা বেঁচে আছে।

একটা চিঠির অপেক্ষা।

নেহার চিঠি।

শেষ কয়েকটা দিন কুদ্দুছ আর ঠিকভাবে কথা বলতে পারছিল না।

কিন্তু তার চোখে একটা অদ্ভুত খোঁজ ছিল।

যে কেউ কাছে এলেই সে তাকাত—যেন কিছু বলতে চায়।

কিন্তু শব্দ বের হতো না।

একদিন বিকেলে তার পুরনো বন্ধু এসে বসেছিল পাশে।

—“কুদ্দুছ, কিছু বলতে চাস?”

কুদ্দুছ খুব কষ্ট করে ঠোঁট নাড়াল।

শব্দটা ঠিক বের হলো না, কিন্তু বোঝা গেল—

“চিঠি…”

বন্ধুটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল—
“আসবে… নিশ্চয়ই আসবে…”

এই আশ্বাসটা হয়তো মিথ্যা ছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয়।

কারণ, কুদ্দুছ এখন শুধু সেই আশ্বাসেই বেঁচে আছে।

রাতগুলো সবচেয়ে দীর্ঘ হয়ে উঠেছে।

ঘরের নীরবতা এত গভীর যে, মনে হয় সময়ও থেমে গেছে।

কুদ্দুছ মাঝে মাঝে আধোচোখ খুলে তাকায়।

তার মনে হয়—নেহা হয়তো পাশে বসে আছে।

সে ফিসফিস করে—
“এসেছো?”

কিন্তু কোনো উত্তর আসে না।

শুধু বাতাস।

একদিন ভোরবেলা হঠাৎ করে কুদ্দুছের নিঃশ্বাস একটু ভারী হয়ে উঠল।

তার বুক ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে।

চোখ আধখোলা।

সে যেন কিছু দেখতে পাচ্ছে।

তার চোখের দৃষ্টি জানালার বাইরে—আকাশের দিকে।

হয়তো সে কিছু খুঁজছে।

হয়তো কাউকে।

তার ঠোঁট একটু কাঁপল।

একটা শব্দ বের হলো—

“নেহা…”

ঘরে কেউ ছিল না।

তবুও সেই ডাকটা যেন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।

ঠিক সেই সময়—

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।

টোক… টোক…

বাড়ির এক সদস্য দরজা খুলল।

বাইরে একজন পোস্টম্যান।

হাতে একটা খাম।

—“কুদ্দুছ সাহেবের জন্য…”

খামটা হাতে নেওয়া হলো।

সাদা খাম।

পরিচিত হাতের লেখা।

নেহা।

ঘরের ভেতরে তখন সময় যেন থেমে গেছে।

কুদ্দুছের নিঃশ্বাস আরও ধীর।

তার চোখ স্থির হয়ে আসছে।

হাতটা নিস্তেজ।

কেউ বুঝতে পারছে—শেষ সময়।

কেউ বলছে—
“ডাক্তার ডাকো…”

কেউ বলছে—
“পানি দাও…”

কিন্তু কুদ্দুছ যেন আর এই পৃথিবীর শব্দ শুনতে পাচ্ছে না।

খামটা খুলে দেখা হলো।

ভেতরে একটা চিঠি।

নেহার লেখা।

কিন্তু—

কুদ্দুছ আর পড়তে পারল না।

তার শেষ নিঃশ্বাসটা খুব শান্ত ছিল।

কোনো কষ্ট নেই, কোনো তাড়াহুড়া নেই।

শুধু এক ধরনের মুক্তি।

যেন অনেকদিনের অপেক্ষা শেষে সে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

চিঠিটা পড়ে শোনানো হলো।

কিন্তু সে আর শুনতে পেল না।

তবুও—

চিঠির শব্দগুলো যেন বাতাসে ভেসে তার কাছে পৌঁছাল।

“কুদ্দুছ,
জানি না তুমি এই চিঠি পাবে কিনা…
আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি…

তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করতে—আমি ভালো আছি কিনা।
আজ বলি—ভালো নেই।

তোমাকে ছাড়া ভালো থাকা শেখা হয়নি।

আমি সবসময় ভেবেছি—সময় ঠিক করে দেবে।
কিন্তু সময় শুধু দূরত্ব বাড়িয়েছে।

তুমি যদি কখনো এই চিঠি পড়ো—
জানবে, আমি তোমাকে ভালোবাসতাম।
এখনো বাসি।

হয়তো এই ভালোবাসার কোনো ঠিকানা নেই,
তবুও এটা সত্যি।

তুমি যেখানে থাকো—ভালো থেকো…
আর যদি পারো—
আমার জন্য একবার অপেক্ষা কোরো…”

চিঠির শব্দগুলো শেষ হলো।

ঘরে নীরবতা।

কেউ কথা বলছে না।

শুধু কুদ্দুছের নিথর শরীরটা শুয়ে আছে।

তার মুখে এক অদ্ভুত শান্তি।

যেন সে তার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছে।

বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।

আকাশে একে একে তারা জ্বলছে।

হালকা বাতাস বইছে।

কেউ জানে না—এই বাতাসে কি কোনো বার্তা আছে কিনা।

কেউ জানে না—ওপারে গিয়ে কুদ্দুছ কি নেহার চিঠিটা পড়তে পেরেছে কিনা।

কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত—

সে অপেক্ষা থামায়নি।

এই পৃথিবীতে যেমন অপেক্ষা করেছে,
ওপারেও তেমনই করবে।

একটা চিঠির জন্য।

একটু ভালোবাসার জন্য।

কুদ্দুছের জীবনের গল্প শেষ হলো।

কিন্তু তার অপেক্ষা শেষ হলো না।

কারণ—

কিছু ভালোবাসা মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে।

নীরবে।

অদৃশ্যভাবে।

অপেক্ষায়।

।। সমাপ্ত ।।