পর্ব–২
রাতের সেই আড়াইটার অন্ধকার যেন এখনও ঐশির চারপাশে লেগে আছে। দিন আসে, সূর্য ওঠে, চারদিক আলোয় ভরে যায়—তবু তার ভেতরের রাত কাটে না। হ্যারির কণ্ঠ, তার দাবি, তার “কাছে পেতে চাই” — এই শব্দগুলো বারবার ফিরে আসে।
সেদিন ভিডিও কলে হ্যারি যখন বলেছিল, “তোমাকে খুব কাছে পেতে চাই,” তখন ঐশি অবাক হয়েছিল। সে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। নিঃশব্দে ফোনের ওপাশের মানুষটার শ্বাসের শব্দ শুনছিল।
তারপর ধীরে বলেছিল,
“তুমি তো অনেক দূরে… কিভাবে তুমি আমাকে কাছে পাবে?”
ওপাশে হালকা হাসি।
“আমি বাংলাদেশে আসবো।”
কথাটা এত সহজ ভঙ্গিতে বলেছিল হ্যারি, যেন এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার কথা বলছে। ঐশি ভেবেছিল, এটা নিছক দুষ্টামি। হয়তো আবেগের বশে বলা একটা কথা। সে হেসে বলেছিল,
“এইসব সিনেমার ডায়লগ বাদ দাও।”
হ্যারি তখন চুপ করে গিয়েছিল। তার সেই নীরবতা ঐশির কানে অদ্ভুত লেগেছিল। কিন্তু সে বিষয়টা আর ভাবেনি। ভেবেছিল—বিদেশে থাকা একজন মানুষ কি এত সহজে সব ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসবে?
কয়েকদিন কেটে গেল।
হ্যারি আগের মতোই কথা বলে, ভালোবাসার ইমোজি পাঠায়, ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকে। ঐশির মনও কখনো নরম হয়, কখনো কঠিন। সে বুঝতে পারে না—এই সম্পর্কটা কি সত্যিই ভালোবাসা, নাকি এক অদৃশ্য টান, যার শেকড় লোভ আর নির্ভরতায় গাঁথা?
এক সন্ধ্যায় হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
হ্যারি।
ঐশি ধরতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর স্বর—
“আমি সত্যিই বাংলাদেশে আসতে চাই।”
ঐশির বুক ধক করে উঠল।
“কি?”
“হ্যাঁ। টিকিট দেখছি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আসবো।”
ঐশি হাসার চেষ্টা করল।
“আচ্ছা আসো, কোনো সমস্যা নাই।”
তার কণ্ঠে হালকা ঠাট্টার সুর ছিল। সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, হ্যারি তাকে চমকে দেওয়ার জন্য গল্প বানাচ্ছে।
কিন্তু ফোন রাখার পর হঠাৎ তার বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপুনি শুরু হলো। যদি সত্যিই আসে? যদি এই দূরত্বের সম্পর্ক একদিন হঠাৎ বাস্তব হয়ে দাঁড়ায় তার দরজায়?
সে আয়নায় নিজের মুখ দেখল। চোখের নিচে কালি, ঠোঁটে ক্লান্তির রেখা। সে কি প্রস্তুত এমন এক বাস্তবতার জন্য?
পরদিন হ্যারি ছবি পাঠাল—পাসপোর্টের, ফ্লাইটের স্ক্রিনশট।
“দেখো, আমি সিরিয়াস।”
ঐশির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
এতদিন যে মানুষটা ছিল কেবল স্ক্রিনের ভেতর, সে কি সত্যিই রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে তার সামনে দাঁড়াবে?
তার ভেতরে দুইটা অনুভূতি লড়াই শুরু করল।
একটা বলছে—এটাই তো ভালোবাসা! কেউ তোমার জন্য দেশ ছেড়ে আসতে চায়।
আরেকটা বলছে—এই আগ্রহের পেছনে কি শুধু শরীরের লোভ লুকিয়ে নেই?
