ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৩:২৪:২৮ PM

উপন্যাস: গুডবয়

মান্নান মারুফ
26-03-2026 01:41:56 PM
উপন্যাস: গুডবয়
 
পর্ব–৩
এক অফিসেই কাজ করতো রিচি ও কুদ্দুছ। প্রথম দিকে কাজের বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে টুকটাক কথা হতো। তবে বাড়তি কথা দুজনার কেউই বলতো না। যেন দুজনেই নিজেদের ভেতরে এক অদৃশ্য সীমারেখা এঁকে রেখেছে—যেখানে প্রয়োজনের বাইরে আবেগ ঢুকতে পারবে না।
কুদ্দুছ মাঝে মাঝে নিজেকে বোঝাত—এই দূরত্বটাই ভালো। কারণ সে জানে, আবেগ যত গভীর হয়, আঘাতও তত গভীর হয়। আর রিচির জীবনে আঘাতের ইতিহাস নতুন নয়।
তবুও, মানুষ কি সবসময় নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?
একদিন সকালে অফিসে ঢুকেই কুদ্দুছ খেয়াল করল—রিচির চোখের নিচে নির্ঘুম রাতের স্পষ্ট ছাপ। চোখ দুটো লালচে, মুখে ক্লান্তির ছায়া। সে চুপচাপ নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছে, কিন্তু হাতের গতি আর মনোযোগ—দুটোই যেন অনিয়মিত।
কুদ্দুছ কয়েকবার তাকাল, আবার চোখ সরিয়ে নিল। কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু বলল না। কারণ সে জানে—অতিরিক্ত প্রশ্ন কখনও কখনও মানুষের একাকিত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবুও সারাদিন একটা অস্বস্তি কাজ করল তার ভেতরে।
বিকেলের দিকে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এলো। প্রবল বৃষ্টি নামল। অফিস ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেল। একে একে সবাই বেরিয়ে গেল, শুধু হাতে গোনা কয়েকজন রয়ে গেল।
কুদ্দুছও বেরোতে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল রিচির দিকে।
সে নিজের টেবিলে মাথা গুঁজে বসে আছে। কাঁধটা হালকা কাঁপছে।
কুদ্দুছ থমকে গেল।
প্রথমে ভেবেছিল—এটা হয়তো তার ভুল দেখা। কিন্তু না… একটু কাছে যেতেই স্পষ্ট হলো—রিচি কাঁদছে। নিঃশব্দে, নিজের ভেতরে ডুবে গিয়ে কাঁদছে।
সেই দৃশ্যটা কুদ্দুছকে নাড়িয়ে দিল ভীষণভাবে।
তার মনে হলো—এই কান্না শুধু আজকের না, এটা জমে থাকা অনেক দিনের। হয়তো অপমান, হয়তো স্মৃতি, হয়তো নিঃসঙ্গতার ভার—সব মিলিয়ে এক গভীর ব্যথার বিস্ফোরণ।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে একটা দ্বন্দ্ব—যাবে, না যাবে?
শেষ পর্যন্ত নিজেকে আটকাতে পারল না।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তারপর এমন ভান করল যেন কিছুই বুঝতে পারেনি।
“কফি খাবেন?”—কুদ্দুছের কণ্ঠটা ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা।
রিচি একটু চমকে তাকাল। চোখে পানি, মুখে অপ্রস্তুত ভাব।
“না… দরকার নেই,”—সে দ্রুত বলল, চোখ মুছতে মুছতে।
কুদ্দুছ হালকা হাসল, “আমার জন্য আনছি… আপনি না করলে খারাপ লাগবে।”
এই অজুহাতটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে ছিল এক নিঃশব্দ আমন্ত্রণ—একটু ভরসা, একটু পাশে থাকার ইচ্ছা।
কয়েক মিনিট পর কুদ্দুছ দু’কাপ কফি নিয়ে ফিরে এল।
সে কাপটা রিচির সামনে রাখল। তারপর ধীরে বলল—
“সব মেঘ একদিন কেটে যাবে, রিচি।”
এই কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু সেই মুহূর্তে যেন কথাটা অন্যরকম হয়ে উঠল।
রিচি কিছু বলল না। শুধু কফির কাপটা হাতে নিল।
দুজনের মাঝে কিছুক্ষণ নীরবতা।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, টুপটাপ শব্দে। ভেতরে শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।
হঠাৎ রিচি বলল, “আপনি কেন এত ভালো?”
কুদ্দুছ একটু অবাক হলো, “ভালো? আমি?”
“হ্যাঁ… সবাই যেখানে প্রশ্ন করে, আপনি সেখানে উত্তর দেন না… শুধু পাশে থাকেন।”
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
“কারণ… আমি জানি, কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় না। শুধু শুনলেই হয়।”
