ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০২:১৩:৪৪ AM

উপন্যাস: রাত আড়াইটা

মান্নান মারুফ
02-03-2026 01:49:57 PM
উপন্যাস: রাত আড়াইটা

পর্ব–৬

রাত তখন ঠিক আড়াইটা।
ঘড়ির কাঁটা যেন নিঃশব্দে কাঁদছিল। বাড়ির ভেতর অদ্ভুত এক নীরবতা—যেন প্রতিটি দেয়াল কান পেতে আছে, কেউ কী সিদ্ধান্ত নেয়, কার জীবনের কোন দরজা খুলে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়।

ঐশির বাবা চুপ করে বসে ছিলেন বারান্দার কাঠের চেয়ারে। বাতাসে শীতের হালকা ছোঁয়া, দূরে কোনো কুকুরের ডাক, আর মাঝে মাঝে ভাঙা নিশ্বাসের শব্দ—সব মিলিয়ে রাতটা যেন অস্বস্তিতে মোড়া। তার চোখে ঘুম নেই। মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই সমাজের সামনে তিনি কীভাবে দাঁড়াবেন?

ঐশি পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নিচু, হাত দুটো আঁকড়ে ধরা। এত সাহস নিয়ে সে আজ তার বাবার সামনে দাঁড়িয়েছে, অথচ এখন মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা কাঁপছে।

বাবা ধীরে ধীরে বললেন,
—“ওরা তো খ্রিষ্টান। তুই মুসলিম। এই দেশে, এই সমাজে—কীভাবে সম্ভব এই বিয়ে?”

প্রশ্নটা ছিল শান্ত, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে ছিল ঝড়।
ঐশি চোখ তুলে বাবার দিকে তাকালো। তার বাবার কণ্ঠে রাগ নেই, আছে ভয়। সমাজের ভয়, মানুষের কথার ভয়, আত্মীয়স্বজনের তিরস্কারের ভয়।

বাবা আবার বললেন,
—“ও যদি মুসলিম হয়, তাহলে আমি রাজি আছি। কিন্তু না হলে? মানুষ বলবে, আমরা টাকার লোভে জার্মানির ছেলের কাছে মেয়েকে দিয়ে দিচ্ছি। বলবে, বিদেশে পাঠানোর লোভে আমরা ধর্মও ভুলে গেছি।”

“জার্মানি”—শব্দটা শুনতেই ঐশির মনে ভেসে উঠল তার প্রিয় মানুষটার মুখ। দূরদেশের সেই শহর—Berlin—যেখানে সে থাকে। কাঁধে দায়িত্ব, চোখে স্বপ্ন, আর কণ্ঠে এক অদ্ভুত কোমলতা। সে কখনো ঐশিকে ধর্ম বদলাতে বলেনি, বরং বলেছে—“ভালোবাসা কখনো কারও বিশ্বাস কেড়ে নেয় না।”

কিন্তু এই মাটিতে জন্ম নেওয়া একটি মেয়ের ভালোবাসা এত সহজ নয়।

ঐশির গলা কেঁপে উঠল।
—“আব্বু, ও বাংলাদেশে আসুক। আমি ওকে বলব—যদি ও মুসলিম হতে চায়, তাহলে আপনি আমাদের বিয়ে দেবেন। না হলে দেবেন না। আমি আপনার সিদ্ধান্তের বাইরে যাব না।”

কথাগুলো বলতে গিয়ে তার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। সে জানে না ছেলেটি রাজি হবে কি না। জানে না এই শর্ত তার ভালোবাসাকে আঘাত করবে কি না। কিন্তু বাবার চোখের ভরসা সে ভাঙতে পারে না।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“ঠিক আছে। আগে আসুক। তারপর কথা বলব। সবকিছু বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত নেব।”

কথাটা বলে তিনি উঠে গেলেন। কিন্তু তার কাঁধের ভার যেন আরও বেড়ে গেল।

ঐশি একা দাঁড়িয়ে রইল বারান্দায়। আকাশে চাঁদ আধখানা। মনে হলো, তার জীবনটাও যেন ঠিক তেমন—অর্ধেক আলো, অর্ধেক অন্ধকার।

ঘরে ফিরে এসে ফোনটা হাতে নিল সে। স্ক্রিনে তার নাম জ্বলছে—“হ্যারি।”
হ্যারি—Harry Schneider—যার কণ্ঠে সে খুঁজে পেয়েছিল ভরসা। যার সাথে প্রথম আলাপ হয়েছিল এক অনলাইন কনফারেন্সে। ভাষার ভিন্নতা, সংস্কৃতির ভিন্নতা—সবকিছু পেরিয়ে তাদের বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নিয়েছিল।

কল ধরতেই ওপাশ থেকে হাসিমাখা কণ্ঠ—
—“Aishi, are you awake? It’s late there, right?”

