ঢাকা, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৫:৪০:১১ PM

উপন্যাস: পত্র দিও

মান্নান মারুফ
25-03-2026 02:50:50 PM
উপন্যাস: পত্র দিও

পর্ব – ৫

সেই যে নদীর ধারে হাতে হাত রেখে বসে ছিলাম লনে—বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও টের পাইনি। সেই দিনটির কথা কি তোমার মনে আছে? তুমি বলেছিলে—“আমি আছি, থাকবো।” তুমিই আবার… আজও সেই কথাটা অষ্টপ্রহর কেবল বাজে মনের কানে। কেমন আছো জানাইও। তুমি পত্র দিও।

কুদ্দুছ চিঠির শুরুতে এই কথাগুলো লিখে থেমে গেল। শব্দগুলো যেন কাগজে নয়, তার হৃদয়ের গভীরে লেখা—যেখানে সময়ের কোনো প্রভাব পড়ে না, যেখানে প্রতিটি স্মৃতি জীবন্ত। নদী।

এই একটি শব্দই তার মনে এক বিশাল দরজা খুলে দেয়।

সেই দিনটি ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে নিঃশব্দ অথচ সবচেয়ে পূর্ণ একটি দিন। শহরের কোলাহল ছেড়ে তারা দুজন চলে গিয়েছিল গ্রামের সেই নদীর ধারে—যেখানে আকাশটা একটু বেশি নীল, বাতাসটা একটু বেশি শীতল, আর সময়টা একটু বেশি ধীর।

নদীর পাশের সেই ছোট্ট লনটা—ঘাসে ঢাকা, চারপাশে কিছু বুনো ফুল। দূরে নদীর জল ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে নৌকার পাল হালকা দুলে উঠছে।

সেদিন নেহা খুব চুপচাপ ছিল।

কুদ্দুছ প্রথমে ভেবেছিল—হয়তো কোনো কষ্ট আছে, হয়তো কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু নেহা কিছু বলছিল না। শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল।

কুদ্দুছ ধীরে বলেছিল—
—“কি ভাবছো?”

নেহা একটু হেসে বলেছিল—
—“ভাবছি… এই সময়টা যদি থেমে যেত…”

কুদ্দুছ হেসে বলেছিল—
—“সময় কি কখনো থামে?”

নেহা তখন তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল—
—“যদি কেউ খুব করে চায়… তাহলে হয়তো থামে…”

এই কথাগুলো তখন কুদ্দুছ খুব গভীরভাবে নেয়নি। কিন্তু আজ মনে হলো—নেহা যেন সেই দিনটাকে চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিল।

তারা পাশাপাশি বসে ছিল। নেহা ধীরে ধীরে কুদ্দুছের হাতটা ধরেছিল।

সেই স্পর্শে কোনো তাড়াহুড়া ছিল না, কোনো লজ্জা ছিল না—ছিল এক গভীর নিশ্চয়তা।

কুদ্দুছ অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
—“তুমি আজ এত চুপচাপ কেন?”

নেহা একটু সময় নিয়ে বলেছিল—
—“কিছু কথা না বললেও থাকে…”

তারপর খুব ধীরে, খুব স্বাভাবিকভাবে বলেছিল—
—“আমি আছি… থাকবো…”

এই একটা বাক্য যেন কুদ্দুছের জীবনের ভিত্তি হয়ে গিয়েছিল।

সে বিশ্বাস করেছিল—যাই হোক না কেন, নেহা থাকবে।

কিন্তু জীবন তার নিজের নিয়মে চলে।

আজ এতদিন পর, সেই কথাগুলোই তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কুদ্দুছ আবার লিখতে শুরু করল—

“নেহা,
তুমি কি সেই নদীর ধারের বিকেলটা মনে রেখেছ?
আমি জানি না তুমি মনে রেখেছো কিনা, কিন্তু আমি ভুলতে পারিনি।

তুমি সেদিন বলেছিলে—তুমি থাকবে।
আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে ভাবি—থাকা মানে কি?

তুমি কি আমার পাশে না থেকেও আমার মধ্যে থেকে গেছো?
নাকি তুমি সত্যিই চলে গেছো—শুধু কিছু শব্দ রেখে?”