সেই রাতেও ঘড়ির কাঁটা আড়াইটায় থামল যেন।
ঐশি বিছানায় শুয়ে ছিল, ফোনটা বুকে চেপে। হ্যারির মেসেজ আসছে একের পর এক—
“তোমাকে কাছে থেকে দেখতে চাই।”
“তোমার শহর, তোমার জীবন… সব।”
ঐশির মনে হলো, সে যেন ধীরে ধীরে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। এতদিন দূরত্ব তাকে একটা নিরাপত্তা দিয়েছিল। স্ক্রিনের ওপাশে থাকা মানুষকে সহজে ব্লক করা যায়, কল কেটে দেওয়া যায়। কিন্তু বাস্তব?
যদি হ্যারি এসে দাঁড়ায়? যদি সে আরও দাবি করে? যদি তার সেই রাত আড়াইটার ভুল একদিন বড় হয়ে তার সামনে দাঁড়ায়?
তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল মায়ের মুখ।
“সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভেবে নিস।”
কিন্তু ঐশি কি ভেবেছিল?
আইফোনের ঝকঝকে আলো, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢোকা টাকা—এসব কি তার বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করেনি?
কয়েকদিন পর হ্যারি জানাল, তার ফ্লাইট কনফার্ম।
“আমি আসছি।”
ঐশির বুকের ভেতর তখন ঝড়।
সে ফোনে বলল, “তুমি কি নিশ্চিত? এত দূর আসা… পরিবার কিছু বলবে না?”
হ্যারি হাসল।
“আমি বড় হয়েছি, সিদ্ধান্ত নিতে পারি। আর আমি তোমাকে চাই।”
এই ‘চাই’ শব্দটা আবারও তার শরীরের ভেতর শীতল স্রোত বইয়ে দিল।
চাওয়া—ভালোবাসার জন্য, না অধিকারবোধের জন্য?
ঐশি জানে না।
দিনগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। তার চারপাশে স্বাভাবিক জীবন চলছে—রাস্তায় গাড়ি, বাজারের ভিড়, বিকেলের আড্ডা। কিন্তু তার ভেতরে কেবল একটাই প্রশ্ন—হ্যারি সত্যিই এলে কী হবে?
সে কল্পনা করে—এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যারি এগিয়ে আসছে।
সে কি খুশিতে দৌড়ে যাবে? নাকি অস্বস্তিতে পিছিয়ে যাবে?
তার মনে পড়ে যায় সেই রাত। স্ক্রিনের সামনে তার নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ।
যদি হ্যারি সেই মুহূর্তকে বাস্তবে পুনরাবৃত্তি করতে চায়?
এক বিকেলে সে ফোন হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকল। ভাবল, সব বন্ধ করে দেবে। ব্লক করবে। সম্পর্ক ছিন্ন করবে।
কিন্তু পারে না।
হয়তো সে হ্যারিকে ভালোবেসে ফেলেছে।
হয়তো সে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আটকে গেছে।
হয়তো সে ভয় পাচ্ছে—হারানোর।
রাত বাড়ে।
ঘড়ি আবার আড়াইটায় এসে থামে।
ঐশি জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখে—আকাশে কোনো তারা নেই। কেবল অন্ধকার।
তার মনে হয়, এই অন্ধকারই তার ভবিষ্যৎ—অজানা, অনিশ্চিত।
হ্যারি আসছে।
এই আসা কি তার জীবনে আলো নিয়ে আসবে, নাকি আরও গভীর ছায়া?
ঐশি জানে না।
শুধু জানে, তার বলা “আসো, কোনো সমস্যা নাই” — এই সহজ বাক্যটাই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়াতে চলেছে।
রাত আড়াইটা আবারও সাক্ষী রইল—একটি মেয়ের দ্বিধা, ভয়, আর অদৃশ্য বন্ধনের।
পরের রাত কি তাকে মুক্তি দেবে, নাকি নতুন এক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করাবে—তার উত্তর লুকিয়ে আছে আগত সেই দিনের ভেতর।
চলবে..........