ঢাকা, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬,
সময়: ০৫:১১:০৩ PM

বিএনপি”র জন্য নতুন করে উদ্বেগ

মান্নান মারুফ
05-05-2026 04:02:59 PM
বিএনপি”র জন্য নতুন করে উদ্বেগ

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করে আসছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই দলটি নানা প্রতিকূলতা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, বিশেষ করে নেতৃত্ব ও তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে দূরত্ব, দলটির জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দলে অনেককে যথাযথ স্থান না দেওয়ার অভিযোগও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থেকেও অনেক নেতাকর্মী পদবঞ্চিত রয়েছেন। ফলে তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গত প্রায় দেড় দশক ধরে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে নানা ধরনের নির্যাতন, হামলা-মামলা এবং কারাবরণ করেছেন। অনেকেই ব্যক্তিগত জীবনের কষ্ট ও সংকট উপেক্ষা করে দলের জন্য কাজ করে গেছেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সেই পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে মূলধারার রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ছেন, যা দলের জন্য একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করে।

দলের অভ্যন্তরে এমন অভিযোগও রয়েছে যে, কঠিন সময়ে যারা দলের পাশে ছিলেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এর বিপরীতে তুলনামূলকভাবে নতুন এবং কম অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরে উঠে আসছেন। এতে করে তৃণমূলের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়ছে এবং কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। দলীয় প্রত্যাশা ছিল প্রায় আড়াইশ’ আসন অর্জনের, কিন্তু বাস্তবে অন্তত ৫০টি আসন কম পাওয়া যায়। যদিও দলটি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও এই ব্যবধান সাংগঠনিক দুর্বলতার দিকটি স্পষ্ট করে দেয়।

বিশেষ করে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অনেক আসনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচন করায় ভোট বিভক্ত হয়েছে এবং বিএনপি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন হারিয়েছে। এ ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয় জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

সরকার গঠনের পরও কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মন্ত্রিসভায় সিনিয়র ও অভিজ্ঞ নেতাদের অনেকেই স্থান না পাওয়ায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়েও প্রভাব ফেলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর উদাহরণ প্রায়ই টানা হয়। সেখানে সিনিয়র নেতাদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ দলীয় কাঠামোকে দুর্বল করেছিল বলে অনেকে মনে করেন। বিএনপির ক্ষেত্রেও এমন প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বর্তমানে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের একটি বড় অংশ নিজেদের অবহেলিত মনে করছেন। তাদের অভিযোগ, সরকার গঠনের পর গত আড়াই মাসে তাদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ রাখা হয়নি। এই বিচ্ছিন্নতা ভবিষ্যতে দলীয় কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই হতাশা শুধু মনস্তাত্ত্বিক নয়, সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। অনেক কর্মী জীবিকার তাগিদে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার চিন্তা করছেন, যা ভবিষ্যতে দল গঠনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির নীতিনির্ধারকদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তৃণমূল পর্যায়ের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের পুনর্মূল্যায়ন, কেন্দ্র ও তৃণমূলের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারে জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি ও খাল খনন কর্মসূচির বিস্তার ঘটালে কর্মসংস্থান বাড়বে, অবকাঠামো উন্নত হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক গতি সঞ্চার হবে।

সবশেষে বলা যায়, তৃণমূলের আস্থা পুনরুদ্ধার, নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বিএনপি আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন মহলের।