ঐশি মৃদু হেসে বলল,
—“হ্যাঁ, রাত আড়াইটা।”

হ্যারি একটু চুপ করল।
—“তুমি কাঁদছো?”

ঐশি চমকে উঠল।
কাঁদছিল সে—অজান্তেই।
—“না… কিছু না।”

কিন্তু হ্যারির কণ্ঠে উদ্বেগ স্পষ্ট।
—“তোমার বাবা-মা কী বললেন?”

এই প্রশ্নের উত্তরে যেন ঐশির গলা শুকিয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে সব বলল—ধর্মের কথা, সমাজের কথা, মানুষের কথার ভয়, আর সেই শর্ত—মুসলিম হতে হবে।

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
এত নীরবতা আগে কখনো আসেনি তাদের কথায়।

ঐশির মনে হলো—এই নীরবতার ভেতরেই হয়তো তাদের ভালোবাসা ভেঙে যাচ্ছে।

অবশেষে হ্যারি বলল,
—“তুমি কি চাও আমি মুসলিম হয়ে যাই?”

প্রশ্নটা ছিল সরল। কিন্তু তার ভেতরে হাজারো দ্বিধা।

ঐশি চোখ মুছল।
—“আমি চাই না তুমি জোর করে কিছু করো। আমি শুধু চাই, আমার পরিবার আমাকে হারিয়ে না ফেলুক।”

হ্যারি গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
—“আমি তোমাকে ভালোবাসি। ধর্ম আমার কাছে বিশ্বাসের বিষয়, কিন্তু তোমাকে হারানোও সহজ নয়। আমি বাংলাদেশে আসছি। আমরা সামনাসামনি কথা বলব।”

কথাটা শুনে ঐশির বুক কেঁপে উঠল।
সামনাসামনি—মানে সিদ্ধান্তের দিন ঘনিয়ে আসছে।

ফোন কেটে গেলে সে জানালার পাশে বসে রইল। বাইরে অন্ধকার রাস্তা। মাঝে মাঝে দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি। সে মনে মনে ভাবল—ভালোবাসা কি সত্যিই ধর্মের সীমানা মানে? নাকি সমাজই দেয়াল তুলে দেয়?

তার মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। এই সমাজেই সে বড় হয়েছে, এই মানুষগুলোর মাঝেই তার হাসি-কান্না। কিন্তু আজ সেই সমাজই তার ভালোবাসার বিচারক।

পরদিন সকালে বাড়িতে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা। মা চুপচাপ রান্না করছেন। বাবার মুখ গম্ভীর।
ঐশি বুঝতে পারছে—তার জীবনের সিদ্ধান্ত শুধু তার একার নয়।

বিকেলে হ্যারি মেসেজ দিল—
“Flight booked.”

ঐশির হাত কেঁপে উঠল। সে জানে না এই সফর তাদের মিলনের হবে, নাকি বিচ্ছেদের।

রাত আবার নেমে এল।
আবার আড়াইটা বাজল।

ঐশি বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে সময় যেন থেমে গেছে। তার ভেতরে দুটি সত্তা লড়াই করছে—একটি প্রেমিকা, অন্যটি কন্যা।

প্রেমিকা বলছে—ভালোবাসার জন্য লড়ো।
কন্যা বলছে—বাবার চোখের জল সহ্য করতে পারবে?

তার চোখ ভিজে উঠল।
সে ফিসফিস করে বলল—
“হে আল্লাহ, আমাকে এমন এক পথ দেখাও, যেখানে কাউকে হারাতে না হয়।”

কিন্তু জীবন কি কখনো এমন সহজ পথ দেয়?

হ্যারি আসবে।
বাবা তার সঙ্গে কথা বলবেন।
সমাজ তাকিয়ে থাকবে।

আর ঐশি—সে দাঁড়িয়ে থাকবে মাঝখানে, দুই পৃথিবীর সীমানায়।

রাত আড়াইটা আবার সাক্ষী হবে—
ভালোবাসা কি জিতবে,
নাকি সমাজের দেয়াল আরও উঁচু হবে?

চাঁদের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল।
নতুন ভোরের আগে অন্ধকারই সবচেয়ে গভীর হয়—এই সত্যটা হয়তো আজ ঐশি বুঝতে পারল।

তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সকাল আসছে।

চলবে.............