প্রথম পর্ব:
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ঘেঁষা ছোট্ট সেই গ্রামটাকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সবুজের বুকের ওপর কেউ সযত্নে এক টুকরো জীবন রেখে গেছে। নদীর জল কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল; ঠিক তেমনই এই গ্রামের মানুষগুলোর মনও কখনো নির্মল, আবার কখনো অদ্ভুতভাবে সংকীর্ণ। বিকেলের দিকে নদীর বাতাস যখন ধানের গন্ধ মিশিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনে হয় এই গ্রামেই যেন পৃথিবীর সমস্ত শান্তি জমে আছে। কিন্তু এই শান্তির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে অজস্র ফিসফাস, কটু কথা আর বাঁকা চোখের দৃষ্টি।
গ্রামের মাঝখানে, কাঁচা রাস্তার মোড়ে একটি পুরোনো চায়ের দোকান। টিনের চালা, বাঁশের বেঞ্চ, আর চুলোর ধোঁয়া—সব মিলিয়ে সেটাই যেন গ্রামের খবরের কেন্দ্র। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে লোকের ভিড় লেগেই থাকে। কেউ চা খায়, কেউ বিড়ি টানে, কেউ বা শুধু গল্প করার জন্য আসে। আর সেই গল্পের বেশিরভাগই অন্য কারো জীবন নিয়ে।
সেদিনও তেমনই এক বিকেল। আকাশে মেঘ জমেছে, হালকা বাতাস বইছে। চায়ের দোকানে বসে কয়েকজন লোক নিচু গলায় কথা বলছে।
“শুনছো, ওই মজিবুর রহমানের খবর?”—একজন ফিসফিস করে বলল।
আরেকজন চোখ টিপে বলল, “ওর খবর আবার নতুন কী! ওই মেয়েটারে নিয়ে একা থাকে—এইডাই তো গ্রামের লজ্জা!”
“মেয়েটা বড় হইতেছে। কলেজে যায়। অথচ বাপ-মেয়ে একা থাকে—কিছু তো গণ্ডগোল আছেই!”
চায়ের কাপের ভেতর চুমুকের শব্দের সাথে সাথে কথাগুলো যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠতে লাগল। কেউ সরাসরি কিছু জানে না, কিন্তু সবাই যেন সব জানে—এমন ভঙ্গিতে কথা বলে।
মজিবুর রহমান এই গ্রামেরই মানুষ। বয়স ষাটের কাছাকাছি। একসময় খুব চুপচাপ, সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জমিজমা তেমন নেই, তবে নিজের পরিশ্রমে জীবন চালিয়ে নেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তার জীবন যেন অন্যরকম হয়ে গেছে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি একাই থাকেন। আর তার সঙ্গে থাকে রিমা—১৮ বছরের একটি মেয়ে।
রিমা তার নিজের মেয়ে নয়—এই কথাটা গ্রামের সবাই জানে। কিন্তু সে কার মেয়ে, কোথা থেকে এসেছে—এই নিয়ে নানা গল্প, নানা রকম কল্পনা ছড়িয়ে আছে। কেউ বলে, রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছে। কেউ বলে, কোনো অবৈধ সম্পর্কের ফল। আবার কেউ কেউ তো আরও নোংরা ইঙ্গিত করতে পিছপা হয় না। সত্যটা কেউ জানার চেষ্টাও করেনি।
রিমা প্রতিদিন সকালে কলেজে যায়। সাদা সালোয়ার কামিজ, মাথায় ওড়না—খুব সাধারণ একটা সাজ। কিন্তু তার চোখ দুটো অসাধারণ। গভীর, স্বচ্ছ, আর একটু কষ্ট মেশানো। সে যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটে, তখন গ্রামের লোকজন তার দিকে এমনভাবে তাকায়, যেন সে কোনো অপরাধ করেছে।
বাঁকা চোখে তাকানো—এটাই যেন তাদের অভ্যাস।
রিমা প্রথম দিকে এই দৃষ্টিগুলো বুঝতে পারত না। কিন্তু ধীরে ধীরে সব বুঝে গেছে। এখন সে মাথা নিচু করে হাঁটে। কারো দিকে তাকায় না। কারো সাথে কথা বলে না, প্রয়োজন ছাড়া। যেন নিজেকে ছোট করে ফেললেই এই দৃষ্টিগুলো থেকে বাঁচা যাবে।
কিন্তু কি সত্যিই বাঁচা যায়?
একদিন কলেজে যাওয়ার পথে চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল রিমা। তখন কয়েকজন লোক হেসে উঠল।
“এই যে, কলেজের মাইয়া—বড় হইছে কিন্তু!”