এই কথাটার পর যেন একটা অদৃশ্য বাঁধ ভেঙে গেল।
রিচি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
“আমি কাউকে বলি না এসব… কারণ বললে মানুষ বিচার করে। কিন্তু আজ… জানি না কেন মনে হচ্ছে বলতে পারি।”
কুদ্দুছ কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল—মনোযোগ দিয়ে, নিঃশব্দে।
“বিয়েটা আমার ইচ্ছায় হয়নি,”—রিচি বলল, “পরিবার চেয়েছিল… আমি মেনে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
তার কণ্ঠে ছিল ক্লান্তি।
“কিন্তু প্রথম থেকেই কিছু একটা ভুল ছিল। সে আমাকে কখনও মানুষ হিসেবে দেখেনি… শুধু নিজের অধিকার হিসেবে দেখেছে। আমার ইচ্ছা, আমার স্বপ্ন—কিছুই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।”
কুদ্দুছের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
“ধীরে ধীরে সেটা ভয়ংকর হয়ে উঠল… কথা থেকে অপমান, অপমান থেকে আঘাত… একসময় মনে হতো—আমি আর আমি নেই।”
রিচির চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।
“আমি অনেকবার ভেবেছি—থাকব। সমাজের জন্য, পরিবারের জন্য… কিন্তু একদিন বুঝলাম—আমি যদি বেঁচে না থাকি, তাহলে এসবের কোনো মানে নেই।”
কুদ্দুছ ধীরে বলল, “তারপর… আপনি চলে এলেন?”
“হ্যাঁ… একরাতে। কিছু না নিয়েই। শুধু নিজের প্রাণটা নিয়ে।”
নীরবতা।
কফির ধোঁয়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে।
কুদ্দুছের মনে হলো—এই মেয়েটা শুধু বেঁচে নেই, সে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে।
তার ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল।
সে বুঝতে পারছিল—এই অনুভূতিটা আর শুধু সহানুভূতি নয়।
এটা আরও গভীর, আরও ব্যক্তিগত।
সে ধীরে বলল, “আপনি একা নন।”
রিচি তাকাল তার দিকে।
“হয়তো… সবকিছু আমি ঠিক করতে পারব না,”—কুদ্দুছ বলল, “কিন্তু… আপনি চাইলে আমি পাশে থাকতে পারি।”
এই কথাটা ছিল খুব সরল, কিন্তু এর ভেতরে ছিল এক নিঃশর্ত প্রতিশ্রুতি।
রিচির চোখে এক অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল।
“মানুষ কি সত্যিই এমন হয়?”—সে ধীরে বলল।
“হয়,”—কুদ্দুছ বলল, “কম, কিন্তু হয়।”
সেদিনের পর সবকিছু যেন একটু বদলে গেল।
তারা আগের মতোই কাজ করত, আগের মতোই সীমারেখা বজায় রাখত—কিন্তু সেই সীমার ভেতরে এখন একটা উষ্ণতা ছিল।
কুদ্দুছ এখন বুঝতে পারছে—সে রিচিকে ভালোবাসে।
কিন্তু সে এটা বলতে পারছে না।
কারণ ভালোবাসা শুধু অনুভব করলেই হয় না, তাকে বহন করার সাহসও লাগে।
আর সেই সাহস কি তার আছে?
একদিকে তার পরিবার—মা, বাবা, দায়িত্ব।
অন্যদিকে সমাজ—যারা কখনও সহজভাবে নেবে না এই সম্পর্ক।
আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে রিচি—একটা আহত হৃদয় নিয়ে, আবার নতুন করে বিশ্বাস করতে শিখছে।
কুদ্দুছ জানে—একটা ভুল পদক্ষেপ আবার তাকে ভেঙে দিতে পারে।
তাই সে চুপ করে থাকে।
ভালোবাসাটা নিজের ভেতরে রেখে দেয়।
একদিন সন্ধ্যায়, তারা দুজন আবার সেই চায়ের দোকানে।
রিচি বলল, “আপনি জানেন… আমি এখন আর আগের মতো ভয় পাই না।”
“কেন?”
“কারণ… আমি জানি, কেউ আছে—যে আমাকে বিচার করবে না।”
কুদ্দুছ হালকা হাসল।
“তাহলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
রিচি একটু থেমে বলল,
“কিন্তু একটা ভয় আছে…”
“কি?”
“আমি যদি আবার বিশ্বাস করি… আর যদি সেটা ভেঙে যায়?”
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
“তাহলে… আমি ভাঙতে দেব না।”
এই কথাটা বলার পর সে নিজেই অবাক হলো।
কিন্তু কথাটা সত্যি ছিল।
তার চোখে ছিল দৃঢ়তা।
রিচি তাকিয়ে রইল তার দিকে।
সেই মুহূর্তে, তাদের মাঝখানে কোনো শব্দ ছিল না—শুধু অনুভূতি।
হয়তো এটাই ভালোবাসার শুরু।
নিঃশব্দ, ধীর… কিন্তু গভীর।
কারণ এখনো অনেক পথ বাকি—
যেখানে ভালোবাসা আর বাস্তবতা একসাথে হাঁটতে শিখবে,
নাকি আলাদা হয়ে যাবে—সেটা সময়ই বলবে।
চলবে…