কুদ্দুছ থামল।

তার মনে হলো—এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই।

তবুও সে লিখল—

“তুমি জানো, আজও মাঝে মাঝে আমি সেই নদীর ধারে যাই।
সেই একই জায়গায় বসে থাকি।

কেউ থাকে না—শুধু নদীটা থাকে।
আর আমার মনে হয়—তুমি পাশেই বসে আছো।”

এই পর্যন্ত লিখে কুদ্দুছ চুপ করে গেল।

হঠাৎ তার মনে হলো—আজই সে আবার সেই নদীর ধারে যাবে।

অনেকদিন যায়নি।

সে চিঠিটা ভাঁজ করে রেখে দিল।

বিকেলের দিকে সে বেরিয়ে পড়ল।

শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে, ধীরে ধীরে সে পৌঁছাল সেই পুরনো জায়গায়।

সবকিছু যেন একই রকম।

নদী এখনো বয়ে যাচ্ছে। বাতাস এখনো নরম। ঘাসগুলো এখনো সবুজ।

কিন্তু তবুও সবকিছু বদলে গেছে।

কারণ, নেহা নেই।

কুদ্দুছ সেই জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল।

চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো—সময় আবার পিছিয়ে যাচ্ছে।

সে অনুভব করল—তার পাশে কেউ বসে আছে।

হাতের ওপর হালকা একটা স্পর্শ।

সে ধীরে চোখ খুলল।

কেউ নেই।

শুধু বাতাস।

কুদ্দুছ হালকা হেসে ফেলল।

—“তুমি এখনো খেলা করো, তাই না?”

তার কণ্ঠে ছিল না কোনো অভিযোগ—শুধু এক অদ্ভুত স্নেহ।

সে কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর ধীরে বলল—
“নেহা, তুমি বলেছিলে তুমি থাকবে…
তুমি আছো—কিন্তু যেভাবে থাকার কথা ছিল, সেভাবে না…”

বাতাস একটু জোরে বইল।

নদীর জল কেমন যেন দুলে উঠল।

কুদ্দুছের মনে হলো—নেহা যেন উত্তর দিল।

হঠাৎ তার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল।

একটা মেসেজ।

নেহা।

“আজ হঠাৎ করে সেই নদীর কথা মনে পড়ছে…”

কুদ্দুছ অবাক হয়ে গেল।

তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

সে দ্রুত লিখল—
“আমি এখন সেই নদীর ধারে বসে আছি…”

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর নেই।

তারপর এল—
“সত্যি?”

কুদ্দুছ লিখল—
“হ্যাঁ… ঠিক সেই জায়গায়…”

নেহা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর লিখল—
“আমার খুব যেতে ইচ্ছে করছে…”

এই কথাটা পড়ার পর কুদ্দুছের চোখ ভিজে উঠল।

সে লিখল—
“এসো…”

নেহার উত্তর এল ধীরে—
“সব ইচ্ছে পূরণ হয় না, কুদ্দুছ…”

এই কথাটা যেন তাদের পুরো জীবনের সারসংক্ষেপ।

কুদ্দুছ কিছু লিখতে পারল না।

নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।

সূর্য তখন ডুবে যাচ্ছে।

আকাশে লালচে আভা।

ঠিক সেই দিনের মতো।

কুদ্দুছ ধীরে ফোনটা হাতে নিয়ে লিখল—

“নেহা,
তুমি সেদিন বলেছিলে—তুমি থাকবে।
আজ বুঝি—তুমি আছো, কিন্তু দূরে।

হয়তো এটাই আমাদের গল্প—
আমরা কাছাকাছি থেকেও দূরে থাকব।”

নেহার উত্তর এল—

“হয়তো…
কিন্তু আমি আজও সেই বিকেলটা ভুলিনি…”

কুদ্দুছ চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো—আজ এতদিন পর, তারা আবার একই জায়গায় ফিরে এসেছে।

কিন্তু এবার তারা একসাথে নেই—শুধু স্মৃতিতে আছে।

রাত নেমে এল।

আকাশে তারা জ্বলছে।

কুদ্দুছ ধীরে উঠে দাঁড়াল।

শেষবারের মতো নদীর দিকে তাকাল।

তার মনে হলো—এই নদীই তাদের ভালোবাসার মতো—চলছে, থামছে না, কিন্তু কখনো একই থাকে না।

সে ধীরে ফিসফিস করে বলল—
“নেহা… তুমি ভালো থেকো…
আর যদি পারো—পত্র দিও…”

বাতাস আবার বইল।

নদীর জল কেঁপে উঠল।

আর সেই নিঃশব্দ সন্ধ্যায়, কুদ্দুছ বুঝতে পারল—কিছু ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না।

শুধু নদীর মতো—চুপচাপ বয়ে যায়।

(চলবে…)