“হ, পড়াশোনা করে কি হবে? গ্রামের মান-সম্মান তো শেষ করতেছে!”
রিমা শুনেও না শোনার ভান করে হাঁটতে লাগল। তার চোখে জল চলে এসেছিল, কিন্তু সে থামেনি। সে জানে—থামলেই তারা জিতবে।
ওদিকে মজিবুর রহমান এই সব কথা শুনেন। কিন্তু কখনো কারো সাথে তর্ক করেন না। তিনি শুধু চুপচাপ থাকেন। রাতে খাওয়ার সময় রিমার দিকে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই বলেন—
“মাথা উঁচু করে চলবি মা। মানুষের কথা শুনলে জীবন চলবে না।”
রিমা তখন মৃদু হাসে। কিন্তু সেই হাসির ভেতর কতটা কষ্ট লুকানো থাকে, সেটা শুধু সে-ই জানে।
গ্রামের মানুষ মজিবুর রহমানকে এড়িয়ে চলে। কেউ তার বাড়িতে আসে না। কোনো অনুষ্ঠানে তাকে ডাকা হয় না। যেন তিনি এই গ্রামের কেউ নন। অথচ এই মানুষটাই একসময় সবার বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। কারো ফসল নষ্ট হলে সাহায্য করেছেন, কারো অসুখ হলে ডাক্তার ডেকেছেন।
কিন্তু মানুষ বড় অদ্ভুত। তারা ভালোটা খুব দ্রুত ভুলে যায়, আর সন্দেহটা আঁকড়ে ধরে রাখে।
একদিন সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে বসে ছিল রিমা। সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। আকাশ লালচে হয়ে উঠেছে। নদীর জলে সেই রঙ ছড়িয়ে পড়েছে। রিমা চুপচাপ বসে ছিল, হঠাৎ তার পাশে এসে বসলো একজন বৃদ্ধা—গ্রামেরই মানুষ, নাম আয়েশা খালা।
“কিরে মা, একা বসে আছিস?”—তিনি মমতা ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন।
রিমা একটু চমকে উঠল। এই গ্রামের কেউ তাকে এভাবে কখনো ডাকেনি।
“হ্যাঁ খালা, একটু বসেছিলাম।”
আয়েশা খালা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “মানুষ যা বলে, সব সত্যি না মা। তুই মন খারাপ করিস না।”
রিমার চোখ ভিজে উঠল। সে অনেকদিন পর যেন একটু স্বস্তি পেল।
“খালা, আমি কি এত খারাপ?”—সে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল।
আয়েশা খালা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“খারাপ মানুষরা কখনো নিজেদের খারাপ ভাবে না। আর ভালো মানুষদেরই বেশি কথা শুনতে হয়।”
সেই মুহূর্তে রিমা বুঝল—সব মানুষ একরকম না। কেউ কেউ আছে, যারা বুঝতে পারে, যারা পাশে দাঁড়াতে জানে।
সেদিন রাতে মজিবুর রহমান বাড়ির উঠানে বসে ছিলেন। আকাশে তারা ঝলমল করছে। তিনি চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হয়তো নিজের জীবনের হিসাব কষছিলেন।
হঠাৎ রিমা এসে তার পাশে বসলো।
“দাদু…”—সে ডেকে উঠল।
মজিবুর রহমান তাকালেন। “কী হয়েছে মা?”
রিমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “মানুষ কেন এমন করে?”
মজিবুর রহমান একটু হেসে বললেন, “কারণ তারা সত্যটা জানে না। আর জানার চেষ্টাও করে না।”
“তাহলে কি কখনো তারা আমাদের সর্ম্পকটা বুঝবে?”
তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “একদিন হয়তো বুঝবে। কিন্তু তার আগে আমাদের নিজেদের সত্যে অটল থাকতে হবে।”
রিমা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
সেই রাতে ব্রহ্মপুত্রের পানি একটু বেশি শব্দ করছিল। যেন নদী নিজেই এই গল্প শুনছিল, আর নিঃশব্দে সাক্ষী হয়ে থাকছিল—একটি মেয়ে, একটি মানুষ, আর একটি গ্রামের বাঁকা চোখের গল্পের।
এই গল্পের শুরুটা কষ্টের, অপমানের। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্যরকম এক ভালোবাসা—যে ভালোবাসা শুধু একজন মানুষকে ভালোবাসা নয়, বরং তার পাশে দাঁড়ানো, তার সত্যকে বিশ্বাস করা।
গ্রামের ফিসফাস থামেনি। বাঁকা চোখের দৃষ্টি এখনো আছে। কিন্তু সেই অন্ধকারের মাঝেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এক আলোর গল্প।
আর সেই গল্পের নাম—ভালোবাসা।
(চলবে…)